৩ নং বাড়িটির দিকে ফিরে তাকাল মিটফোর্ড। গাড়িটি এখনও ওখানে আছে। বাগানে গাছ-গাছালির ছায়া বাড়ির সদর দরজা খোলা।
মিটফোর্ড জানে তার করণীয় কী। বাড়ির ভেতরে ঢুকবে সে। ৩ নং বাড়িতে নিশ্চয়ই অদ্ভুত কিছু ঘটেছে। হঠাৎ ওর ভয় লাগল। খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতে সায় দিচ্ছে না মন। গভীর দম নিল সে। পা বাড়াল বাগান পথে। কর্তব্য পালন তাকে করতেই হবে।
সদর দরজার পরেই বড় একটা হলঘর। পুলিসি টর্চের জোরালো আলো ফেলল মিটফোর্ড হলঘরে। কয়েকখানা চেয়ার টেবিল দেখতে পেল। ধুলো পড়া। বিদ্যুত্বাতি জ্বালানোর চেষ্টা করল সে। জ্বলল না। ইলেকট্রিকের লাইন কাটা।
কেউ এখানে থাকে না, ভাবল মিটফোর্ড। অনেক দিন ধরেই কেউ এখানে বাস করে না।
তখন সে একটা শব্দ শুনতে পেল। বাড়ির ভেতরে কোথাও কাঁদছে এক মহিলা। শ্বাস চেপে রেখে কান্নার আওয়াজ শুনল মিটফোর্ড। কান্নার রোল ওপরে উঠছে এবং নামছে তবে থামছে না। দোতলার একটা ঘর থেকে আসছে কান্নার শব্দ।
হলঘরের চারপাশে আবারও টর্চের আলো বুলাল মিটফোর্ড। হলঘরের শেষপ্রান্তে সিঁড়ি। মন্থর গতিতে ওদিকে এগোল সে। বাইতে লাগল সিঁড়ি। ধাপগুলোয় ধুলো মাখা
ধুলোর পুরু আস্তরণ পড়েছে। ওর জুতোর ছাপ পরিষ্কার পড়তে লাগল ধুলোর গায়ে। পেছন ফিরে হলঘর দেখল মিটফোর্ড। টর্চ মারল মেঝেয়। ওখানেও তার জুতোর ছাপ স্পষ্ট ফুটে আছে। ধুলোমাখা মেঝেয় শুধু ওর পায়ের ছাপ।
একটা কথা মনে পড়তেই মিটফোর্ডের কলজেটা তড়াক করে লাফ মারল। ওই লোকটা, ভাবছে সে, ওই লোকটা কয়েক মিনিট আগে এ বাড়ি থেকে ছুটে বেরিয়েছিল
তার পায়ের ছাপ পড়ল না হলঘরের মেঝেতে? ধুলোয় কেন শুধু আমার পায়ের ছাপ দেখতে পাচ্ছি?
ফিরে যেতে মনস্থ করল মিটফোর্ড। মনে মনে বলল, বাইরে থেকেও বাড়ির ওপর নজর রাখতে পারব আমি। রেডিও ব্যবহার করে যোগাযোগ করব থানার সঙ্গে। ডিউটি অফিসারের কাছে সাহায্য চাইব। সাহায্য না আসা পর্যন্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে বাড়িটির দিকে নজর রাখতে পারব। সার্জেন্ট টমাস বুঝতে পারবেন যে আমার সাহায্যের দরকার। আমি কী দেখেছি, তা তাকে রিপোর্ট করব। ছুটে পালানো অদ্ভুত লোকটার ব্যাপারে বলব তাকে। বলব ৩ নং বাড়ির সদর দরজা খোলা। বলব আমার মনে হলো এ বাড়িতে আরও কেউ আছে। আমি–
তবে সে চলে যেতে পারল না। মহিলার কান্না হঠাই থেমে গেছে। দোতলার বেডরুম থেকে ভয়ঙ্কর একটা চিৎকার ভেসে এল।
না! না! প্লিজ, না! জোনাথন, প্লিজ ডোন্ট! প্লিজ… প্লিজ!
ভয়ানক চিৎকারটার জায়গা দখল করল এক বিকট আর্তনাদ, আআআ!
