মরতে এত দেরি করছে কেন? জিজ্ঞেস করলাম।
মরে গেছে। তবে আরও অনেকক্ষণ এরকম করবে। সাপ এমনই করে।
এটাই তাহলে সেই অশরীরী দানব? যার ভয়ে কাতর হয়ে আছে আদিবাসীরা?
হ্যাঁ। এবং ওয়ালকারের হত্যাকারী। তাঁকে পেঁচিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে মেরেছে।
নিয়ে গেল না কেন তাহলে?
এসেছিল নেয়ার জন্যেই। শুরুতে কারখানায় উঁকি দিয়েছিল। আলো দেখে আর ঢোকেনি। ঢুকেছিল ওয়ালকারের ঘরে, মেরেও ছিল তাকে। কিন্তু গেলার আগেই কোনো কারণে ঘাবড়ে গিয়ে পালায়। সম্ভবত বাজ পড়ার শব্দেই।
এই যে তৃতীয় রাত তৃতীয় রাত করলেন, ব্যাপারটা কি? ভূতপ্রেত তো আর নয়, ঠিক তিনদিন পর পর নিয়ম করে আসত কেন?
সহজ ব্যাখ্যা। তিন দিনে হজম হয়ে যেত মানুষটা, যাকে শিকার করে নিয়ে যেত। খিদে লাগত, তখন আবার আসত নতুন শিকারের সন্ধানে।
তার মানে এলাকাটা এখন বিপদমুক্ত? সাপটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। এখনও নড়ছে ওটা। আরও তো সাপ থাকতে পারে?
না। এখানে এরকম সাপ নেই। ওটা এসেছে ওই ওদিক থেকে। বড়ো বড়ো দ্বীপ আছে, তাতে গভীর জঙ্গল। ওসব জায়গায় এরকম সাপ আছে বলে শুনেছি। নিশ্চয়ই খাবারের অভাব দেখা দিয়েছে কোন এক দ্বীপে। খোঁজ করতে করতে শেষে আটলান্টিক পেরিয়ে চলে এসেছিল এটা এখানে। চলুন, এক কাপ চায়ের এখন বড়ো দরকার। আর লোকজনকে ডেকে বলতে হবে, বিপদ কেটে গেছে। এবার নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারে ওরা। ইস, কি আতঙ্কই না ছড়িয়ে রেখেছিল শয়তানটা এতদিন!
নাইটগার্ড
মধ্য জুলাইয়ের এক রাত। বেশ গরম পড়েছে। স্থির হয়ে আছে বাতাস। পরিষ্কার আকাশে নির্মল চাঁদ। তরুণ পুলিশ কনস্টেবল মিটফোর্ড নির্জন রাস্তায় কেবল নিজের পায়ের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে। এ ছাড়া চুপচাপ রেনার স্ট্রিট। কোনো বাড়ির জানালায় আলো জ্বলছে না। বাসিন্দারা সবাই অঘোরে ঘুমাচ্ছে।
তরুণ কনস্টেবল তার ঘড়ি দেখল। রাত আড়াইটা। নিজেকে হঠাৎ সুখী সুখী লাগল তার। খুব বেশিদিন হয়নি সে পুলিশের চাকরিতে যোগ দিয়েছে। আর রাস্তায় টহল দেয়া এবারই প্রথম। এর আগে অবশ্য এক বয়সী পুলিশম্যান তার সঙ্গে ডিউটি করেছে। এখন পি.সি.মিটফোর্ডকে একাকী টহল দিতে পাঠানো হয়েছে। যাক, অবশেষে সে সত্যিকারের পুলিশম্যান হতে পারল।
রাত বাজে দুটো ত্রিশ। তিনটার সময় তার থানায় গিয়ে রিপোর্ট করার কথা। এরপরে মিটফোর্ডের ডিউটি শেষ। সে বাড়ি যেতে পারবে। সত্যিকারের পুলিশম্যানের ভূমিকায় তার কাজ শেষ হতে চলেছে আধঘণ্টার মধ্যে।
