.
বসো, মিটফোর্ড। নাও, চা খাও, টেবিলের ওপর দিয়ে চায়ের কাপ কনস্টেবলের দিকে ঠেলে দিলেন সার্জেন্ট টমাস। এখন তুমি আমাকে বললো কী ঘটেছে। তাড়াহুড়োর কিছু নেই। আমি তোমাকে বাধা দেব না।
তিনি চুপচাপ শুনে গেলেন কনস্টেবলের গল্প। তারপর বললেন, ঠিক আছে। এখন কয়েকটি প্রশ্নের জবাব দাও। সবার আগে বলো আজ কতারিখ?
১৩ জুলাই, সার্জেন্ট। কিন্তু কেন–?
স্রেফ আমার প্রশ্নের জবাব দাও, মিটফোর্ড। আজ রাতে অনেক কিছু ঘটেছে যা তুমি বুঝতে পারেনি। অনেক কিছু আমারও বোধগম্যের বাইরে। তবে তোমার চেয়ে কিছু জিনিস আমি বেশি জানি।
কিন্তু ওই লোকটা, সার্জেন্ট। আমি রেনার স্ট্রিট ধরে লোকটাকে পালিয়ে যেতে দেখেছি। আমাদের পুলিশ কার নিয়ে ওর খোঁজ নেয়া উচিত।
পুলিশ ওর খোঁজ পাবে না, মিটফোর্ড। কেউই ওর সন্ধান পাবে না।
কিন্তু সার্জেন্ট–
একটু চুপ করে আমার কথা শুনবে? এ গল্পটা খুব সহজ সরল নয়। তুমি বারবার বাধা দিলে আমি ঠিক গুছিয়ে বলতে পারব না সবটা।
সরি, সার্জেন্ট।
এখন ভালো করে চিন্তা করে দেখো মহিলার চিৎকার যখন শুনলে লোকটা তখন কোথায় ছিল?
সে… সে … রাস্তার কোথাও ছিল। ওখানেই তাকে আমি দেখি। সে বাড়িতে ছিল না।
আর যে মহিলাকে তুমি দেখেছ বলে ভেবেছ, মিটফোর্ড, সে–?
ভেবেছি, সার্জেন্ট! ভাবব কেন? ওকে স্বচক্ষে দেখলাম তো!
ঠিক আছে, মিটফোর্ড। উত্তেজিত হয়ো না। তুমি বলছ মহিলা ছিল মৃত?
হ্যাঁ, শান্ত গলায় বলল মিটফোর্ড। তাকে দেখাচ্ছিল…দেখাচ্ছিল, আমি তাকে দেখে ভয় পেয়ে যাই, সার্জেন্ট।… তার জিভ বার হয়ে ছিল…আর ওই বিকট গন্ধ…
হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি জানি। বলেছ তো তুমি। সে কতক্ষণ আগে মারা গেছে বলে তোমার ধারণা?
তরুণ পুলিশ কনস্টেবল জবাব দিল না। সে দুই হাত দিয়ে মুখ ঢাকল।
বলো, মিটফোর্ড। তোমার নিশ্চয়ই কোনো ধারণা আছে। তুমি যখন তাকে দেখলে সে কি ওই সময়েই মারা গিয়েছিল? রাস্তায় যে লোকটাকে তুমি দেখেছ সে কি ঠিক ওই সময়েই মহিলাকে হত্যা করেছিল?
না, সার্জেন্ট, মিটফোর্ড আবার শিরদাঁড়া খাড়া করল চেয়ারে। না, মহিলা তখন মারা যায়নি। আর আমি মহিলাকে দেখার আগে আগেও লোকটা তাকে হত্যা করেনি।
তুমি কী করে জানো?
কারণ… কারণ মহিলা যখন কাঁদছিল আর চিৎকার করছিল তখন সে ওই বাড়িতে ছিল না। আর- ওহ, মাই গড–মহিলা তো মারা গেছে বহু দিন। আগে। আমি যে জিনিসটা দেখেছি–
ঠিক আছে, মিটফোর্ড। ঠিক আছে। আজ রাতটা তোমার খুব খারাপ গেছে। তবু বাকি ঘটনা তোমার জানা থাকা উচিত। রেনার স্ট্রিটে তুমি যে লোককে দেখেছ সে-ও বহুবছর আগে মারা গেছে। না, প্রশ্ন কোরো না। আমি সব কিছুর ব্যাখ্যা দিতে পারব না। আমি শুধু তোমাকে যা ঘটেছে তা-ই বলতে পারব। তুমিই প্রথম পুলিশম্যান নও যে এ ঘটনা দেখেছ। আজকের এই দিনে আগেও এমনটি ঘটেছে। শুনে কিছু বোধগম্য হলো?
