মার্কের মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন মারা গেছে তার ছেলে, বিকেলবেলা, হাসপাতালে।
এক বন্ধুর বাসা থেকে ফিরছিল ও, জানালেন মিসেস হেলপার্ন। মার্ক খুব ভালো ড্রাইভার, অত্যন্ত সাবধানে গাড়ি চালাত। কিন্তু নিশ্চয়ই গাড়িটা আচমকা ঘুরিয়ে ফেলতে হয়েছিল ওকে… বিরতি দিলেন তিনি এক মুহূর্তের জন্য, অ্যাবি শুনল ভদ্রমহিলা ফোঁপাচ্ছেন। পঁয়ত্রিশ মাইল গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিল ও, ওখানকার স্পীড লিমিট তাই ছিল। কিন্তু পুলিশ বলেছে ওই গতিতে গাড়ি চালালেও যদি গাছে টাছে ধাক্কা লাগে…। আবার থেমে গেলেন তিনি।
অ্যাবির মুখের ভিতরটা শুকিয়ে খটখটে, কথা বলার সময় কর্কশ শোনাল কণ্ঠস্বর। কেন? জিজ্ঞেস করল ও। আপনি বললেন ওকে আচমকা গাড়ি ঘুরিয়ে নিতে হয়েছিল। কিন্তু কেন?
বাচ্চা মেয়েটার জন্য, জবাব দিলেন মিসেস হেলপার্ন। ওরা ওকে অ্যাম্বুলেন্সে নেয়ার সময় মার্ক বলেছে একটা ছোটো মেয়েকে রাস্তা দিয়ে দৌড়ে আসতে দেখে সে। পরিষ্কার নাকি দেখেছে। পুলিশ মেয়েটাকে অনেক খুঁজেছে। সন্ধান পায়নি।
গলা একেবারে ভেঙে গেল ভদ্রমহিলার, কোনো মতে বিদায় বলে নামিয়ে রাখলেন ফোন।
চোখ বুজল অ্যাবি। মাথাটা বোঁ বোঁ করে ঘুরছে। দাঁড়িয়ে আছে ও। জানে না বসলে যে কোনো মুহূর্তে পড়ে যাবে। কিন্তু নড়াচড়ার বিন্দুমাত্র শক্তি নেই গায়ে, দাঁড়িয়েই রইল। মাথা ঘুরছে, টের পেল শরীরও দুলছে।
ঠিক তখন খিকখিক হাসিটা আবার শুনতে পেল অ্যাবি। শ্বাস চেপে রাখল ও, জানে আবার শুনবে শব্দটা। আবার শুনতে পেল ভৌতিক, ফিসফিসে খিকখিক হাসির শব্দ, ঘরের মধ্যে ভাসতে ভাসতে যেন এগিয়ে গেল ওর কাছে। ধীর গতিতে ঘুরল অ্যাবি, চোখ মেলল, দৃষ্টি স্থির হলো পুতুলটার চকচকে আকাশ-নীল চোখে।
একটি ছোটো মেয়ে।
বেগুনি রঙের পোশাক পরা একটি ছোটো মেয়ে, নরম, বিবর্ণ হাত, পায়ে চকচকে কালো জুতা। অ্যাবি চিলেকোঠার ময়লা ঘেঁটে যে পুতুলটাকে খুঁজে এনেছ অবিকল তার মতো… ওকে কি জ্যান্ত করেছে সে? এমনই জ্যান্ত যে ধাক্কা মেরে অ্যাবির এক বান্ধবীকে সিঁড়ি দিয়ে ফেলে দিতে পারে… আরেক বান্ধবীর মাথায় ভাঙতে পারে বাতি, দেশলাই কাঠিতে আগুন ধরিয়ে গাছ বাড়ি ধ্বংস করে মেরে ফেলার চেষ্টা করতে পারে তার বোনকে?
এ পুতুলের এমনই শক্তি যে কি না রাস্তায় গিয়ে ষোলো বছরের এক নিষ্পাপ তরুণকে খুন পর্যন্ত করে ফেলে?
