উ?
পুতুলটার চোখ দেখলে ভয় লাগে। কেমন ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে। ওটার মুখ আরেক দিকে ঘুরিয়ে দিই?
দাও। অ্যাবি ঘুম ঘুম চোখে দেখল আইরিন হেঁটে গেল ঘরের কোণে, আঁধারে তার লম্বা, সাদা টি শার্ট ঝাপসা লাগছে। আইরিন যখন ফিরে এলো, অ্যাবির ততক্ষণে চোখ লেগে গেছে। এক সেকেণ্ডের জন্য আবার জেগে উঠল সে ঝাঁকি খেয়ে, পিঠে বরফঠাণ্ডা কীসের যেন স্পর্শ পেয়েছে। এতই ঠাণ্ডা, উষ্ণ ঘরের মধ্যেও শিউরে উঠল। পরমুহূর্তে শীতল স্পর্শটা আর রইল না, গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল অ্যাবি।
ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখল সে। একটা হাত। ছোটো, ফ্যাকাসে রঙের হাতটা। হলঘরে। অ্যাবি জানে না, দেখতেও পাচ্ছে না ওটা কী করছে। তবে জানে ওটা তার রুমের বাইরে, হলঘরে রয়েছে। হলঘরটাকে সে চিনতে পারছে কারণ দেয়ালের লতানো প্যাটার্নের ওয়াল পেপার আগের জায়গাতেই রয়ে গেছে, রঙ করা বেসবোর্ডও সে দেখতে পাচ্ছে। মা বলেছে ওখানে আসল কাঠ লাগিয়ে দেবে।
হাতটা রোগাটে, তবে চমৎকার গঠন। মেয়েলি হাত। ফ্যাকাসে রঙের একটা প্রজাপতির মতো মেঝের উপর ওটা উড়তে লাগল, সিঁড়ির মাথায় ভেসে রইল এক মুহূর্ত, তারপর মিলে গেল আঁধারে।
একটা চিৎকার শুনে জেগে গেল অ্যাবি।
ঘর অন্ধকার তবে হলঘর থেকে এক ফালি রূপোলি আলো ঢুকে পড়েছে। দরজার চৌকাঠ গলে। ওখান থেকে অস্পষ্ট গলা ভেসে আসছে। আইরিন কথা বলছে অ্যাবির মার সঙ্গে। বিছানা থেকে নেমে পড়ল অ্যাবি, পা বাড়াল দরজার দিকে।
আমি একটুর জন্য বেঁচে গেছি, শুনতে পেল আইরিন বলছে।
কী হয়েছে? হলঘরের আলোতে চোখ পিটপিট করল অ্যাবি।
তুমি ঠিক আছ তো? তোমার চিৎকার শুনলাম যেন।
ঘাড় ভাঙার মতো দশা হলে তুমিও চিৎকার দিতে, বলল আইরিন। খুব পিপাসা লেগেছিল আমার। নিচে যাচ্ছিলাম। কীসের সঙ্গে যেন পা বেঁধে যায় আমার। ঝুঁকে হাত দিয়ে হাঁটু ডলল আইরিন। আমি হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাই।
কীসের সঙ্গে পা বাঁধল তোমার? উপরের সিঁড়িতে চোখ বুলালেন অ্যাবির মা। এখানে তো কিছু দেখতে পাচ্ছি না।
জানি না আমি, কপালে ভাঁজ পড়ল আইরিনের। কিন্তু কিছু একটা ছিল ওখানে। পরিষ্কার টের পেয়েছি।
সিঁড়ির মাথায় চোখ বুলাল তিনজন, তারপর পরস্পরের সঙ্গে চোখাচুখি হলো। অ্যাবির স্মৃতির কুঠুরিতে কিছু একটা খোঁচা দিচ্ছিল, কোনো একটা ছবি, কিন্তু মনে করতে পারছে না সে। শেষে যে যার বিছানায় ফিরে গেল ওরা।
খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আমি, স্লীপিং ব্যাগে ঢুকে বলল আইরিন। ভাগ্যিস ডিগবাজি খাইনি। তোমাদের সিঁড়িগুলো যা খাড়া!
হুঁ, বলল অ্যাবি। তোমার কিছু হয়নি দেখে নিশ্চিন্ত বোধ করছি, বিছানায় শুয়ে চোখ বুজল সে। আইরিন উঠে বসেছে টের পেয়ে চোখ মেলে চাইল। কী করছ তুমি?
পুতুলটার মুখ ঘুরিয়ে রাখছি, জবাব এল।
একবার না ঘুরিয়ে রাখলে!
