বলে আর দেরি করলাম না আমি। ডনকে বারান্দায় একটি থামের সঙ্গে বেঁধে রেখেছিলাম। ও খুবই অস্থির হয়ে উঠেছে। তাড়াতাড়ি ওর বাঁধন খুলে ছুটলাম বো-র পায়ের চিহ্ন লক্ষ্য করে।
উজ্জ্বল চাঁদ দিন করে রেখেছে চারদিক। বালির ওপর বো-র ছোট ছোট পায়ের দাগ স্পষ্ট চেনা যাচ্ছে। ডনকে শোকালাম ওই দাগ, তারপর তাড়া দিলাম, খোঁজো ওকে, ডন! শিগগির খুঁজে বের করো।
পায়ের দাগ ধরে আমরা ক্রমশ ঢুকে পড়লাম দ্বীপের ভেতরের অংশে। ঘাসের গন্ধ তীব্রভাবে নাকে ধাক্কা মারছে। ডনের চলার গতি হঠাৎ মন্থর হয়ে গেল, শরীর হয়ে উঠল আড়ষ্ট, তীক্ষ্ণ চোখে সামনের দিকে তাকিয়ে কি যেন দেখার চেষ্টা করল। আমি মাথা বাড়ালাম। কিছুই চোখে পড়ল না, এদিকে ডন তার লেজের ডগা বিপুল বেগে নাড়তে শুরু করেছে, শরীরটা ক্রমশ মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে লাগল, ঘন এক গোছা ঘাসের দিকে মাথাটা এগিয়ে নিল। এক পা সামনে বাড়াল ডন, ওর ডান থাবাটা উঠে গেল শূন্যে, লেজ নাড়ানো থেমে গেল একই সঙ্গে। শক্ত, লোহার মত হয়ে উঠল ওটা।
দাঁড়াও, ডন! প্রায় ফিসফিস করে বললাম আমি। শটগানটা স্থির করলাম ঘন ঘাস গোছাকে লক্ষ্য করে, ট্রিগারে আঙুলের চাপ পড়ল…।
.
তোমার স্ত্রী এখন কেমন আছে?
আগের চেয়ে ভালো। পরপর দুটো গুলির শব্দ শুনলাম। শিকার মিলল কিছু?
পূর্বপুরুষ
রোজমেরী হার্ট বিছানায় শুয়ে তাকিয়ে আছে ম্যান্টলপিসের ওপর ঝোলানো পোর্ট্রেটটির দিকে। বহু বছর ছবিটি চিলেকোঠায় নানীর ঘরে ছিল, আজ সকালে রোজমেরীর ঘরে আনা হয়েছে ওটা।
নানী মারা গেছেন তাই অন্যান্য অনেক জিনিসের মত পোর্ট্রেটটিও বংশাধিকার সূত্রে পেয়ে গেছেন রোজমেরীর মা।
এ ছবিটি তোমার প্রপিতামহের প্রপিতামহের, মিসেস হার্ট বলেছেন মেয়েকে। নেবে এটা? তোমার ঘরে টাঙিয়ে রাখবে।
সত্যি দেবে আমাকে? উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে রোজমেরী।
তা হলে খুব মজা হবে। ওঁকে দারুণ লাগছে আমার। অভিজাত…রাজকীয়। মার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল সে। তুমিও অবশ্য তাই।
হেসে উঠলেন মিসেস হার্ট, মেয়ের কাঁধ চাপড়ে বললেন, রাজকীয়-ফাজকীয় বুঝি না তবে উনি ছিলেন আমার প্রপিতামহ। কাজেই চেহারায় মিল থাকতেই পারে। ব্যক্তি জীবনে ওঁর মত হতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করব আমি। উনি খুব সাহসী ছিলেন; রানী ভিক্টোরিয়ার সময়ে যুদ্ধ করেছেন।
উনি সৈনিক ছিলেন নাকি? আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল রোজী। তার পাঠ্য বিষয়ের মধ্যে ইতিহাসও আছে, প্রাচীনকালের ইতিহাস পড়ার সময় সেই সময়ে যেন চলে যায় ও, নিজেকে ইতিহাসের একটা অংশ মনে হতে থাকে। রানী বা রাজকুমারী জাতীয় কিছু একটা ভাবে রোজমেরী নিজেকে।
প্রপিতামহ ক্রিমিয়ার যুদ্ধে মারা গেছেন, বলল ওর মা। সাংঘাতিক আহত হয়েও ব্যাটল অভ ইঙ্কারম্যানে দল নিয়ে গেছেন তিনি, যুদ্ধ করেছেন রাশানদের বিরুদ্ধে। নিজের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেননি কখনও। ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যাবার আগ পর্যন্ত বীরের মত যুদ্ধ করেছেন। ইতিহাস বলে, ওই যুদ্ধে জয়ী হবার পেছনে প্রপিতামহের বিরাট ভূমিকা ছিল।
.