দাঁড়িয়ে আছে অ্যাবি, মহা আতঙ্কে লক্ষ করল পুতুলটার চাউনিতে পরিবর্তন ঘটেছে, সত্যি সত্যি জ্যান্ত হয়ে উঠেছে চোখজোড়া, সোজা তাকাল অ্যাবির দিকে। দৃষ্টিতে প্রকট বিজয় উল্লাস। মাত্র এক সেকেন্ডের জন্য ওভাবে তাকিয়ে থাকল পুতুল। কিন্তু ওই সময়টুকুই যথেষ্ট। ওর ভিতরে জীবন আছে, এক ধরনের জীবন, এক ধরনের ভয়ঙ্কর শক্তি যে শক্তি মানুষ হত্যা করে এবং যাকে না থামানো পর্যন্ত আরও হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাবে।
অ্যাবি জানে এখন ওর করণীয় কী। গলা দিয়ে ঠেলে আসা চিৎকারটা গিলে ফেলল, লম্বা পা ফেলে দাঁড়াল শেলফের সামনে, এক টানে তাক থেকে নামিয়ে আনল পুতুলটাকে। ওর ভিতরে জীবন থাকলেও আর দেখতে চায় না অ্যাবি। সে ওটাকে সুন্দর কাঠের বাক্সটিতে ঢোকাল। তারপর ঢাকনি ফেলে চকমকে ছিটকিনি আটকে দিল।
এখন এটাকে কফিনের মতো লাগছে।
সাটিনের ঝালর দেয়া পুতুলের জন্য কফিন।
দশ মিনিট পরে মার গাড়িটা নিয়ে পাহাড়ি রাস্তার মাথায় চলে এল অ্যাবি। বাক্সটা ওর পাশের সীটে পড়ে আছে। ওটার দিকে হাত বাড়াল অ্যাবি, একটা শব্দ শুনতে পেল। অস্পষ্ট, টুপটুপ শব্দ, যেন নুড়ি পাথরের গায়ে ঠোকাঠুকি লাগছে। তবে ওটা নুড়ি পাথর নয়।
ছোটো মুঠি দিয়ে ঘুসি মারছে কাঠের গায়ে।
গাড়ি থেকে বের হলো অ্যাবি, শোঁ শোঁ বাতাসে চুল উড়ছে। বাক্সটা হাতে নিয়ে পাহাড়চুডোর কিনারে এসে দাঁড়াল। এক মুহূর্তও দ্বিধা করল না। গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে বাক্সটাকে ছুঁড়ে মারল অ্যাবি। দেখল ওটা ডিগবাজি খেতে খেতে নিচে নেমে যাচ্ছে। চাঁদের আলোয় বারকয়েক ঝিকিয়ে উঠল পিতল, শেষে নিচের অন্ধকারে হারিয়ে গেল।
পাহাড়চূড়ায় একা, চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল অ্যাবি। হিমেল বাতাসে কাঁপুনি ধরে গেছে শরীরে, কিন্তু ও অপেক্ষা করল। নিশ্চিত হতে চায়। কান খাড়া করে রেখেছে অ্যাবি। অবশেষে ভোঁতা তবে পরিষ্কার শব্দটা শোনা গেল। পাহাড়ের নিচে, ধারাল চাঁইয়ের সাথে বাড়ি খেয়েছে বাক্স। একবার, দুবার, তিনবার। তারপর নেমে এল নিস্তব্ধতা।
ঝামেলা শেষ। পুতুলটা বিদায় হয়েছে, অ্যাবি বাড়ির পথ ধরল। জানে এবার থেকে সে শান্তিতে ঘুমাতে পারবে, ওই বিবর্ণ, ভয়ঙ্কর হাতজোড়া আর স্বপ্নে তাড়া করে ফিরবে না ওকে।
.
লোকটা অবশেষে খুলে ফেলল বাক্সের ছিটকিনি। উঁকি দিল ভেতরে। হাসি ফুটল মুখে। সে অবাক হয়েছে, খুশিও। সে নিশ্চিত এটা সত্যিকারের কোনো অ্যান্টিক, অনেক দামি। হাতজোড়া আর মুখখানা চমৎকার চীনামাটি দিয়ে তৈরি, পোশাকটা অবশ্যই খাঁটি স্যাটিনের। আজকাল এরকম পুতুল কেউ বানায় না।
অ্যান্টিক হোক বা না হোক, সিদ্ধান্ত নিল লোকটা, এটাকে বিক্রি করবে। তার নয় বছরের একটি মেয়ে আছে, পুতুলের জন্য পাগল। মেয়েকে এই চমৎকার জিনিসটি উপহার দেবে সে। পরিতৃপ্তির হাসি ঠোঁটে, বাক্সটা বগলে চেপে বাড়ির পথ ধরল লোকটা।
