তোমার তুলনা নেই সিমোন, নিজের দুহাত দিয়ে সিমোনের হাত দুটো চেপে ধরে রাউল বলল, তুমি অনন্যা। তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মিডিয়াম। এ ব্যাপারে তোমার শ্রেষ্ঠতা সবাই স্বীকার করতে বাধ্য।
একটু হেসে নেতিবাচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল সিমোন।
তুমি মাথা নাড়লে কি হবে, আমি সত্যি কথাই বলছি। এই দেখ… পকেট থেকে দুখানা চিঠি বের করল রাউল, বলল, এই যে, এই চিঠিখানা এসেছে। অধ্যাপক রোশের কাছ থেকে আর এই চিঠিখানা লিখেছেন ডক্টর জেনির, দুজনে একই অনুরোধ করেছেন।
কি অনুরোধ? ভীরু গলায় সিমোন জিজ্ঞেস করল।
দুজনেই অনুরোধ করেছেন তুমি যেন মাঝে মাঝে মিডিয়াম হিসেবে তাদের প্রেত-চক্রে অংশগ্রহণ করো।
না-না-না-মোটেই না! সোফা ছেড়ে একলাফে উঠে দাঁড়াল সিমোন, কক্ষনো করব না ও কাজ। সবকিছুরই একটা সীমা আছে। এবার এ কাজে ইতি টানব। তুমি… তুমি… নিজেও তো আমায় কথা দিয়েছ। রাউল।
অবাক হয়ে সিমোনের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রাউল। ভয়ে, উত্তেজনায় সিমোন কাঁপছে। ওকে দেখাচ্ছে কোণঠাসা প্রাণীর মত। সোফা থেকে উঠে ওর হাত ধরল রাউল, যেন সাহস দিতে চাইল ওকে। তারপর আশ্বস্ত করবার সুরে বলল, হ্যাঁ, ও সব প্রেত-চক্রের ব্যাপার-স্যাপার তো শেষই হয়ে গিয়েছে। তোমাকে নিয়ে আমার খুব অহংকার সিমোন, তাই চিঠি দুটো দেখালাম।
সন্দেহের দৃষ্টিতে রাউলের দিকে তাকাল সিমোন, বলল, তাহলে ধরে নিচ্ছি যে তুমি আর কখনও আমাকে প্রেত-চক্রে বসতে বলবে না।
না না, রাউল আশ্বাস দেবার ভঙ্গিতে বলল, তবে…
তবে কী? রাউলের তার বক্তব্য শেষ করতে না দিয়েই সিমোন প্রশ্ন করল।
মানে…এসব বিখ্যাত লোকদের জন্য তুমি যদি স্বেচ্ছায় মাঝে মাঝে বসতে রাজী হও তবে।
না না, মোটেই না। আর কখনও চক্রে বসব না আমি, উত্তেজিতভাবে রাউলকে বাধা দিল সিমোন, চক্রে বসার মধ্যে বিপদ আছে। সে বিপদ বড় ভয়ঙ্কর।
দুহাতে নিজের কপাল টিপে ধরল সিমোন, দাঁড়াল গিয়ে জানালার কাছে। রাউলের দিকে মুখ ফিরিয়ে অনুনয়ের সুরে বলল, কথা দাও, আর কখনও আমাকে চক্রে বসতে বলবে না।
রাউল এগিয়ে গেল ওর দিকে। সিমোনের দুকাঁধের উপর নিজের হাত রেখে কোমল কণ্ঠে বলল, সিমোন, ডার্লিং। কথা দিচ্ছি আজ রাতের পর আর কোনদিন তোমায় প্রেত-চক্রে বসতে বলব না।
চমকে উঠল সিমোন। রাউল পরিষ্কার বুঝতে পারল ওর চমকানি।
আজ! ভীরু গলায় সিমোন বলল, হ্যাঁ, আজকেই তো মাদাম একস্-এর আসবার কথা। আমি তো একদম ভুলেই গিয়েছিলাম তার কথা।
ঘড়ির দিকে তাকাল রাউল। বলল, মাদাম একস-এর আসবার সময় হয়ে গিয়েছে। যে কোন মুহূর্তে তিনি এসে যাবেন। কিন্তু সিমোন, তোমার শরীর যদি সুস্থ না থাকে…