সেদিন সারাক্ষণ নিজের পূর্ব-পুরুষের কথা ভাবল রোজমেরী। কিন্তু তাকে তো শুধু প্রপিতামহ গ্রেগরী বলে ডাকা যাবে না, সংক্ষিপ্ত একটা নাম দেয়া উচিত। অনেক ভেবে রোজমেরী ঠিক করল তার পূর্বপুরুষকে শুধু গ্রেগরী নামেই ডাকবে। কারণ গ্রেগরী তার কাছে রক্ত মাংসের মানুষের মতই বাস্তব মনে হচ্ছে। যেন ঘনিষ্ঠ এক বন্ধু।
রাতের বেলা, ঘুমুবার সময় বিচিত্র এক অনুভূতি জাগল রোজমেরীর। আগে আলো নিভিয়ে অন্ধকারে ঘুমাতে তার খুব ভয় লাগত। মাকে অবশ্য এ কথা কখনও বলেনি রোজী মা হাসাহাসি করবে বলে। সত্যি তো, দশ বছরের একটা মেয়ে আলো নিভিয়ে ঘুমাতে ভয় পায় শুনলে সবাই হাসবে।
তবে আজ ভয় লাগছে না। মাথার ওপর গ্রেগরীর ছবি আছে বলেই হয়তো। যে লোক যুদ্ধে সেনাপতিত্ব করতে পারেন তিনি সহজেই তার আত্মীয়, ছোট একটি মেয়ের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পারবেন। কাজেই রোজমেরীর ভয় পাবার কিছু নেই। বরং ওকে আরো সাহসী হতে হবে। ভয় পেলে নিজের পূর্বপুরুষকে লজ্জায় ফেলে দেয়া হবে।
বিছানায় কিছুক্ষণ গড়াগড়ি দিয়ে গায়ের চাদর সরিয়ে নিঃশব্দে নেমে পড়ল রোজমেরী, দাঁড়াল জানালার সামনে, পর্দা সরাল। এরকম কাণ্ড আগে কখনও করেনি সে। জানালা সবসময় বন্ধ রেখেছে রোজী। কারণ চাঁদের আলো পড়ে দেয়ালে ভ্যাম্পায়ার আকৃতির যে সব নকশা তৈরি করে, রোজমেরী খুবই ভয় পায়।
জানালা থেকে সরে এল রোজমেরী, তাকাল পোট্রটের দিকে। গ্রেগরীর চোখ ওকে অনুসরণ করছে। বিছানায় লাফ দিল রোজমেরী, হাসল পূর্ব-পুরুষের দিকে তাকিয়ে।
গুড নাইট, গ্রেগরী, বলল সে। তারপর বিন্দুমাত্র ইতস্তত না করে সুইচ টিপে আলো নেভালো রোজমেরী, একটু পরে ঘুমিয়ে পড়ল।
সে রাতে অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখল রোজমেরী। তার স্বপ্নে জ্যান্ত হয়ে ছবির ফ্রেম থেকে নেমে এলেন গ্রেগরী। রোজমেরী দেখল দৃশ্যপট বদলে গেছে। সে চলে এসেছে ক্রিমিয়ার যুদ্ধের সেই সময়ে। গ্রেগরী বিশাল তরবারি নিয়ে বীর বিক্রমে শত্রুর বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। কিন্তু বেশিক্ষণ লড়াই করা সম্ভব হলো না। আহত হয়ে পড়ে গেলেন মাটিতে। রোজমেরী ছুটে গেল তার কাছে। তিনি মৃত্যুর আগে বলে গেলেন, রোজমেরী, সাহস রাখো। ভয়ের কিছু নেই।
