বলুন, মাদাম একস্-এর স্বর গগ করে উঠল।
কোন বিদেহী আত্মা যদি স্থূলদেহ ধারণ করতে চায় তবে মিডিয়ামের দেহ থেকে তাকে দেহধারণের উপাদান গ্রহণ করতে হয়। নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন যে প্রেত-চক্রের সময় মিডিয়ামের মুখ থেকে সূক্ষ্ম ধোঁয়ার মত বাষ্প বেরোয়। এই বাস্পই ধীরে ধীরে ঘনীভূত হয়ে প্রেতাত্মার নিখুঁত দেহের সৃষ্টি করে। মিডিয়ামের দেহ থেকে যে সূক্ষ্ম বাষ্প বেরিয়ে আসে তাকে বলে এক্টোপ্লাজম্। যারা প্রেততত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করেন তারা বলেন যে এই এক্টোপ্লজ মিডিয়ামেরই দেহের অতিসূক্ষ্ম বস্তুকণা। অদূর ভবিষ্যতে হয়তো নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওজনের সাহায্যে এ জিনিসটা প্রমাণ করা যাবে। কিন্তু সেক্ষেত্রেও বিপদের সম্ভানা রয়েছে। কারণ দেহধারী প্রেতাত্মাকে স্পর্শ করলেই মিডিয়ামের দেহে অসহ্য যন্ত্রণার সৃষ্টি হয়। রূপধারী প্রেতাত্মাকে স্পর্শ করলে মিডিয়ামের ভয়ংকর বিপদ হতে পারে। এমনকি এক্ষেত্রে মৃত্যু ঘটাও অসম্ভব নয়।
গভীর মনোযোগের সঙ্গে মাদাম একস্ শুনছিলেন রাউলের কথা।
রাউল আবার বলতে লাগল, তা হলেই বুঝতে পারছেন মাদাম, মিডিয়ামের গুরুত্ব কোথায়। মিডিয়ামের সাহায্য ছাড়া বিদেহী আত্মা দেহধারণই করতে পারে না। মিডিয়াম হলো ইহলোক আর পরলোকের মধ্যে সংযোগের সেতু। যে কেউ চাইলেই মিডিয়াম হতে পারে না। কারণ সবার মধ্যে মিডিয়াম হবার প্রয়োজনীয় গুণগুলো নেই। দুএকজনের মধ্যে এ দুর্লভ ক্ষমতার স্ফুরণ হয়।
আশ্চর্য! আচ্ছা মঁশিয়ে রাউল, এমন দিন কি আসবে না যখন এই দেহধারণের ব্যাপারটা উন্নতির এমন স্তরে পৌঁছবে যে দেহধারী আত্মা মিডিয়ামের দেহ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে নিতে পারবে?
এ যে সাংঘাতিক কল্পনা, মাদাম।
হোক সাংঘাতিক, অসম্ভব তো নয়?
হ্যাঁ, সম্পূর্ণ অসম্ভব। অন্তত এখনও পর্যন্ত যতদূর জানা গিয়েছে তার ভিত্তিতে বলা যায় এটা একেবারেই অসম্ভব।
কিন্তু আজকের কথাই তো শেষ কথা নয়, আজকে যা অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে, ভবিষ্যতে তা তো সম্ভব হয়ে উঠতে পারে?
