এ দৃশ্যটা অ্যাবি গত রাতে স্বপ্নে দেখেছিল। এখন মেঝেতে ছড়ানো ছিটানো, হলির রক্তের ছিটে মাখানো বই-খাতার দিকে তাকিয়ে সে শিউরে উঠল। বুজে ফেলল চোখ। তাকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল। সাবধান করে দেয়া হয়েছিল স্বপ্নের মাঝে। কিন্তু ঠিক সময়ে স্বপ্নের কথা মনে পড়েনি অ্যাবির, বিপদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি বান্ধবীকে।
মাথায় চারটা সেলাই পড়ল হলির। এছাড়া সে ঠিকই আছে। তবে এ ঘটনা বা স্বপ্নের কথা কোনোটাই মন থেকে মুছে ফেলতে পারল না অ্যাবি।
তারপর থেকে ঘুম হারাম হয়ে গেল অ্যাবির। রাতের বেলা দুচোখ এক করতে ভয় পায় সে। ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে না জানি আবার কোন্ দুঃস্বপ্ন দেখে। দুঃস্বপ্নগুলো তাড়িয়ে বেড়াতে লাগল ওকে।
.
কিন্তু অ্যাবিকে তো ঘুমাতে হবে। আর ঘুমানোর পরে যথারীতি স্বপ্ন দেখল সে। আর সে স্বপ্নের পরিণতি হলো আগের চেয়েও ভয়ঙ্কর। আসলে স্বপ্ন নয়, বাস্তব। বিভীষিকাময় বাস্তবতা এটাই যে ঘটনা এত দ্রুত ঘটে যায় যে বাধা দেয়ার সময় থাকে না। একরাতে সে মার চিৎকার শুনে ঘুম থেকে জেগে গেল। মা কর্কশ গলায় চেঁচাচ্ছেন, অ্যাবিকে ডাকছেন সাহায্য করার জন্য।
অ্যাবি অজানা আশঙ্কায় কাঁপতে কাঁপতে ছুটল। দেখল মা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছেন। নগ্ন পায়ে, এখনো ঘুম কাটেনি চোখ থেকে, মার পিছু পিছু নামতে লাগল সে। খিড়কির দরজা খুলে রাতের ঠাণ্ডা বাতাসে বেরিয়ে এল।
ঠাসঠুস শব্দটা নরম, আর পেলব। গন্ধটা অ্যাবিকে সামার ক্যাম্পের কথা মনে করিয়ে দিল। তবে কাঠের তক্তায় আগুনের লেলিহান শিখার চুম্বনের দৃশ্যটাতে স্বস্তিদায়ক কিছু নেই। দাঁড়িয়ে পড়ল অ্যাবি, আতঙ্কে বিস্ফারিত চোখ, পরমুহূর্তে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে আগাছা ভরা উঠোন পেরিয়ে মার সঙ্গে ছুটল জ্বলন্ত গাছ বাড়ির দিকে, যেখানে ঘুমিয়ে আছে লিন্ডসে।
লিন্ডসের কাছে অ্যাবির তৃতীয় স্বপ্নের বাস্তবতা ছিল যন্ত্রণাদায়ক, তার কাঁধ, পিঠ এবং হাত পুড়ে যাওয়ার তীব্র বেদনার অনুভূতি। ডিয়ানা কেঁদে ফেললেন শুনে যখন ডাক্তাররা লিন্ডসেকে ভাগ্যবতী বলে ঘোষণা করলেন
ফার্স্ট ডিগ্রী বার্নের মানুষ মৃত্যুর হাত থেকে খুব একটা ফিরে আসে না। কিন্তু বেঁচে গেছে লিন্ডসে।
আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হলো জানে না কেউ। রাস্তার ধার ঘেঁষা গাছ বাড়িতে, ধারণা করলেন ডিয়ানা, কোনো গর্দভ নিশ্চয়ই গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় জ্বলন্ত দেশলাই ছুঁড়ে মেরেছিল।
তবে অ্যাবি আরও ভালো জানে, কারণ দৃশ্যটা দেখেছে সে স্বপ্নে। মার চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে যাওয়ার আগে সে স্বপ্নে দেশলাইটাকে দেখেছে। তবে গাড়ি থেকে কেউ জ্বলন্ত কাঠি ছুঁড়ে মারেনি, একটা নরম, সাদা হাত দেশলাই বাক্স থেকে কাঠি জ্বালিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে গাছ বাড়িতে।
হাসপাতালের রুমে লিন্ডসের সঙ্গে শুয়ে আছে অ্যাবি, মা চেয়ারে বসে ঘুমে ঢুলছেন, প্রাণপণে কান্না ঠেকানোর চেষ্টা করল। পারল না। কাধ জোড়া নড়তে লাগল কান্নার দমকে, তবে নিঃশব্দে কাঁদল অ্যাবি। গাল বেয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে হাতের চেটো দিয়ে চোখের জল মুছে ফেলল ও, হাতজোড়া মুখের সামনে ধরল। বাবার মতো ছোটো, চওড়া হাত তার, নখের ডগা চারকোণা। স্বপ্নের হাতের মতো মোটেই ফ্যাকাসে, নরম এবং ভয়ঙ্কর দেখতে নয়। তাহলে কার হাত দেখেছে সে স্বপ্নে?
