দেহধারণের কথা বলছ, গলায় স্বর নামিয়ে সিমোন বলল, ব্যাপারটা একটু পরিষ্কার করে বল, রাউল। তুমি তো জান, আমি যখন আবিষ্ট অবস্থায় থাকি তখন বাইরের জগৎ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অসচেতন থাকি। এই রূপধারণের ব্যাপারগুলো কি সত্যি ঘটে?
হ্যাঁ।
খুব সুন্দর হয়?
সিমোন আবার জিজ্ঞেস করল।
বিপুল উৎসাহে ঘাড় নাড়ল রাউল। বলল, প্রথমে দিকের কয়েকটা প্রেত-চক্রে অ্যামেলিয়াকে দেখা যাচ্ছিল একটা অস্পষ্ট কুয়াশার বৃত্তের মধ্যে। তাকে ঠিক পরিস্কারভাবে দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু শেষবারে যা হলো তা একেবারে অকল্পনীয়।
কি হলো শেষবারে? সিমোনের স্বরে একই সঙ্গে উৎকণ্ঠা আর কৌতূহল। ধীর গলায় রাউল বলল, শেষবারে বাচ্চাটা একেবারে রক্ত-মাংসের শরীর নিয়ে এসেছিল। দেখে মনে হচ্ছিল শিশুটি যেন সত্যিই জীবন্ত! আমি তাকে স্পর্শ পর্যন্ত করে দেখেছিলাম। কিন্তু দেখলাম তাতে তোমার খুব কষ্ট হয়। মাদাম এক-ও বাচ্চাকে স্পর্শ করবার জন্য উৎসুক হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু আমি তাকে স্পর্শ করতে দেইনি, কারণ আমার মনে হয়েছিল যে প্রয়াত সন্তানকে স্পর্শ করার সুযোগ পেলে সন্তানহারা জননীর ধৈর্যের বাধ হয়তো ভেঙ্গে যেতে পারে। তার ফলে নিজের অজ্ঞাতসারেই হয়তো তিনি তোমার কোন মারাত্মক ক্ষতি করে ফেলতে পারেন।
জানালার দিকে মুখ ফেরালো সিমোন। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল বাইরের দিকে। তারপর নিস্তেজ গলায় বলল,
যখন জ্ঞান হলো তখন আমি বড় ক্লান্ত। দেহ-মনে তখন আমি খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছি। কিন্তু রাউল, এসব কাজ কি ঠিক হচ্ছে? আমরা কোন অন্যায় কাজ করছি না তো? এলিস কি বলে জান?
কি বলে?
ও বলে আমরা নাকি ঈশ্বরের ইচ্ছার বিরুদ্ধে শয়তানের সঙ্গে কাজ-কারবার করছি।
সিমোন হাসল। কিন্তু কেন যে হাসল তা সে নিজেই জানে না।
আমি কি বিশ্বাস করি জানো? গম্ভীরভাবে রাউল বলল, অজানাকে নিয়ে নাড়াচাড়া করবার মধ্যে সব সময়েই বিপদের সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু কাজের পিছনের উদ্দেশ্যটা যদি ভালো হয় তবে বিজ্ঞানের স্বার্থে এটুকু বিপদের ঝুঁকি নেওয়াটা আমি সঙ্গত বলেই মনে করি। মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য-বিজ্ঞানের স্বার্থে বহু লোক জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে প্রাণ দিয়েছে। যুগ যুগ ধরে এটা চলে আসছে। এক যুগের মানুষ প্রাণ বিসর্জন দিয়ে অনুপ্রাণিত করে গিয়েছে পরের যুগের মানুষদের। তুমি যে প্রেত-চক্রে বসছ, তা বিজ্ঞানের জন্যই বসেছ। জ্ঞানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবার কাজে তোমার প্রচুর অবদান রয়েছে। দীর্ঘদিন এ কাজ করবার ফলে আজ তুমি দুর্বল হয়ে পড়েছ, এবার তোমার কাজের ইতি টানা হবে। আজকেই তোমার শেষ প্রেত-চক্র। এরপর থেকে শুরু হবে তোমার জীবন।
একটানা এতক্ষণ কথা বলে রাউল থামল।