মাথা ঝাঁকাল মিটফোর্ড। অন্তত বুঝতে পারলাম আমি পাগল হয়ে যাইনি, সার্জেন্ট। অন্যান্য পুলিশরাও যদি একই ঘটনা দেখে থাকে–
দেখেছে! এখন শোনো। জনৈক ডাক্তার–ডা. জোনাথন টেনিসন এবং তাঁর স্ত্রী রেনার স্ট্রিটে ৩ নম্বর বাড়িতে বাস করতেন। ডাক্তার হিসেবে সুখ্যাতি ছিল তাঁর। সবাই তাকে পছন্দ করত। তবে তাঁর স্ত্রী ছিল খুবই ঝগড়াটে স্বভাবের। আর প্রচুর মদ খেত। মাতাল হয়ে প্রায়ই ডাক্তারের গায়ে হাত তুলত। একবার সে বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়ার চেষ্টাও করে। এক গভীর রাতে ডাক্তার এক অসুস্থ লোককে দেখে বাড়ি ফিরছিলেন। মহিলা মদ খেয়ে মাতাল হয়ে পড়েছিল। সে কান্নাকাটি করছিল, চিৎকার চেঁচামেচি করছিল। ডাক্তার ছিলেন বেজায় ক্লান্ত এবং রোগীকে নিয়ে উদ্বিগ্ন। স্ত্রীর মাতলামি তাঁকে ক্রুদ্ধ এবং হিংস্র করে তোলে। তিনি মোটেই হিংস্র স্বভাবের ছিলেন না, মিটফোর্ড। কিন্তু সেবার তিনি খুবই ভায়োলেন্ট হয়ে ওঠেন। মহিলা বিছানায় শুয়ে তাঁর স্বামীকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করছিল। সহ্য করতে না পেরে ডাক্তার তার গলা টিপে ধরেন। শ্বাসরোধ হয়ে মারা যায় মহিলা। স্ত্রীকে মেরে ফেলেছেন বুঝতে পেরে উদ্ভ্রান্তের মতো বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান ডাক্তার।
দুজনেই কিছুক্ষণ নীরব রইল।
ডাক্তারের কী হলো, সার্জেন্ট? অবশেষে নীরবতা ভঙ্গ হলো মিটফোর্ডের প্রশ্নে।
তিনি পাগলের মতো ছুটছিলেন। দৌড়াতে দৌড়াতে লণ্ডন রোডে চলে আসেন। রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু পড়ে যান গাড়িঘোড়ার মাঝখানে। একটি ভারী লরি তাকে চাপা দেয়।
আবার নিশ্চুপ হয়ে গেল মিটফোর্ড।
এসব কবে ঘটেছে, সার্জেন্ট? জিজ্ঞেস করল সে একসময়।
দশ বছর আগে। জুলাইয়ের ১৩ তারিখ, রাত আড়াইটার দিকে।
আর একটা সাদা গাড়ি যে দেখলাম? গল্পের সঙ্গে ওটার কী সম্পর্ক?
কোনো সম্পর্ক নেই। ওটা ২২ নম্বর বাড়ির মালিকের গাড়ি। সে গাড়িটি ৩ নম্বর বাড়ির সামনে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। ওখানকার রাস্তা চওড়া, তাই। ডাক্তার এবং তাঁর স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে ওই বাড়িতে আর কেউ বাস করে না।
চুপ করে গেলেন সার্জেন্ট টমাস। তারপর বললেন, তুমি ডিউটি বুকে তোমার রিপোর্ট লিখে যাও, মিটফোর্ড। তারপর বাড়ি যাও। তোমাকে খুব ক্লান্ত লাগছে।
একটি কলম নিল মিটফোর্ড। ৩ নম্বর বাড়িতে যা দেখেছি তা নিয়ে কি রিপোর্ট লিখব, সার্জেন্ট?
