বাক্সের ভিতরে একটা পুতুল।
সাদা স্যাটিনের পোশাকটা অনেক দিন আগের বলে হলুদ রঙ ধরেছে, পুতুলটা একটা বাচ্চার মতো শুয়ে আছে। মাথায় চুড়ো করে বাঁধা কালো চুল, পরনের জামাটা একশো বছর আগের ডিজাইনের। স্কার্ট লম্বা, কোমরের কাছটাতে চেপে বসেছে, উঁচু গলা ও লম্বা স্লিভে লেস বসানো।
চীনা মাটির মুখ, আকাশ নীল চোখজোড়া অ্যাবির মতো, পাপড়ি কালো, চেয়ে আছে।
আকাশ-নীল চোখজোড়া এত জীবন্ত, চাউনির মধ্যে শক্তিশালী ও ভীতিকর একটা ব্যাপার আছে, আঁতকে উঠল অ্যাবি।
মুহূর্তের জন্য মনে হলো ও চোখ ঠিকরে পড়ছে ঘৃণা। তবে তা এক মুহূর্তের জন্যই। অ্যাবি বাক্স থেকে তুলে নিল পুতুলটাকে। ওটার চোখজোড়া এখন ফাঁকা ও নিষ্প্রাণ। কাঁচের নীল চোখ দম বন্ধ করা চিলেকোঠার নগ্ন বাল্বের স্নান আলোয় ঝিলিক দিল।
চিলেকোঠার ঘরটি অর্ধেক পরিষ্কার করল অ্যাবি। তারপর পুতুলটাকে নিয়ে চলে এল নিজের ঘরে। স্যাটিনের স্কার্ট দিয়ে চেপে মোটামুটি ঠিকঠাক করে শেলফের লম্বা তাকে, স্টাফ করা কতগুলো প্রাণীর সাথে রেখে দিল। এগুলো গত বছর ওর বাবা মেক্সিকো থেকে পাঠিয়েছেন। এর মধ্যে পুতুলও আছে, রয়েছে আর্ট ক্লাসে নিজের হাতে তৈরি একজোড়া মাটির পাত্র এবং সাগর সৈকত থেকে কুড়িয়ে আনা কতগুলো ঝিনুকের খোলস। তাকে পুতুলটা বসে রইল রানির মতো, উদ্ধত এবং শীতল, মুখ ফেরানো অ্যাবির বিছানার দিকে।
এটাকে কেন যে তোমার মনে ধরল বুঝতে পারছি না, সে রাতে লিন্ডসে বলল তার বড়ো বোনকে। পুতুলটা খুবই পুরোনো আর ডিসগাস্টিং।
তোর কাছে ডিসগাস্টিং মনে হলেও আমার কিছু আসে যায় না, বলল অ্যাবি। বিছানায় শুয়ে তাকিয়ে আছে পুতুলটার দিকে। পুতুলটা দেখতে খুব সুন্দর। মা বলেছে এটা বোধহয় কোনো দামি অ্যান্টিক।
তাহলে বিক্রি করে দিলেই পারো। আমি হলে করতাম।
আমি জানি তুই তা করতি। বলল অ্যাবি। কিন্তু আমার বিক্রি করার ইচ্ছে নেই। ব্যাপারটা এভাবে চিন্তা কর, লিন্ডসে আমি ওকে মুক্ত করে দিয়েছি। ও এখন স্বাধীন নারী।
হুহ্, নাক দিয়ে বিদঘুঁটে শব্দ করল লিন্ডসে।
যা। এখন ভাগ। বলল অ্যাবি। আমার ঘুম আসছে। ঘুমাব।
লিন্ডসে তার ঘরে চলে যাওয়ার পরে বেডসাইড বাতিটা সুইচ টিপে নিভিয়ে দিল অ্যাবি। পা টান টান করে শুলো। স্ট্রিট ল্যাম্পের আলো ভেদ করেছে পাতলা, সাদা পর্দা, অ্যাবি দেখতে পেল আঁধারেও জ্বলজ্বল করছে। পুতুলটার চোখ। এ চোখ বোধহয় কখনও বন্ধ হয় না। মা বলেছে পুতুলটাকে সম্ভবত এভাবেই তৈরি করা হয়েছে, সারাক্ষণ খোলা থাকবে চোখ। পুতুলটার মাথাটা খুলে ভিতরের কলকজা দেখা যায়। তবে শরীর এত নরম, ভেঙে যেতে পারে ঘাড়। অ্যাবি অমন ঝুঁকি কখনোই নেবে না। সে চমৎকার একটা জিনিস খুঁজে পেয়েছে। অযথা ঘাঁটাঘাঁটি করে ওটাকে নষ্ট করবে না। পুতুলটার অদ্ভুত, স্থির চোখের চাউনির সাথে একসময় সে অভ্যস্ত হয়ে যাবে।
.
