পরলোক সম্পর্কে তোমার চিন্তা-ভাবনা দেখছি একেবারে জটিলতা মুক্ত। এ সম্পর্কে তোমার হিসেব-নিকেশও দেখছি খুবই সহজ।
আপনাদের বিয়ের পরে আর প্রেতাত্মা নিয়ে এসব চক্র-টক্র করবেন না তো, মঁশিয়ে? এলিস প্রশ্ন করল, তার কণ্ঠস্বরে অনুরোধের সুর।
আরে না, না, এলিসের দিকে তাকিয়ে রাউল হাসল।
সত্যি বলছেন?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, তুমি মাদামকে খুব ভালোবাস, তাই না এলিস?
হ্যাঁ, বৃদ্ধা অকপটে স্বীকার করল।
মাদামও তোমাকে খুব বিশ্বাস করেন?
আমার তো তা-ই মনে হয়।
চিন্তা করো না এলিস, বিয়েটা একবার হয়ে যাক, তারপর এসব প্রেতাত্মা আর পরলোকের কারবার একেবারে তুলে দেব, আমার স্ত্রীকে আর এসব অপ্রাকৃত ব্যাপার নিয়ে মোটেই মাথা ঘামাতে দেব না। এ নিয়ে কোন ঝামেলায়ই পড়তে হবে না তাকে।
এলিসের মুখখানা হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল, ব্যগ্রভাবে সে বলল।
সত্যি?…সত্যি বলছেন মঁশিয়ে?
হ্যাঁ, গম্ভীরভাবে রাউল জবাব দিল।
স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল স্নেহময়ী এলিস, বৃদ্ধা পরিচারিকা সত্যি সত্যিই তার তরুণী মাদামকে ভালোবাসে।
চাপা গলায় রাউল বলতে লাগল, সত্যি, সিমোনের মধ্যে একটা অদ্ভুত-একটা আশ্চর্য ক্ষমতা রয়েছে। আর সে অলৌকিক ক্ষমতা ও প্রয়োগ করেছে বারবার। কিন্তু আর নয়। এবার এ ব্যাপার ইতি টানা উচিত। আমি সিমোনকে ভালোবাসি। আমি কি আর ওর অবস্থা লক্ষ্য করিনি? তুমি মাদামকে ভালোবাস এলিস, তুমি ঠিক কথাই বলেছ। তোমার মাদাম যে দিন দিন রোগা আর ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছেন তা আমার নজর এড়ায়নি। সবই জানি আমি। জানি, একজন মিডিয়াম-এর দেহ এবং মনের উপর কি প্রচণ্ড চাপ পড়ে সেই দারুণ স্নায়বিক চাপ সহ্য করা খুবই শক্ত। কিন্তু এলিস, একটা কথা তোমাকে স্বীকার করতেই হবে। কথাটা হলো এই যে তোমার মাদাম প্যারিস শহরের সবচেয়ে শক্তিশালী মিডিয়াম। কিন্তু না, কেবল প্যারিস শহর নয়, সারা ফরাসী দেশে ক্ষমতার দিক দিয়ে মাদামের সমতুল্য মিডিয়াম আর নেই। আমি একটুও বাড়িয়ে বলছি না এলিস। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের লোক তোমার মাদামের কাছে আসে। তাদের ধারণা এ মিডিয়ামের কাছে কোন ভণ্ডামি বা জালিয়াতি নেই। এখানে এলে তারা ঠকবেন না।
ঠকবে? মাদামের কাছে? তপ্তস্বরে এলিস বলল, আমার মাদামের মতো সৎ মেয়ে আমি খুব কমই দেখেছি। উনি চেষ্টা করলেও কাউকে ঠকাতে পারবেন না এমনকী একটা হাবাগোবা বাচ্চাও ঠকবে না তার কাছে।
ঠিকই বলছ তুমি। এক এক সময় মনে হয় তোমার মাদাম যেন এ পৃথিবীর কেউ নয়, ও যেন নেমে এসেছে স্বর্গের নন্দনকানন থেকে। মর্ত্যলোকে নিয়ে এসেছে স্বর্গলোকের অমৃত বার্তা।
এলিস খুশি নিয়ে তাকিয়ে রইল রাউলের দিকে।–আচ্ছা এলিস, তোমার মাদামকে তো আর মিডিয়ামের কাজ করতে হবে না; এরপর থেকে তো তিনি মনের সুখে ঘরকান্না করবেন। এ কথা শুনে তুমি নিশ্চয়ই খুব খুশি হয়েছ?