রেখেছিলাম তো! ওটা বোধহয় আবার ঘুরে গেছে। কেমন প্যাটপ্যাট করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।
পরদিন, আইরিন চলে যাওয়ার পরে স্বপ্নের কথা মনে পড়ল অ্যাবির। ফ্যাকাসে হাতখানা উড়ছিল, প্রায় ভেসে ছিল সিঁড়ির মাথায়, ঠিক যেখান থেকে পড়ে যায় আইরিন। হাতটা কি ওকে ইঙ্গিত দেয়ার চেষ্টা করছিল যে ওখানে কিছু একটা ঘটবে?
.
দিন সাতেক বাদের ঘটনা। অ্যাবি, আইরিন ও তাদের বান্ধবী হলি রাসেল অ্যাবিদের রান্নাঘরে বসে পড়াশোনা করছে। ওদের পড়ার বিষয় সমাজ বিজ্ঞান। অ্যাবির ঘরে বসে পড়ার চেষ্টা করছিল হলি। তবে আইরিনের মতো তারও পুতুলটার চাউনি ভালো লাগেনি।
ভয়ঙ্কর চোখ, শিউরে উঠেছিল হলি। যেন সারাক্ষণ লক্ষ করছে আমাকে। তারপর বইখাতা নিয়ে চলে এসেছে কিচেনে।
রচনা লেখার পরীক্ষায় আমি কখনোই ভালো করতে পারি না, অনুযোগ হলির কণ্ঠে। প্রশ্নের ধরন কী হবে না জেনে বেহুদা পড়ার কোনো মানে হয়?
ঠিকই বলেছ, সায় দিল আইরিন, ফ্রিজ খুলে সোডার বোতল বের করছে। অ্যাবি তার পাশে কাউন্টারে দাঁড়ানো, বাটিতে পপকর্ন ঢালছে।
হলির কনুই টেবিলে ঠেস দেয়া, চিবুকে হাত। তার ঠিক মাথার ওপর ঝুলছে বৈদ্যুতিক বাতি। আলো পড়ে ঝলমল করছে কালো চুল। অ্যাবি কী যেন বলার জন্য ওর দিকে ঘুরল আর তখন ঘটে গেল ঘটনাটা।
সাবধান করে দেয়ার সময় পাওয়া গেল না। টেবিলের উপরে চেইন দিয়ে ঝুলছিল কাঁচের বাতি, খসে পড়ল হলির মাথার উপরে, কাঁচ ভাঙার শব্দ হলো বিস্ফোরণের মতো।
রক্তে ভেসে গেল হলির মুখ। আইরিন দ্রুত ওর মুখের রক্ত মুছতে লাগল, তারপর ছুটে গেল অ্যাবির মার কাছে। বাতিটা খসে পড়ার মুহূর্তে চিৎকার করে উঠেছিল অ্যাবি, তারপর চুপ হয়ে গেছে। পক্ষাঘাতগ্রস্তের মতো আতঙ্ক নিয়ে দেখল অতটা মারাত্মক নয় ক্ষত। দেখল মা আর আইরিন মিলে হলিকে সিধে হতে সাহায্য করছে, মা বলছেন তিনি হলিকে তার বাসায় পৌঁছে দেবেন। এসব দেখছে অ্যাবি, একই সাথে একটা দৃশ্যের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।
কাঁচের বাতিটা বনবন করে ঘুরছিল, এত জোরে ঘুরছিল যে রঙিন গ্লাস প্যানেল আলোর অদ্ভুত একটা ঝর্ণাধারা সৃষ্টি করে ফেলেছিল টেবিলের উপরে। অ্যাবি দেখছিল ঝর্ণাধারাটার পাক খাওয়ার গতি দ্রুত থেকে দ্রুততর হয়ে উঠছে, ওর চোখ এমন ধাঁধিয়ে যায়, অন্য দিকে দৃষ্টি ফেরাতে বাধ্য হয়। তারপর সে শব্দটা শোনে। ফোঁস করে শ্বাস ফেলেছিল কেউ। শব্দটা বাতির কাছ থেকে শোনা গিয়েছিল। অ্যাবি ঘুরে তাকায়, একটা হাত দেখতে পায় সে। ফ্যাকাসে সাদা, নরম হাত। এগিয়ে যাচ্ছিল বাতির দিকে। আঙুলের মৃদু স্পর্শে বাতির ঘোরা বন্ধ হয়ে যায়। তারপর আরেকটা শব্দ শুনতে পায় অ্যাবি। দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। হাতটার মতোই নরম এবং কোমল। তৃপ্তির নিঃশ্বাস।