সপ্তাহখানিক পরে শুরু হলো স্কুল, সেই সাথে অ্যাবির স্বপ্নেরও। ওর জীবনটাকে বদলে দেবে স্কুল, ভেবেছিল অ্যাবি। নতুন বাড়ি, নতুন ঘর, নতুন ক্লাস। কিন্তু অ্যাবি যখন স্বপ্ন দেখার আসল কারণ জানতে পারল ততদিনে দেরি হয়ে গেছে অনেক।
স্বপ্নের কথা ভুলে থাকতে চাইল অ্যাবি, কিন্তু ওগুলো তার মস্তিষ্কে সেঁটে থাকল আঠার মতো, দিনগুলোকে কালো মেঘের ছায়া দিয়ে ঘিরে রাখল, তাকে জাগিয়ে রাখল অনেক রাত অবধি, অ্যাবি পুতুলের পলকহীন চোখে চেয়ে জেগে থাকল।
স্বপ্নগুলো বড় অদ্ভুত, ছোটো ছোটো অর্থহীন দৃশ্যপট নিয়ে তৈরি। তবে তা আতঙ্কিত করে তুলল অ্যাবিকে। ঘুমের মধ্যে সে গোঙায়, মোচড় খেতে থাকে শরীর। তবে ঘুম ভাঙার পরে যা ঘটত তা ছিল সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। আয়নায় নিজের চেহারা চেনা যায় না। যেন অন্য কেউ তাকিয়ে আছে তার দিকে। অ্যাবি প্রতি রাতে বিপদের স্বপ্ন দেখে আর তা ঠেকানোর ক্ষমতা তার নেই।
প্রথম শিকার হলো ওর বন্ধু আইরিন গ্রে।
সেদিন শুক্রবার রাত, স্কুলের প্রথম সপ্তাহের শেষ দিন। আইরিনকে নিয়ে সিনেমা দেখতে গিয়েছিল অ্যাবি। তারপর অ্যাবির বাসায় থেকে গেছে আইরিন। ঘুমাবার আগে রাত একটার দিকে, আইরিন অ্যাবিকে বোঝাতে চাইছিল মার্ক হেলপার্নের সঙ্গে অ্যাবির ঠিক খাপ খাবে না।
আমি জানি ও ভদ্র ছেলে, স্লীপিং ব্যাগ থেকে মাথা বের করে বলল আইরিন। তবে কারও সঙ্গে ওর সম্পর্ক টেকে না। প্রতি সপ্তাহে নতুন কোনো মেয়ের সাথে দেখা যায় তাকে।
আমি কিন্তু ওকে বিয়ে করছি না, আইরিন, বলল অ্যাবি। আমি তো ওর সঙ্গে শুধু ডেট করব।
ওহ, অ্যাবি, ব্যাগ খুলে সিধে হলো আইরিন, হেঁটে গেল শেলফের কাছে। তাক থেকে পুতুলটাকে নিয়ে অন্যমনষ্কভাবে হাতের মধ্যে ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, ও তোমাকে ছেড়ে দিলে কিন্তু অনেক কষ্ট পাবে। পুতুলটাকে এবারে লোফালুফি করছে সে। এটার সমস্যা কী? চোখ বোজে না।
ও একটা পুতুল, এটা নয়। আর কেন চোখ বোজে না জানি না। বলল অ্যাবি, যাক তুমি মার্কের কথা বলছিলে।
আমি চাই না তুমি ছ্যাকা খাও, ঠিক আছে? আইরিন দেরাজের তাকে তুলে রাখল পুতুলটাকে, ঢুকে পড়ল স্লীপিং ব্যাগে। আর তুমি ছ্যাকা খেয়েছ এ কথা শুনতেও চাই না।
হেসে উঠল অ্যাবি, নিভিয়ে দিল বাতি। কিছুক্ষণ পরে আইরিনের নিদ্রাতুর গলা ভেসে এল, অ্যাবি?