ধীরে ধীরে হাঁটছে মিটফোর্ড, সতর্ক নজর বুলাচ্ছে রাস্তায়। নিজের চোখজোড়া ব্যবহার করার ট্রেনিং দেয়া হয়েছে তাকে। একজন ভালো পুলিশম্যান, সবসময় চোখ কান খোেলা রাখে। তারা শিখিয়েছে ওকে। পি.সি. মিটফোর্ড একজন ভালো পুলিশম্যান হতে চায়। আজ রাতে কোনোকিছুই তার সতর্ক নজর এড়িয়ে যাচ্ছে না। ২৬ নং বাড়ির নিচতলার জানালা দেখা যাচ্ছে খোলা। ২১ নং বাড়ির সদর দরজার বাইরে বাগান করার কিছু যন্ত্রপাতি পড়ে রয়েছে।
যত্তসব কেয়ারলেস মানুষজন! আপন মনে বলল পি.সি. মিটফোর্ড। ভাবে নির্জন রাস্তা বলে নিরাপদেই আছে। তারা চিন্তাই করছে না যে রেনার স্ট্রীটে চুরি ডাকাতি হতে পারে।
একটা মস্ত কালো বিড়াল রাস্তা পার হয়ে ১৩ নং বাড়ির দেয়ালে উঠে পড়ল লাফ মেরে। তারপর দোরগোড়ায় বসে মিটফোর্ডকে টহল দিতে দেখল। পি.সি. মিটফোর্ড মৃদু হাসল। তুমি বাড়ি চলে এসেছ, তাই না? বলল সে। আমিও শিগগির বাড়ি ফিরব। বিদায়, বিড়াল!
মনটা ভারি খুশি লাগছে মিটফোর্ডের। তার রাতের পাহারা শেষ হয়ে যাচ্ছে।
রাস্তার মোড়ে এসেছে সে, দেখল ৩ নং বাড়ির বাইরে বিরাট একটি সাদা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির নম্বর টুক নিল মিটফোর্ড-44B777X। গাড়ির দরজা বন্ধ এবং ঠিকঠাক জায়গাতেই পার্ক করেছে।
গুড, মনে মনে বলল সে, অন্তত একজন সাবধানী মানুষ বাস করেন রেনার স্ট্রিটে।
সে দাঁড়িয়ে পড়ল। তাকাল ৩ নম্বর বাড়িটির দিকে। বেশ বড়ো বাড়ি তবে বাগানের যত্ন নেয়া হয় না বলে আগাছা জন্মেছে এবং দরজায় রঙ লাগানোও দরকার।
আশ্চর্য! ভাবছে মিটফোর্ড। দেখে তো এটাকে বড়ো লোকের বাড়ি বলেই মনে হয়। অথচ ঘরদোর-বাগান এমন অবহেলায় ফেলে রেখেছে কেন মালিক?
মিটফোর্ড হাঁটছে লাগল। ৩নং বাড়ি পার হয়ে কিছুদূর এগিয়েছে, একটা শব্দ শুনতে পেল পেছনে। পাঁই করে ঘুরল সে। বাড়িটির সদর দরজা খোলা। এক লোক বাগানের রাস্তা ধরে গাড়িটির দিকে ছুটে যাচ্ছে। লোকটা বেশ লম্বা, পরনে কালো সুট, হাতে একটা কেস। তার চেহারা চকের মতো সাদা। দেখে মনে হচ্ছে অসুস্থ। চোখজোড়া বিস্ফোরিত এবং কেমন উদ্ৰান্ত চাহনি। মুখের তুলনায় চোখ দুটো ড্যাবড়েবে।
এক মুহূর্তের জন্য সে বড়ো গাড়িটির পাশে থমকে দাঁড়াল। তারপর ঘুরে রাস্তা ধরে ছুটতে লাগল।
কনস্টেবল দৌড়াল তার পেছন পেছন। থামুন! বলল সে। থামুন! কে আপনি? আপনি কি এখানে থাকেন?
লোকটি কোনো জবাব দিল না। মিটফোর্ড ছোটার গতি বাড়িয়ে দিল। জানে লোকটা ওর সঙ্গে দৌড়ে পারবে না।
কিন্তু রেনার স্ট্রিটের মাথায় এসে অদৃশ্য হয়ে গেল লোকটা। এক মুহূর্ত আগেও সে ওখানে ছিল। তরুণ কনস্টেবলের কয়েক হাত দূরে। পরের মুহূর্তে সে নেই হয়ে গেল। চাঁদের ঝলমলে আলোয় যতদূর দৃষ্টি যায় জনমনিষ্যির চিহ্নমাত্র নেই।
