তুমি পুতুল খেলো নাকি? জিজ্ঞেস করল মার্ক।
মৃদু হাসল অ্যাবি। এটাকে চিলেকোঠার ঘরে পেয়েছি। অনেক পুরোনো পুতুল।
মার্ক ওর হাত থেকে পুতুলটা নিল। উল্টেপাল্টে দেখল। সুন্দর, মন্তব্য করল সে। চোখ তুলে চাইল অ্যাবির দিকে। তবে তোমার মতো সুন্দর নয়। মুচকি হাসল মার্ক প্রশংসাটা খুবই গতানুগতিক ঢঙের হয়ে গেছে বুঝতে পেরে। ঝুঁকে এল সে, ঠোঁট ছোঁয়াল অ্যাবির গোলাপি অধরে।
চুম্বনটা অ্যাবির কাছে বেমানান ঠেকল, দুজনের মাঝখানে পুতুলটা প্রাচীর তুলে দাঁড়িয়ে আছে বলে। তাছাড়া সে এত বেশি অবাক হয়ে গিয়েছিল, দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া কিছুই করতে পারল না। অবশ্য তাতে কিছু এল গেল না। মার্ক আবার হাসল অ্যাবির দিকে তাকিয়ে, পুতুলটা ওর হাতে দিয়ে পা বাড়াল নিজের গাড়ির দিকে।
টমেটোর মতো লাল রঙের গাড়িতে উঠে বসল লম্বা পা জোড়া ভাঁজ করে, একবার হর্ন বাজাল, তারপর চলে গেল। অ্যাবি ঘরে ঢোকার আগে পুতুলটাকে বুকে চেপে ধরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল খানিকক্ষণ।
শুক্রবার রাতে আবার স্বপ্ন দেখল সে।
মাঝ রাতে জেগে গেল অ্যাবি, চাদরে মুড়ে আছে পা, কানে ধাক্কা দিচ্ছে। রক্ত স্রোত। বিপদের উপলব্ধি এমন তীব্র, সারারাত আর ঘুমাতে পারল না মেয়েটা। শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে ভোরের অপেক্ষায় থাকল। একসময় দেখল রান্নাঘরের জানালা দিয়ে সূর্যের প্রথম আলো ঢুকছে।
অ্যাবি আবার সেই হাতজোড়াকে দেখেছে। তবে এবারে শুধু হাত নয়, গোটা শরীর। ছোটোখাটো কাঠামো, শিশুদের মতো। ছায়ার মধ্যে ছিল শরীরটা, পরিষ্কার বোঝা যায়নি চেহারা। শুধু নরম হাত আর বিবর্ণ গালের রেখা দেখতে পেয়েছে অ্যাবি। ওটা নড়াচড়া করছিল, হাঁটছিল। অ্যাবি রাস্তার নুড়ি পাথরের শব্দ শুনেছে, ফিটফাট একটা পোশাক দেখেছে এক ঝলক, চকচকে কালো জুতোর ডগাও চোখে পড়েছে। তারপর একটা শব্দ কানে এসেছে, শ্বাস পড়ার শব্দ, বাচ্চাটা হেঁটে যাচ্ছে, পেছনে নরম ও উত্তেজিত খিকখিক একটা হাসির আওয়াজ হচ্ছিল।
তারপর রাস্তা ধরে ছুটতে শুরু করে শিশুর মতো কাঠামোটা, পায়ের ধাক্কায় ছিটকে যাচ্ছিল নুড়ি পাথর, শ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠছিল। অ্যাবি টের পেয়েছে তারও শ্বাসের গতি দ্রুত হয়ে উঠছিল। সে বুঝতে পারছিল না কী ঘটছে, তবে খারাপ একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে উপলব্ধি করতে পারছিল। তবে খারাপ ব্যাপারটা কতটুকু খারাপ, তা জানা ছিল না তার। অ্যাবি হঠাৎই দেখতে পায় হেডলাইটের চোখ ধাঁধানো একজোড়া আলো, ইঞ্জিনের গুঞ্জন হঠাৎ পরিণত হয় গর্জনে, গাড়িটা ক্রমে কাছিয়ে আসতে থাকে, অ্যাবি দেখে ছোটো, ছায়াময় শরীরটা ইচ্ছে করে গাড়ি আসার রাস্তায় উঠে এসেছে।
