কিন্তু আমরা যে কথা দিয়েছি। শুধু তা-ই নয়, আগাম টাকা পর্যন্ত নিয়েছি।
তাতে কি, জানিয়ে দিন মিডিয়াম অসুস্থ। আজ তিনি চক্রে বসতে পারবেন না।
ওদের কথার মাঝখানে দরজা খুলে ঘরে ঢুকল এক সুতনুকা নারী, দীর্ঘকায়া, গৌরবর্ণা, ক্ষীণদেহে কমনীয়তা আর লাবণ্যের অভাব নেই, মেয়েটির মুখখানা মহাশিল্পী বতিচেলির আঁকা ম্যাডোনার ছবির মত। রাউলের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এলিস তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সিমোন! রাউলের কণ্ঠে আবেগ।
রাউল, প্রিয়তম।
নিজের দুহাত বাড়িয়ে রাউল সিমোনের দীর্ঘ শ্ৰদ্ৰ হাত দুখানি ধরল। তারপর দুবার চুমু খেল সুন্দর হাত দুখানিতে। সুতনুকা নারী আবেগভরে মৃদুস্বরে বলতে লাগল, রাউল, প্রিয়…প্রিয়তম!
রাউল আবার ওর সাদা হাত দুটোতে চুম্বন করে ব্যগ্রভাবে তার দিকে তাকিয়ে উৎকণ্ঠিত স্বরে বলল, সিমোন, তোমার চেহারাটা বড় ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে, এলিস বলল তোমার নাকি মাথায় যন্ত্রণা, বলল তুমি বিশ্রাম করছ। তোমার কি শরীর খারাপ হয়েছে? তুমি কি অসুস্থ?
না না, ঠিক অসুস্থ নই, ইতস্তত গলায় সিমোন বলল।
সিমোনের হাত ধরে সোফার দিকে এগোল রাউল। ওকে সোফায় বসাল। নিজে বসল ওর পাশে, তারপর জিজ্ঞেস করল,
তাহলে বল কি হয়েছে তোমার?
রাউলের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল সিমোন, কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে বসে রইল, ওর দৃষ্টি মেঝের কার্পেটের দিকে। তারপর নিচু গলায় দ্রুত বলে ফেলল,
আমি ভয় পেয়েছি…বড্ড ভয় পেয়েছি, রাউল।।
কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করল রাউল। ভাবল সিমোন হয়তো আরো কিছু বলবে। কিন্তু যখন দেখল মেয়েটি আর কিছু বলছে না তখন তাকে কিছুটা সাহস আর উৎসাহ দেবার জন্য বলল,
ভয়! কিসের জন্য ভয়? কাকে ভয়?
জানি না, তবে ভয় পেয়েছি।
কিন্তু কেন? বিস্ময় বিমূঢ় দৃষ্টিতে রাউল তাকাল সিমোনের দিকে।
রাউলের প্রশ্নের উত্তর এল সঙ্গে সঙ্গেই। তার দিকে তাকিয়ে সিমোন বলল,
জানি তুমি অবাক হবে। কিন্তু আমি যে ভয় পেয়েছি তার মধ্যে একবিন্দু মিথ্যে নেই। কিসের ভয়… কেন ভয়… কাকে ভয় এসব আমি কিছু জানি না, সব সময়েই এক অজানা আতংক কালো মেঘের মত আমার মনের আকাশকে ছেয়ে ফেলেছে। মনে হয় আমার জীবনে একটা ভয়ঙ্কর কিছু ঘটতে চলেছে। মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা, তার উপর এই অজানা আতংক, রাউল, আমি বোধহয় পাগল হয়ে যাব।