রাউলের কথা যেন শুনতেই পেল না সিমোন। সে নিজের চিন্তায় ডুবে গিয়েছে।
মাদাম একস্! সত্যি বলছি রাউল, খুব অদ্ভুত এক মহিলা উনি। ওকে দেখলে আমার বড় ভয় হয়।
সিমোন।
রাউলের গলায় ভৎর্সনার সুর বেজে উঠল। সে সুরটা ধরতে পারল সিমোন। রাউলের দিকে তাকিয়ে সে বলতে লাগল, জানি রাউল, তুমি অন্য ফরাসীদের মত। তোমার কাছে মা হলো অত্যন্ত পবিত্র। সন্তানহারা শোকাকুলা মা সম্পর্কে এরকম ধারণা পোষণ করা যে উচিত নয় তা আমি ভালো করেই জানি। এটা আমার নির্বুদ্ধিতা, নিষ্ঠুরতাও বলতে পার। কিন্তু রাউল… আমি তোমাকে ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারব না… ভদ্রমহিলা এত মোটা… ওঁর গায়ের রঙটা কেমন অদ্ভুত রকমের তামাটে। তার উপর আবার মহিলার হাত দুখানা… হাত দুটো লক্ষ্য করে দেখেছ? কি বিরাট… কি বলিষ্ঠ হাত দুখানা! ঠিক যেন পুরুষের হাত! উঃ কি ভয়ানক!
কেঁপে উঠল সিমোন। চোখ বুজল। কাঁধের উপর থেকে নিজের হাত সরিয়ে নিল রাউল তারপর ঠাণ্ডা গলায় বলল, তোমাকে ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না সিমোন।
কেন?
আচ্ছা, তুমি তো একটা মেয়ে, আর অপর একজন নারীর প্রতি তোমার সহানুভূতি এবং সমবেদনা থাকা উচিত। ভদ্রমহিলা সদ্য সন্তানহারা হয়েছেন। মেয়েটি ছিল ওর একমাত্র সন্তান। সন্তানহারা শোকাকুলা মায়ের উপর তোমার দয়া হয় না? হওয়া উচিত।
অস্থির হয়ে উঠল সিমোন। তুমি কিছুই বুঝতে পারছ না রাউল। মনের এই অনুভূতি কারো চাওয়া-না-চাওয়ার উপর নির্ভর করে না। মাদাম একসূকে যখন প্রথম দেখলাম তখনই এ আতংকের অনুভূতি আমার মনকে গ্রাস করে ফেলেছে।
তোমার ধারণার কোন বাস্তব ভিত্তি নেই, রাউল বোঝাবার চেষ্টা করল।
অস্থিরভাবে নিজের হাত সরিয়ে দিল সিমোন, উত্তেজিতভাবে বলতে লাগল, তোমাকে আমি কিছুতেই বোঝাতে পারব না রাউল। তুমি বুঝতেই চাইছ না, মাদাম একস্-কে দেখলে আমি আঁতকে উঠি। দারুণ ভয়ে আমার মনটা কুঁকড়ে যায়। তোমার বোধহয় মনে আছে তার হয়ে প্রেত-চক্রে বসতে আমি দ্বিধা করছিলাম-রাজী হয়েছিলাম অনেক পরে। আমার ধারণা হয়েছিল, তার জন্য আমার ভয়ঙ্কর কোন অমঙ্গল হবে। যেমন করেই হোক তিনি জীবনে মহাবিপদকে আহ্বান করে আনছেন।
কাঁধ ঝাঁকিয়ে রাউল বলল, আসলে ব্যাপারটা হয়েছিল ঠিক উল্টো। মাদাম একস্-এর জন্য তুমি যে কটা প্রেত-চক্রে বসেছ তার সবকটিই খুব সফল হয়েছে। ছোট্ট অ্যামেলির বিদেহী আত্মা খুব সহজেই তোমার উপর প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিল। মৃত অ্যামেলির দেহধারণগুলো হয়েছিল অতি চমৎকার। শেষ বৈঠকের সময় যদি অধ্যাপক রোশ উপস্থিত থাকতেন তবে খুব ভালো হত।