এ কূট প্রশ্নের উত্তর আর রাউলকে দিতে হলো না। সিমোন ঘরে ঢুকল। ওকে অত্যন্ত ক্লান্ত এবং বিবর্ণ দেখাচ্ছে। তাহলেও ও যে অনেকটা সামলে উঠেছে তা। বেশ বোঝা যায়।
সিমোন এগিয়ে এসে মাদাম একস্-এর সঙ্গে করদর্মন করল। হাত মেলাবার সময় সে যে শিউরে উঠল তা লক্ষ্য করল রাউল।
শুনে দুঃখিত হলাম যে, আপনার শরীর নাকি ভালো নেই, মাদাম একস্ বললেন।
ঠিক আছে, ও নিয়ে চিন্তা করবেন না।
আজকে চক্রে বসতে পারবেন তো? মাদাম এক প্রশ্ন করলেন।
নিশ্চয়ই পারব, একটু রুক্ষস্বরেই সিমোন বলল। ওর স্বরের রুক্ষতায় রাউল তো বটেই, মাদাম একস্ পর্যন্ত যেন চমকে উঠলেন।
দেরি করে লাভ কি, তাহলে কাজ শুরু করা যাক, একথা বলে সিমোন ঢুকে পড়ল ছোট কুঠরীখানার মধ্যে। বসল গিয়ে বড় হাতলওয়ালা ইজিচেয়ারখানায়।
আচমকা এক অজানা আতংকের তুহিন-শীতল স্রোত যেন বয়ে গেল রাউলের মেরুদণ্ডের মধ্য দিয়ে। আবেগের সঙ্গে সে বলল।
আজকে তোমার শরীরটা ভালো নেই, সিমোন। আজ প্রেত-চক্র বন্ধ থাক। আশা করি মাদাম একস্ কিছু মনে করবেন না।
একি কথা মঁশিয়ে! কুদ্ধস্বরে মাদাম একস্ বললেন।
ঠিকই বলছি আমি, রাউলও দৃঢ়তার সঙ্গে বলল, অসুস্থ শরীর নিয়ে আজ চক্রে না বসাই ভালো।
কিন্তু মঁশিয়ে, মাদাম সিমোন তো আমাকে কথা দিয়েছিলেন যে, আজ আমার জন্য শেষবারের মত উনি চক্রে বসবেন, মাদাম একস্-এর কণ্ঠ থেকে একই সঙ্গে ক্রোধ আর ঘৃণা ঝরে পড়ল।
ঠিক, আমি কথা দিয়েছি। আর সে কথার খেলাপও আমি করব না, ঠাণ্ডা গলায় সিমোন বলল।
এই তো চাই, কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে মাদাম একস্ বললেন। রাউলের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত ধীরকণ্ঠে সিমোন বলল, ভয় পাচ্ছ কেন রাউল? ভয় পেয়ো না। আমি তো শেষবারের মত প্রেত-চক্রে বসছি। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ! এই আমার শেষবারের মত কষ্ট পাওয়া। আর… আর কখনও এই অসহ্য কষ্ট পেতে হবে না আমাকে। এই শেষ… এই শেষ।
সিমোনের ইঙ্গিতে রাউল কুঠরীর কালো ভারী পর্দাটা টেনে দিল। তারপর জানালার পর্দাগুল টেনে দিতেই আধো আলো আধো ছায়ার পরিবেশ সৃষ্টি হলো ছোট ঘরখানার মধ্যে। মাদাম একত্সকে একখানা চেয়ারে বসবার ইঙ্গিত করে রাউল অন্য চেয়ারখানায় বসল। মাদাম একস্ একটু ইতস্তত করে বলেই ফেললেন। কথাটা।
আমাকে মাফ করবেন সঁশিয়ে, আমি আপনার বা মাদাম সিমোনের সতোকে অবিশ্বাস করছি না। জানি আপনার দুজনেই অত্যন্ত সৎ। আর এই প্রেত-চক্রের মধ্যেও কোন জালিয়াতি বা কারচুপি নেই। কিন্তু তবুও আমি সম্পূর্ণ নিঃসন্দেহে হতে চাই আর তাই এই জিনিসটা আমি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি।
একথা বলে নিজের হাত-ব্যাগ থেকে একটা সরু শক্ত দড়ি বের করলেন মাদাম একস্।
মাদাম, রাউল চিৎকার করে উঠল, এ তো অপমান… ভীষণ অপমান!
না, এ হলো নিছক সাবধানতা, অদ্ভুত ঠাণ্ডা গলায় মাদাম একস্ বললেন।
না না, এ হলো অপমান…মারাত্মক অপমান…আপনি আমাদের দুজনকেই অপমান করেছেন, উত্তেজিতভাবে রাউল চিৎকার করে উঠল।
মঁশিয়ে রাউল, আপনার আপত্তির কারণ তো আমি বুঝতে পারছি না, বিদ্রুপের সুরে মাদাম একস্ বললেন, আপনাদের চক্রে যদি কোন জালিয়াতি বা কারচুপি না থাকে তাহলে আপত্তি করছেন কেন? আপনাদের মধ্যে যদি কোন ছলনা থাকে তবে ভয় পাওয়ার তো কোন কারণ নেই।
