গম্ভীর হতাশায় সিমোন নিজের হাত ছুঁড়তে লাগল। ও যে খুব বিচলিত হয়ে পড়েছে তা আর বলবার অপেক্ষা রাখে না।
একটু আত্মস্থ হয়ে নিস্তেজ গলায় ও বলল, তোমার কথায় বড় কষ্ট পাচ্ছি রাউল। হয়তো তুমি যা বলছ তা-ই ঠিক। তোমার কথামতই কাজ করব আমি। কিন্তু এবার বুঝেছি আমি ভয় পাচ্ছি কেন। আমার ভয়ের কারণ হলো ছোট্ট একটা শব্দ।-আর সেই শব্দটি হলো, মা।।
কি বলছ সিমোন!
ঠিকই বলছি। জানো রাউল, প্রকৃতির রাজ্যে কিছু আদিম মৌলিক প্রবৃত্তির অস্তিত্ব রয়েছে। অবশ্য সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে তাদের অনেকগুলিই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। কিন্তু মাতৃত্ব-মায়ের প্রবৃত্তি কিন্তু আগের মতই রয়েছে। এ নষ্ট হয়ে যায়নি। এর রূপও পাল্টায়নি। এ ব্যাপারে পশু আর মানুষের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসার কোন তুলনা নেই পৃথিবীতে। এ ভালোবাসাকে আইনের বাঁধনে বাঁধা যায় না। এ ভালোবাসা নির্ভয়ে যে কোন পরিস্থিতির সামনে দাঁড়াতে পারে। এই অন্ধ ভালোবাসা নিজের পথে দাঁড়ানো যে কোন বাধাকে নিমর্মভাবে-নৃশংসভাবে ধ্বংস করে দিতে পারে। আমার ভয় এই প্রচণ্ড শক্তিসম্পন্ন মৌলিক প্রবৃত্তিটিকে।
একটানা এতক্ষণ কথা বলে সিমোন থামল। উত্তেজনা ও ক্লান্তিতে হাঁফাচ্ছে। রাউলের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল ও। তারপর বলল, আজ আমি নিতান্ত নির্বোধের মত কথা বলছি-আচরণ করছি, তাই না, রাউল?।
সস্নেহে সিমোনের হাত ধরে রাউল বলল, বুঝতে পেরেছি, তুমি খুব ক্লান্ত। যাও, যতক্ষণ মাদাম একস্ না আসেন, ততক্ষণ একটু বিশ্রাম নাও। শোবার ঘরে গিয়ে একটু শুয়ে থাক।
বেশ, রাউলের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে সিমোন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
চিন্তায় ডুবে গেল রাউল। তারপর বসবার ঘরের দরজা খুলে চলে এল পাশের হলঘরে। ছোট হলঘরটা পার হয়ে এবার সে এল পাশের আর একখানা ঘরে। এ ঘরখানাও আগের ঘরখানারই মত। ঘরের একপ্রান্তে রয়েছে একটি ক্ষুদ্র কুঠুরী। কুঠুরীর মধ্যে রয়েছে একখানা বড় হাতলওয়ালা বিরাট ইজিচেয়ার। কালো ভেলভেটের ভারী পর্দাগুলো এমনভাবে সাজানো যে ইচ্ছে করলে যে কোন মুহূর্তে এই ছোট ঘরখানাকে ঢেকে ফেলে দেওয়া যায়। আবার প্রয়োজন হলে পর্দার আবরণ সহজেই সরিয়ে ফেলে ছোট কুঠুরীখানাকে লোকচক্ষুর সামনে আনা যায়।
এলিস ঘর সাজাচ্ছিল। কুঠুরীর সামনে দুখানা চেয়ার আর একখানা গোল টেবিল। টেবিলের উপর একটা খঞ্জনি, একটা শিঙে, কয়েকখানা কাগজ আর পেন্সিল।
রাউলকে দেখে এলিস বলল, মঁশিয়ে, আজই কিন্তু শেষ প্রেত-চক্র। আজকের ব্যাপারটা ভালোয় ভালোয় মিটে গেলে রক্ষে পাই।
কলিংবেল-টা বেজে উঠল তীব্র তীক্ষ্মস্বরে।