শূন্য দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল সিমোন। নরম হাতে তাকে জড়িয়ে ধরে রাউল বলল, না ডার্লিং, এভাবে হাল ছাড়ছ কেন? এমন করে ভেঙে পড়লে তো চলবে না, তোমার কি হয়েছে তা আমি বুঝতে পেরেছি। তুমি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছ। অতি পরিশ্রমের ফলেই এসেছে এই ক্লান্তি। মিডিয়ামের জীবনে এরকম ক্লান্তি আসতেই পারে। তোমার এখন যা দরকার তাহলো বিশ্রাম-পরিপূর্ণ বিশ্রাম। আর সেই সঙ্গে চাই মানসিক শান্তি।
সিমোনের মুখে ফুটে উঠল কৃতজ্ঞতার ছাপ। রাউলের দিকে কৃতজ্ঞদৃষ্টিতে তাকিয়ে সে বলল, তুমি ঠিকই বলেছ রাউল। এখন আমার দরকার পরিপূর্ণ বিশ্রাম আর শান্তি।
চোখ বুজে রাউলের বাহুমূলে মাথা রাখল সিমোন। নিজের দেহটাকে এলিয়ে দিল রাউলের হাতের ওপর। আমি তোমার উপর এমনি করে নির্ভর করতে চাই, একটুখানি সুখ চাই। আমার চাহিদাটা খুব বেশি নয় রাউল, অস্ফুটস্বরে সিমোন বলল।
তাকে আরও কাছে টেনে নিল রাউল, সিমোনের চোখ দুটি তখনও বন্ধ। তার বুক থেকে বেরিয়ে এল দীর্ঘনিঃশ্বাস। মৃদুকণ্ঠে সে বলল, রাউল, প্রিয়তম, তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরলে আমি সবকথা ভুলে যাই। ভুলে যাই কি ধরনের জীবন আমাকে কাটাতে হচ্ছে। মিডিয়ামের জীবন বড় দুর্বিষহ-বড় ভয়ংকর। কিন্তু তোমার আলিঙ্গনে বাঁধা পড়লে এ শঙ্কাতুর জীবনের কথাও আমি ভুলে যাই। তখন নিজের নিরাপত্তা সম্বন্ধে আমার মনে আর কোন সংশয় থাকে না। তুমি তো অনেকেটাই জান রাউল, তবু বলব মিডিয়ামের জীবনের সবকিছু তুমি জানো না।
রাউলের মনে হলো তার আলিঙ্গনে বাঁধা সিমোনের শরীরটা যেন ক্রমেই শক্ত। হয়ে উঠছে, একটা আড়ষ্টতা যেন আচ্ছন্ন করে ফেলছে তার সুন্দর দেহ-লতাটিকে।
চোখ খুলল সিমোন। শূন্য দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে আপন মনেই সে বলতে লাগল।
ছোট একখানা অন্ধকার ঘর। তার মধ্যে আমি বসে থাকি। অপেক্ষা করি। আমার চারপাশে পুঞ্জ পুঞ্জ অন্ধকার। বড় ভয়ঙ্কর এই নিরন্ধ্র অন্ধকার। এ অন্ধকারের মধ্যে রয়েছে কেবল শূন্যতা আর শূন্যতা। স্বেচ্ছায় এই অন্ধকার রাজ্যে নিজেকে ছেড়ে দিই। আমার চারপাশে অন্ধকার যেন জমাট বেঁধে আরো ঘন হয়ে ওঠে। সেই অন্ধকারে অপেক্ষা করতে করতে আমার চেতনার উপরও ধীরে ধীরে নেমে আসে অন্ধকার। আমি অচেতন হয়ে পড়ি। তারপর যা ঘটে তার কিছুই জানতে পারি না আমি। আমার কোন অনুভূতি পর্যন্ত থাকে না। শেষ পর্যন্ত ধীরে ধীরে অনেক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে ফিরে আসে আমার চেতনা, মনে হয় দীর্ঘ ঘুমের পর আমি যেন জেগে উঠলাম, তারপর এক অপরিসীম ক্লান্তিতে আমার সমস্ত দেহ মন যেন আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
জানি ডার্লিং, আমি জানি, নরম গলায় রাউল বলল।
সে যে কি ভয়ঙ্কর ক্লান্তি তা আমি বুঝিয়ে বলতে পারব না,নিস্তেজ গলায় সিমোন বলল, একথা বলতে বলতে সিমোনের শরীরটা যেন আরো এলিয়ে পড়ল।
