ঘুম ভেঙে গেল রোজমেরীর। স্বপ্নটাকে তার খুব বাস্তব মনে হতে লাগল। ভয়ে ভয়ে সে পোর্সেটের দিকে তাকাল। ভেবেছে ওখানে গ্রেগরীর ছবির বদলে রাশান কোন সৈনিককে দেখবে।
না, গ্রেগরী আছেন আগের জায়গাতেই।.শান্ত, স্থির ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছেন ওর দিকে।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল রোজমেরী। তুমি তাহলে এখনও ওখানে আছ। বেশ।
সাহস রাখো। পোট্রটকে যেন বলতে শুনল রোজমেরী।
স্কুলের কাউকে গ্রেগরী সম্পর্কে কিছু বলল না রোজমেরী। ব্যাপারটা গোপন থাকল। তবে গ্রেগরী তার মনে সত্যি সাহস এনে দিলেন। একটা ছোট্ট ঘটনাই এর প্রমাণ।
রোজমেরীদের স্কুলে একটি খেলা খেলে সবাই। প্রথমে বৃত্তাকারে দাঁড়ায় মেয়েরা, একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মাঝখানে, ঘোরাতে থাকে একটি রশি, রশির অন্যপাশ চাপা থাকে পাথর দিয়ে। এখন ঘুরন্ত ওই রশি এক লাফে পার হয়ে যেতে হবে। টাইমিংটা এক্ষেত্রে নিখুঁত হওয়া চাই। আর এখানটায় রোজমেরীর গড়বড় হয়ে যায়। সে রশি পার হতে গিয়ে প্রতিবার আছাড় খেয়েছে। আর ক্লাসশুদ্ধ মেয়ে হেসে উঠেছে, সেই সাথে পি.টি টিচার মিস ব্রিগসের কঠিন ধমক তো আছেই।
তবে এবার ঠিক ঠিক রশি পার হয়ে গেল রোজমেরী। সে যখন লাফ দেবে ঠিক করেছে, ঠিক সেই মুহূর্তে গ্রেগরীর গলা শুনতে পেল, ওকে অভয় দিচ্ছেন তিনি, মাথা ঠাণ্ডা রাখতে বলছেন। তারপর বলে উঠলেন: এখন! লাফাও!
লাফ দিল রোজমেরী এবং চমৎকারভাবে রশি পার হয়ে গেল। মিস ব্রিগস স্বীকার করতে বাধ্য হলেন আগের চেয়ে অনেক উন্নতি হয়েছে রোজমেরীর। কিন্তু রোজমেরী তো জানে কৃতিত্বটা আসলে কার।
সেদিন স্কুল লাইব্রেরীতে গিয়ে ক্রিমিয়ার যুদ্ধের ওপর বই খোঁজ করল রোজমেরী।
অত কঠিন বই তুমি কিছুই বুঝতে পারবে না, খুকী, লাইব্রেরিয়ান বলল ওকে। সত্যি পড়বে?
মাথা দোলাল রোজী। জ্বী, কারণ আমাদের পরিবারের একজন ওই যুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। তাঁর ছবি আছে আমার কাছে। আমি যুদ্ধটি সম্পর্কে জানতে চাই।
টিফিন পিরিয়ডে খেলার মাঠে বসে ইঙ্কারম্যানের যুদ্ধ সম্পর্কিত লেখা সমস্ত তথ্য গোগ্রাসে গিল রোজমেরী। শিউরে উঠল যুদ্ধের ভয়াবহতার কথা জেনে। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের কথাও উল্লেখ আছে, উনি যুদ্ধাহত মানুষের সেবা করেছেন। গ্রেগরীর সাথে কি ফ্লোরেন্সের সাক্ষাৎ হয়েছিল, ভাবল সে।
রোজমেরী ঠিক করল বড় হয়ে সে নার্স হবে, মানুষের সেবা করবে। কল্পনায় দেখল হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডে সে হেঁটে যাচ্ছে, বিছানায় শুয়ে থাকা রোগীদের কুশল জিজ্ঞেস করছে। তারপর দেখল সম্পূর্ণ সাদা পোশাকে সে চার্চে যাচ্ছে, সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছে তরবারি হাতে লম্বা এক সৈনিক, অপেক্ষা করছে তার জন্যে।
বই পোকা! খেলার মাঠে এক মেয়ে ঠাট্টা করে ডাকল রোজমেরীকে। সাথে সাথে কল্পনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে এল রোজী। বইয়ের আরেকটি পাতা ওল্টাতেই গ্রেগরীর নাম চোখে পড়ল তার। তার পূর্ব পুরুষের নাম সত্যি আছে ইতিহাস বইতে! ক্যাপ্টেন গ্রেগরী হ্যাঁসকস। আবার কল্পনার ডানায় ভর করল রোজমেরী। দেখল টিভিতে কুইজ প্রতিযোগিতা হচ্ছে। প্রশ্নকর্তা জিজ্ঞেস করলেন: ক্যাপ্টেন গ্রেগরী হ্যাঁসকস কে ছিলেন?