রাউলের দিকে তাকাল সিমোন। একটুখানি হাসল, স্নেহের হাসি বলেই মনে হলো তার, এতক্ষণে তার উত্তেজনা বোধহয় কেটে গিয়েছে। ফিরে এসেছে। আগেকার স্বাভাবিক স্থিরতা। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে নিস্তেজ গলায় সে বলল, মাদাম একস্-এর আসবার সময় পার হয়ে গিয়েছে। উনি তো দেরি করেন না। হয়তো আজকে আর আসবেনই না উনি।
আমার কিন্তু মনে হয় উনি ঠিকই এসে যাবেন। তোমার ঘড়িটা বোধহয় ঠিক সময় দিচ্ছে না, হয়তো সঠিক সময় থেকে এগিয়ে রয়েছে।
ঘরের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে ছোটখাট জিনিসপত্র নাড়াচাড়া করতে করতে সিমোন বলল।
মাদাম একস্ কে? তার সত্যিকারের পরিচয় কি? কোথা থেকে এলেন তিনি? তিনি কোন্ দেশের-কোন্ জাতের? তার আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধব কে আছে?–এর একটা প্রশ্নেরও জবাব দিতে পারব না আমরা। আসলে তার সম্বন্ধে কিছুই জানি না আমরা। একস্ তার আসল নাম হতে পারে না। তিনি আমাদের কাছে এসেছেন ছদ্ম পরিচয়ে।
কাঁধ ঝাঁকিয়ে রাউল বলল, এর মধ্যে আর অবাক হবার কি আছে? অনেক লোকই মিডিয়ামের কাছে আসল পরিচয় গোপন করেই আসে। সাবধানতার জন্যই এটা করা হয়।
বোধহয় তাই, নিরুত্তাপ গলায় সিমোন বলল। ওর হাতে ছিল একটা ছোট চীনেমাটির ফুলদানী। হঠাৎ সেটা পড়ে গিয়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। চমকে সেদিকে ফিরে তাকাল সিমোন। তারপর রাউলের দিকে ফিরে বলল, দেখেছো আমার মধ্যে আর আমি নেই। আচ্ছা রাউল, আমি যদি মাদাম একত্সকে বলি যে, আজ চক্রে বসা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, তবে কি খুব অন্যায় কিছু হবে?
রাউলের মুখে ফুটে উঠল একই সঙ্গে বিস্ময় এবং বেদনাবোধ। তা দেখে সিমোনের মুখখানা লাল হয়ে উঠল।
ধীর গলায় রাউল বলল, তুমি কিন্তু কথা দিয়েছিলে, সিমোন।
পিছিয়ে গেল সিমোন। তার পিঠ দেওয়াল স্পর্শ করল। আর্তকণ্ঠে সে বলল, এ কাজ থেকে আমাকে মুক্তি দাও রাউল। আমি আর পারছি না…সত্যিই পারছি না…।
রাউলের চোখে ফুটে উঠল নরম ভর্ৎসনার দৃষ্টি। সে দৃষ্টির সামনে সিমোন আবার গুটিয়ে গেল।
রাউল বলতে লাগল, টাকার জন্য আমি মোটেই ভাবছি না, সিমোন। অবশ্য এই শেষ প্রেত-চক্রের জন্য মাদাম একস্ যে টাকাটা দিতে চাইছেন তার অঙ্কটা বিরাট।
তাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে সিমোন বলল, সবকিছু কি টাকা দিয়ে কেনা, যায় রাউল?
নিশ্চয়ই যায় না। এ ব্যাপারে তোমার সঙ্গে আমি একমত। কিন্তু লক্ষ্মী সিমোন, একটা কথা ভেবে দেখ।
কি কথা?
মনে কর তুমি সত্যিই অসুস্থ নও। কিন্তু সেক্ষেত্রেও কোন ধনী মহিলার অনুরোধে চক্রে-বসা বা না-বসাটা সম্পূর্ণভাবে তোমার ইচ্ছাধীন। কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যাপারটা অন্যরকম। ভেবে দেখ, মাদাম একস্ একজন মা। এই মা সদ্য তার একমাত্র সন্ত নিকে হারিয়েছেন। তিনি যদি শেষবারের মত তার সন্তানকে দেখতে চান, তুমি তাঁকে দেখার সুযোগ দেবে না? সন্তানহারা মাকে তুমি এটুকু দয়া দেখাবে না?