তারপর ব্রেক কষার তীক্ষ্ণ ক্রিইইইচ আওয়াজ, সেই সাথে ধাতব আর কাঁচ ভাঙার গা গোলানো শব্দ। এক মুহূর্ত নিরবতা, তারপর জেগে ওঠার আগে শেষ শব্দটা শুনতে পেয়েছে অ্যাবি–নরম, খিকখিক হাসি।
আজ শনিবার। কখন মার্কের সঙ্গে দেখা হবে তার অপেক্ষার প্রহর গুণবে যে মেয়ে সে তা না করে ভয়ঙ্কর স্বপ্নের কথা মনে করে সিঁটিয়ে রইল সারাদিন। স্বপ্নটা তার মস্তিষ্কে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে রইল।
আইরিন ভাগ্যবতী সিঁড়ি দিয়ে ডিগবাজি খেয়ে পড়ে ঘাড় ভাঙতে পারত তার। হলিরও ভাগ্য ভালো। ভাঙা কাঁচের টুকরা ওর চোখ কিংবা ঘাড়ে ঢুকে যেতে পারত। অন্ধ হয়ে যেত হলি, মৃত্যুও অস্বাভাবিক ছিল না। আগুনে পুড়ে মরে যেতে পারত লিন্ডসেও, গাছ বাড়ির মতো পুড়ে কয়লা হয়ে যেত সে।
এবারে চতুর্থ স্বপ্ন। কাল খবরের কাগজে কি কোনো দুর্ঘটনার খবর পড়তে হবে অ্যাবিকে? পড়তে হবে সেই খবর যা সে ইতিমধ্যে জানে–গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে, কেউ আহত হয়েছে, সম্ভবত কোনো শিশু?
ক্লান্ত ও খিটখিটে মেজাজ নিয়ে সারাদিন এ ঘর ও ঘর করে বেড়াল অ্যাবি, জানালা দিয়ে মা আর লিন্ডসেকে দেখল। ওরা পাতা পরিষ্কার করছে। আজ সকালে কুয়াশা পড়েছে। শীঘ্রি ঘাসের রঙ বিবর্ণ ও ম্লান হয়ে উঠবে। সমস্ত পাতা ঝরে কঙ্কাল হয়ে যাবে গাছগুলো, সাঁঝ নেমে আসবে আরও দ্রুত।
সাতটার সময় গোসল করল অ্যাবি, শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে নিল চুল। গরম জলের ছোঁয়ায় আড়ষ্ট পেশীগুলোয় ঢিল পড়ল, ভার ভার মাথাটাও অনেকটা হালকা লাগল। মোটা তোয়ালেতে শরীর মুড়ে নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকল অ্যাবি।
ক্লজিটের উপরে চোখ ঘুরছে অ্যাবির, শার্ট, স্কার্ট এবং প্যান্ট দেখছে, পছন্দ হচ্ছে না কোনোটাই। এমন সময় শব্দটা শুনতে পেল সে… সেই খিকখিক হাসি। এত পরিষ্কার, এত কাছে, চরকির মতো ঘুরল অ্যাবি, আশা করল পেছনে দেখতে পাবে কাউকে।
কিন্তু ঘর খালি।
মাথা ঝাঁকাল অ্যাবি, যেন দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলছে। ফিরল ক্লজিটের দিকে। গাঢ় কমলা রঙের একটা ব্লাউজ পছন্দ হলো, নরম এবং মখমলের মতো মসৃণ। হাতঘড়ির দিকে নজর গেল ওর। আটটা বাজে। মার্কের আধঘণ্টা দেরি।
এক ঘণ্টা পরে কর্ডলেস ফোনটা নিজের ঘরে নিয়ে এল অ্যাবি, ফোন করল মার্কের বাসায়। বুক ধুকপুক করছে, ডায়াল করার সময় হাত কাঁপল। ভয়াবহ কিছু একটা ঘটে গেছে, কুডাক ডাকছে মন। মার্কের মা ফোন ধরলেন। অ্যাবি মার্ককে চাইল এবং অপর প্রান্ত থেকে ফোঁপানির আওয়াজ শুনে জমে বরফ হয়ে গেল।