প্রত্যেকে তার বাযারে চাপ দিল, প্রথম জন বলল: ব্যাটল অভ ইষ্কারম্যানের হিরো ছিলেন তিনি।
গর্বে বুক ফুলে গেল রোজমেরীর। আমাকে আর কেউ ভীতু বলতে পারবে না, মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল সে। আমি ক্যাপ্টেন হ্যাঁসকসের নাম রক্ষা করব।
.
মাকে বইটি দেখানোর জন্যে ব্যাকুল হয়ে উঠল রোজমেরী, ছুটল বাড়ির দিকে। মা সাধারণত দোর গোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকেন তার জন্যে। আজ তাঁকে দেখা যাচ্ছে না। কলিংবেল টিপল রোজমেরী, অপেক্ষা করছে। অনেকক্ষণ পরেও কারও সাড়াশব্দ না পেয়ে ভয় লাগল ওর। মা কি কোথাও গেছেন? ফেরার পথে অ্যাক্সিডেন্ট করেছেন? নাকি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন?
হঠাৎ ঝড়াং করে খুলে গেল দরজা, চৌকাঠে এসে দাঁড়াল কুৎসিত দর্শন, বিশালদেহী এক লোক।
এতক্ষণে স্কুল থেকে ফেরার সময় হলো, খুকী! বলল সে বিশ্রী হেসে।
এক পা পিছিয়ে গেল লোকটা, ভেতরে ঢুকতে দিল রোজমেরীকে। মাকে এই সময় দেখতে পেল সে। ম্লান, বিবর্ণ, থরথর করে কাঁপছেন ভয়াল দর্শন লোকটার পেছনে দাঁড়িয়ে।
ওহ্, রোজী, আমার সোনা, প্রায় ডুকরে উঠলেন তিনি, তারপর লোকটাকে বললেন, এবার তুমি চলে যাও, প্লীজ। বললামই তো আমাদের এখানে তোমার কোন কাজ নেই। দয়া করে চলে যাও!
রোজী, বলল লোকটা। বেশ সুন্দর নাম। লোকটার গলায় এমন কিছু ছিল, ভয় পেয়ে গেল রোজমেরী, তুমি দেখতেও ভারী সুন্দর। ঘুরে দাঁড়াল সে মিসেস হার্টের দিকে। আপনি নিশ্চয়ই চান না আপনার মেয়ের কোন ক্ষতি হোক? ধরুন, ওর সুন্দর মুখে যদি একটা খুরের পোঁচ দিই? ঘোঁত ঘোঁত করে উঠল লোকটা শেষের দিকে।দেব নাকি?
রোজমেরীর কানে কানে কে যেন ফিসফিস করে বলল, সাহস রাখো। মনে মনে জবাব দিল সে। সাহস রাখছি। গ্রেগরী। অবশ্যই সাহস হারাব না।
গলায় জোর এনে রোজমেরী লোকটাকে বলল, তুমি এক্ষুনি এখান থেকে চলে যাও। নইলে আমি পুলিশ ডাকব।
খ্যাক খ্যাক হেসে উঠল লোকটা। কীভাবে ডাকবে, খুকী? ফোনের লাইন কেটে দিয়েছি। শোনো, ফ্যাচফ্যাচ কোরো না। আমার কিছু টাকা দরকার। দিয়ে দাও। সুবোধ বালকের মত চলে যাব।