পি.সি. মিটফোর্ড ভালোই ট্রেনিং পেয়েছে। সার্জেন্ট টমাস তাকে ভালো ট্রেনিং দিয়েছেন। তিনি শিখিয়েছেন বিপদ দেখলে কোনো পুলিশম্যানের উচিত নয় সেখান থেকে ছুটে পালানো। মিটফোর্ড জানে তার করণীয় কী। বিকট চিৎকারটি ছিল সাহায্যের জন্য আকুল আর্তনাদ।
কয়েক লাফে সিঁড়ি টপকাল কনস্টেবল। বেডরুমের দরজা বন্ধ। সে জোরে লাথি কষাল দরজায়। একবার…দুইবার… তিনবার। ঝড়াং করে খুলে গেল কপাট।
বেগে ভেতরে ঢুকল মিটফোর্ড। কামরার সর্বত্র দ্রুত বুলাল টর্চের আলো। একটি খালি চেয়ার একটি ড্রেসিং টেবিল
উল্টানো একটি বেডসাইড টেবিল এবং একটি বিছানা চোখে পড়ল। বিছানায় স্কুপ হয়ে আছে বেডক্লথ। মিটফোর্ড ধীরপায়ে হেঁটে গেল ওদিকে। হয়তো কেউ ভারী বেডকুথের স্কুপের নিচে ঘাপটি মেরে আছে।
ডান হাত থেকে বাম হাতে টর্চ নিল মিটফোর্ড। বিছানার ওপর ফেলে রাখল আলো। তারপর বেডক্লথগুলো টান মেরে সরিয়ে ফেলল।
এক মহিলার লাশ তাকিয়ে আছে মিটফোর্ডের দিকে। মহিলার খোলা মুখ দিয়ে বেরিয়ে আছে কালো কুচকুচে জিভ। টর্চের আলোয় দেখা যাচ্ছে যাচ্ছে। মহিলার হলুদ রঙের চামড়া থেকে বিশ্রী, গা গোলানো একটা গন্ধ আসছে।
মাই গড! চেঁচিয়ে উঠল মিটফোর্ড। আমার প্রথম রাতের পেট্রলের দিনেই হত্যাকাণ্ড। আর আমি কিনা খুনিকে পাকড়াও করতে গিয়েও ব্যর্থ হলাম!
বেডক্লথ দিয়ে বীভৎস চেহারার মরা মুখটা ঢেকে দিল সে। বেডরুমের দরজা বন্ধ করে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল মিটফোর্ড। ৩ নম্বর বাড়ির বাইরে এসে রেডিওতে ডিউটি অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করল সে।
পি.সি. মিটফোর্ড বলছি, সার্জেন্ট। আমি রেনার স্ট্রিটে ৩ নং বাড়ির সামনে রয়েছি। এখানে একটি মার্ডার হয়েছে। আমি নিশ্চিত এটি একটি হত্যাকাণ্ড। আমি খুনিকে দেখেছি তবে ধরতে পারিনি। সে প্রায় ছয় ফুট লম্বা। ষাটের কাছাকাছি বয়স। পরনে ছিল কালো সুট। হাতে ছোটো একটি ডাক্তারি ব্যাগ। মৃতজন একজন মহিলা। সে–
সার্জেন্ট টমাস ওকে বাধা দিলেন। এখুনি থানায় রিপোর্ট করো, মিটফোর্ড। তোমার পেট্রল রাত তিনটায় শেষ হওয়ার কথা। এখন প্রায় তিনটা বাজে।
কিন্তু, সার্জেন্ট, এ বাড়িতে একজন মৃত মহিলা পড়ে আছেন আর খুনি পালিয়ে যাচ্ছে। আমার দরকার–
কথার মধ্যে কথা বোলো না, মিটফোর্ড। যা করতে বললাম করো। ৩ নম্বর বাড়ির দরজা বন্ধ করো। তারপর এখানে এসে রিপোর্ট করো। তোমার মেসেজ আমরা পেলাম এবং গ্রহণ করলাম।
রেডিওর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল সার্জেন্ট টমাসের কথা শেষ হতেই। পি.সি. মিটফোর্ড ৩ নম্বর বাড়ির দরজা বন্ধ করল। তালা লাগাল। তারপর পরীক্ষা করে দেখল ঠিকঠাক লেগেছে কিনা। নাহ, ঠিক আছে। তারপর অস্থির চিত্তে সে পা বাড়াল থানায়।