এলিস হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল। রাউল ভেবেছিল খবরটা শুনে বৃদ্ধা খুবই খুশি হবে। কিন্তু ও হঠাৎ গম্ভীর গেল কেন?
কি ব্যাপার, এলিস?
ভাবছি একটা কথা, গম্ভীর মুখে এলিস বলল।
কি কথা?
মঁশিয়ে, আপনি তো বলছেন মাদাম প্রেতাত্মাদের সঙ্গে কাজ-কারবার ছেড়ে। দেবেন, কিন্তু প্রশ্ন হলো প্রেতাত্মারা যদি মাদামকে ছেড়ে না দেয়?
তার অর্থ?
প্রেতাত্মারা যদি না ছাড়ে?
কি বলতে চাইছ তুমি? একটু অসহিষ্ণু স্বরেই রাউল প্রশ্ন করল।
ব্যাপারটা কি জানেন মঁশিয়ে, পরলোকের বাসিন্দাদের নিয়ে বেশি কারবার করলে অনেক সময় তারা আর মিডিয়ামকে ছাড়তে চায় না। আমার ভয় তো সেখানে।
আমার ধারণা ছিল তোমার মধ্যে কোন কুসংস্কার নেই, রাউল বলল।
অহেতুক কুসংস্কার আমার মধ্যে নেই মঁশিয়ে, তবে…
তবে কি? তুমি বলতে চাইছ গুছিয়ে বল।
আমি যা বলতে চাই, তা ঠিক গুছিয়ে বলতে পারব না সঁশিয়ে। আগে ভাবতাম মিডিয়ামরা হলো ধূর্ত এবং প্রতারক। প্রিয়জনের বিয়োগে ব্যথাতুর মানুষদের তারা নানা কৌশলে ঠকায়। কিন্তু মাদামকে দেখে বুঝেছি যে আমার ধারণা পুরোপুরি সত্য নয়। আমার মাদাম সহজ-সরল মানুষ, উনি অত্যন্ত সৎ।
সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই, রাউল বলল।
চাপা গলায় শঙ্কা-বিহ্বল গলায় এলিক বলল, এখানে যা ঘটে তার মধ্যে কোন কৌশল বা চাতুরি নেই। যা দেখা যায় তা সত্যি সত্যিই ঘটে। আর… আর সে জন্যই আমার ভয় হয়… খুব ভয় হয়। মঁশিয়ে, এসব কাজ করা মোটেই উচিত নয়। এ জগৎ আর পর জগতের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন প্রকৃতির বিধান নয়। আমরা প্রকৃতির বিরুদ্ধে কাজ করছি- কাজ করছি ঈশ্বরের ইচ্ছার বিরুদ্ধে। এই অস্বাভাবিক কাজের জন্য একদিন চরম মূল্য দিতেই হবে।
এলিসের দুকাঁধে হাত রেখে রাউল তাকে আশ্বস্ত করবার চেষ্টা করল। বলল, স্থির হও এলিস, কেন ঘাবড়ে যাচ্ছ? শোন, তোমাকে একটা সুসংবাদ দেই। আজকেই আমার শেষ প্রেত-বৈঠক। এরপর আর পরলোক বা ভূত প্রেত নিয়ে আমরা মাথা ঘামাব না।
আজকেও আবার একটা বৈঠক আছে? আতংকভরা গলায় এলিস প্রশ্ন করল।
হ্যাঁ, আর এটাই শেষ বৈঠক।
এলিস যে অসন্তুষ্ট হয়েছে, ওর মুখের ভাবে তা স্পষ্ট বোঝা গেল। মাথা নেড়ে বলল, কিন্তু মাদাম বোধহয় আজ চক্রে বসতে পারবেন না।
কেন? রাউলের কণ্ঠে স্পষ্ট অসন্তোষের সুর।
মাদাম অসুস্থ, মাথার যন্ত্রণায় তিনি কষ্ট পাচ্ছেন। আজ চক্রে বসলে তিনি আরও অসুস্থ হয়ে পড়বেন।