যাও, দেখ গিয়ে কে এসেছেন। মনে হয় মাদাম একসই এসেছেন।
ঐ মহিলা তো গীর্জায় গিয়ে সন্তানের আত্মার মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করতে পারেন। গম্ভীর গলায় অনুযোগের সুরে এলিসা বলল।
কলিংবেল-টা আবার আর্তনাদ করে উঠল।
যাও, দেখ গিয়ে কে এসেছেন, আদেশের সুরে রাউল বলল।
গজগজ করতে করতে এলিস চলে গিয়ে একটু পরেই ফিরে এল। তার সঙ্গে একজন মহিলা। মহিলার দিকে তাকিয়ে এলিস বলল,
আপনি একটু বসুন মাদাম। আমার মাদামকে খবর দিচ্ছি যে আপনি এসেছেন।
মাদাম এক-এর সঙ্গে করমর্দন করবার জন্য রাউল এগিয়ে গেল। সিমোন ঠিকই বলেছে। বিরাট চেহারা ভদ্রমহিলার। যেমন লম্বা তেমনি মোেটা তার গায়ের রঙ অদ্ভুত রকমের তামাটে। হাত দুখানা সত্যিই পুরুষালি। ফরাসী দেশের প্রথা অনুযায়ী তার পরনে ফরাসী দেশের কালো পোশাক। মহিলার কণ্ঠস্বরও অত্যন্ত গম্ভীর।
আমার বোধ হয় আসতে একটু দেরি হয়ে গেল, গমগমে গলায় মাদাম একস্ বললেন।
হাসিমুখে রাউল বলল, হ্যাঁ, দেরি হলো। তবে বেশি নয়, মাত্র কয়েক মিনিট।
মাদাম সিমোন কোথায়?
মাদাম সিমোনের শরীরটা সুস্থ নয়। তিনি শুয়ে আছেন, রাউল উত্তর দিল। করমর্দনের পর ভদ্রমহিলা হাত সরিয়ে নিচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি শক্তভাবে রাউলের হাতটা চেপে ধরলেন। গম্ভীর অথচ তীক্ষ্মস্বরে জিজ্ঞেস করলেন, ও তাই বুঝি, তা মাদাম সিমোন আজ চক্রে বসতে পারবেন তো?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই বসবেন, রাউল দ্রুত উত্তর দিল।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন মহিলা। তারপর মুখের কালো আবরণটার বাঁধন খুলতে খুলতে একখানা চেয়ারে বসে পড়লেন।
আপন মনে নিচু গলায় তিনি বলতে লাগলেন, মঁশিয়ে রাউল, আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না এরকম প্রেত-চক্র আমার মনে কত আনন্দের সৃষ্টি করে। আমি অবাক হয়ে যাই। আমার একমাত্র সন্তান অ্যামেলি! সে আর আমার কাছে নেই। কিন্তু মাদাম সিমোন চক্রে বসলে আমি আমার ছোট্ট বাচ্চাকে দেখতে পাই… তার সঙ্গে কথা বলতে পারি… হয়তো সম্ভব হলে তাকে আমি স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারব।
দ্রুত কণ্ঠে রাউল বলল, না মাদাম একস, স্পর্শ করবার চেষ্টা মোটেই করবেন না। আমার নির্দেশ ছাড়া আপনি কোন কিছুই করতে পারবেন না। করলে সাংঘাতিক বিপদ হতে পারে।
আমার বিপদ হবে?
না মাদাম, বিপদের সম্ভাবনা মিডিয়ামের। প্রেত-চক্রে বিদেহী আত্মার দেহধারণের সময় যা ঘটে বিজ্ঞান তার ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করেছে। খুঁটিনাটি বা জটিলতার মধ্যে না গিয়ে আমি সহজভাবে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলবার চেষ্টা করছি। আমার কথাগুলো মন দিয়ে শুনুন।
