মাদাম একস্ যেন শুনতেই পাননি রাউলের কথা। এক অদ্ভুত আনন্দ আর উন্মাদনার ভাব ফুটে উঠেছে তাঁর মুখমণ্ডলে। বাচ্চা মেয়েটি এসে দাঁড়িয়েছিল পর্দার ফাঁকে। মাদাম এক হাত বাড়িয়ে তাকে স্পর্শ করলেন।
সঙ্গে সঙ্গে মিডিয়াম সিমোনের মুখ থেকে বেরিয়ে এক তীব্র আর্তনাদ। অসহ্য যন্ত্রণায় যেন কষ্ট পাচ্ছে মিডিয়াম।
-হাঁ ঈশ্বর! এ কি সাংঘাতিক ব্যাপার! এ যে সহ্য করা যায় না, মিডিয়াম যে… রুক্ষ গলায় হেসে উঠে মাদাম একস্ বললেন, মঁশিয়ে রাউল, আপনার মিডিয়ামের জন্য আমার একটুও মাথাব্যথা নেই। আমি কেবল আমার হারানো মেয়েকে ফিরে পেতে চাই।
-আপনি উন্মাদ হয়ে গিয়েছেন, মাদাম। ঐ শিশু এ জগতের নয়। ওকে আর স্পর্শ করবেন না।
-স্পর্শ করব না মানে? ওকে যে আমার চাই। আমার দেহের মধ্যে ও তিল তিল করে গড়ে উঠেছে। আমার কাছ থেকে বহুদূরে চলে গিয়েছিল বাছা। কিন্তু মৃতের রাজ্য থেকে আমার অ্যামেলি সোনা আবার ফিরে এসেছে আমারই কাছে। ও তো মরে যায়নি… ও বেঁচে আছে। আয়.. আমার সোনা আমার কোলে আয়।
রাউল আবার চিৎকার করে উঠতে গেল। কিন্তু অপরিসীম আতংকে তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে। একটি শব্দও বেরোল না তার মুখ থেকে।
মাদাম এক ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছেন। পৃথিবীর সমস্ত নির্দয়তা, নির্মমতা, আদিম অসভ্যতা যেন মূর্তিমতী হয়ে উঠছে তার মধ্যে। অন্যের কথা ভাববার মত মানসিকতা আর তার মধ্যে নেই। নিজের অন্ধ আবেগেই তিনি মত্ত।
শিশু অ্যামেলির দুঠোঁট ফাঁক হলো। তৃতীয়বারের মত শোনা গেল কচি গলার ডাক, মা… মামণি!
-ও আমার সোনা… ও আমার মণি… কে বলে তুই মরে গিয়েছিস! …আয় আয় আমার কোলে আয়… আমার ভাঙা বুকখানাকে জুড়ে দে…
উন্মাদের মত ঝাঁপিয়ে পড়ে বাচ্চা মেয়েটিকে কোলে তুলে নিলেন মাদাম একস্। পর্দার ওপাশ থেকে ভেসে এল অসহ্য যন্ত্রণার এক দীর্ঘায়িত আর্তনাদ।
-সিমোন…সিমোন। রাউল চিৎকার করে উঠল। আচ্ছন্ন দৃষ্টিতে রাউল দেখল শিশুটিকে কোলে নিয়ে মাদাম একস্ দ্রুত চলে গেলেন তার পাশ দিয়ে। তালা খুলবার শব্দ শোনা গেল। তারপর শোনা গেল সিঁড়ির উপর পায়ের শব্দ। দরজা খুলে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেলেন মাদাম একস্।
পর্দার ওপাশ থেকে তখনও ভেসে আসছে আর্তনাদ। অসহ্য যন্ত্রণা ছাড়া এরকম আর্তনাদ কেউ করে না। এরকম আর্ত বিলাপ-ধ্বনি রাউল তাঁর জীবনে কোনদিন শোনেনি। আর্তনাদ ক্রমে মিলিয়ে গেল। শোনা গেল একটা বিশ্রী-বীভৎস ঘড় ঘড় শব্দ। তারপর ধপাস করে একটি শব্দ শোনা গেল। শব্দটা দেহপতনের।
উন্মাদের মত দেহের বাঁধন খুলবার চেষ্টা করতে লাগল রাউল। শেষ পর্যন্ত তার উন্মত্ত চেষ্টার কাছে মাদাম একস্-এর কঠিন বাঁধনও হার স্বীকার করতে বাধ্য। হলো। অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলল রাউল। সে শক্ত বাঁধন থেকে মুক্ত হলো।
রাউল উঠে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই এলিস ছুটতে ছুটতে ঘরে ঢুকে চিৎকার করে উঠল, মাদাম!… মাদাম! গলা চিরে, সিমোন! ডাকটা বেরিয়ে এল রাউলের।
দুজনে ছুটে গেল কালো পর্দাটার দিকে। একটানে সরিয়ে দিল পর্দাটা।
আর তক্ষুণি চমকে গিয়ে পিছিয়ে এল রাউল। উদ্ভ্রান্তভাবে সে বলে উঠল, হায় ঈশ্বর! রক্ত, এত রক্ত! জায়গাটা যে লালে লাল হয়ে গিয়েছে।
রাউলের পাশে শোনা গেল এলিসের রুক্ষ কণ্ঠস্বর। সে স্বর ভয়ে, বিস্ময়ে এবং উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছে।
তাহলে শেষ পর্যন্ত আমার মাদামকে জীবনটাই দিতে হলো! কিন্তু মঁশিয়ে রাউল, সত্যি করে বলুন কি হয়েছে? কি করে মাদাম একটুকুন হয়ে গেলেন। তার দেহটা যে ছোট হয়ে গিয়েছে-অর্ধেকেরও বেশি ছোট হয়ে গিয়েছে। এ কি করে হলো? কি কাণ্ড হচ্ছিল এখানে। বলুন মঁশিয়ে… বলুন… বলুন।
জানি না! রাউল উন্মাদের মত চিৎকার করে উঠল আমি জানি না।…আমি কিছু জানি না। একি হলো। এ আমি কি করলাম… ওই…। মৃত্যুপুরীর বাসিন্দাকে জীবনলোকে নিয়ে এসে সিমোন নিজেই যে মৃত্যুপুরীতে চলে গেল! আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করো না এলিস। আমি জানি না… কিছু জানি না… সিমোন! সিমোন!