.
আরও একটা সপ্তাহ গেল। এই এক সপ্তাহে ভৌতিক হাতটাকে স্বপ্নে দেখেনি অ্যাবি। গত সাতদিনে তাপমাত্রা নেমে গেল আরও, ঝরা পাতার স্তূপ জমে উঠল গাছের নিচে। লিন্ডসের অবস্থা আগের চেয়ে ভালো। তবে সে আর উঠোনের ধারে কাছেও গেল না, আরেকটা গাছবাড়ির কথা মুখেও আনল না। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে কেউ কোনো কথা বলল না, যদিও সে রাতের ভয়াল স্মৃতি ভুলতে পারেনি কেউ। মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছে লিন্ডসে।
অ্যাবি প্রতি রাতে বিছানায় যায় আতঙ্ক নিয়ে। সারাদিন ভয়ে অস্থির থাকে রাতে কী স্বপ্ন দেখতে হবে তা ভেবে। জানে আবার স্বপ্ন দেখবে সে, কী ঘটবে তা নিয়ে প্রচণ্ড শঙ্কার মধ্যে আছে ও। মার্ক হেলপার্ন সেদিন স্কুল ছুটির পরে ওকে কোক কিনে দিল। কিন্তু তীব্র দুশ্চিন্তায় কাহিল ও বিপর্যস্ত অ্যাবির মাথায় এখন অন্য কিছু নেই। তাই মার্ক যখন ওকে নিয়ে শনিবার রাতে বাইরে যাওয়ার প্রস্তাব দিল, চমকে গেল অ্যাবি।
সাড়ে সাতটার দিকে তোমাকে তুলে নিয়ে যাব আমি, শেষ বিকেলের রোদ গায়ে মেখে অ্যাবিদের বাড়ির সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিল ওরা। ঘন সোনালি চুলে হাত বুলিয়ে অ্যাবির দিকে তাকিয়ে হাসল মার্ক। ছবি দেখব। তারপর কিছু খাব। বেশ হবে, না?
অ্যাবিও জবাবে বেশ হবে বলতে যাচ্ছিল, লিন্ডসেকে দেখে আর বলা হলো না। সদর দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছে সে, এক হাতে পুতুলটার একটা ঠ্যাং ধরে আছে। এটা মেঝেতে পড়ে ছিল, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুরে বলল সে।তোমার ঘরে যাচ্ছিলাম। দেখি মেঝের ওপর পড়ে আছে এটা।
ওর হাত থেকে পুতুলটা নিল অ্যাবি, স্যাটিনের স্কার্ট টেনেটুনে ঠিক করল। তুই শেলফে তুলে রাখলেই পারতি।
তোমাদের গলা শুনে ভাবলাম দেখি তো কে এসেছে, বলল লিন্ডসে, তাই আর ওটাকে শেলফে তুলে রাখতে মনে ছিল না। মার্কের দিকে তাকিয়ে বোকার মতো হাসল সে, ঢুকে গেল ঘরে।
