‘‘শোনো ভাইপো, সম্পূর্ণ অজান্তে তুমি যেখানে পা দিয়েছ সে বড় বিপজ্জনক ফাঁদ৷ মুশকিল হচ্ছে এখন সেখান থেকে তুমি চাইলেও বেরিয়ে আসতে পারবে না৷’’
‘‘কেন? পারব না কেন?’’
‘‘কারণ স্বয়ং মদনদেব তাতে বাধা দেবেন৷’’
ঘোরতর প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিলুম৷ তার আগেই আমাকে থামিয়ে দিলেন কাকা, ‘‘শোনো বাপু, সংসার করিনি তো কী হয়েছে, তাই বলে সাংসারিক জ্ঞান আমার কিছু কম নয়৷ শুনেছ তো, লালন গেয়ে গেছেন, অমাবস্যায় পূর্ণিমার তিথি, পুরুষের ক্ষয়ের ভীতি৷’’
ইঙ্গিতটা বুঝতে কষ্ট হল না৷ কানটা সামান্য গরম হয়ে উঠল৷ ছি ছি ছি, আমার বলার মধ্যেই এরকম কিছু ইঙ্গিত লুকিয়ে ছিল নাকি?
তবে সে সংশয় দূর হল কাকার পরের কথায়, ‘‘অত কিছু ভেবে লাভ নেই ভাইপো, এ তোমার ভবিতব্যের লিখন৷ তোমার কুষ্ঠী আমার মুখস্থ৷ আমি জানতাম যে তোমার জীবনে এই দিনটা আসতে চলেছে৷ আমার দৃঢ় ধারণা সেটা তুমি নিজেও দেখেছ, কিন্তু লক্ষ করোনি৷ একটা বিশাল ঝড় আসতে চলেছে তোমার ওপর৷ সেটা তুমি একা সামলাতে পারবে না৷ তার জন্য এই শর্মাকে তোমার দরকার৷ আমাকে ওখানে আসতেই হবে৷’’
এর পরে আর কথা চলে না৷ কাকা বললেন, যে করে হোক উনি পরের দিন সকাল নাগাদ তিনসুকিয়া চলে আসবেন৷ তার মধ্যেই আমি যেন মাধুরীর কেসটা ভালো করে জেনে রাখি৷
সেদিন পরাগদের ওখান থেকে যখন বাড়ি ফিরি তখন বেশ দুপুর৷ কাকিমা জানতেন যে আজ আমি বাড়িতেই খাব৷ দেখি আমার পছন্দের বোয়াল মাছের ঝাল আর কুমড়োফুলের বড়া রান্না করা হয়েছে৷ সঙ্গে ঘরে পাতা দই৷
মাথা নীচু করে খাচ্ছি, কাকিমা কানের কাছে ফিসফিস করে সতর্ক স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘কথা কিছু এগোল বাবা?’’
আড়চোখে তাকিয়ে দেখি রান্নাঘরে মাধুরী, বড়া ভাজছে৷ কাকিমার সতর্কতার কারণ বুঝলাম৷
‘‘আপনাকে কিছু বলেছে?’’
কাকিমা তড়িৎগতিতে মাধুরীর দিকে একবার তাকিয়েই ফের এদিকস্থ হলেন, গলাটা আরও নীচু করে বললেন, ‘‘না৷’’
আমিও গলা নামিয়ে খুব সংক্ষেপে জানালাম যে বার্তালাপ শুরু হয়েছে বটে৷ কিন্তু এখন তিনি বা কাকু এর মধ্যে বরং না ঢুকলেই ভালো৷ বিশদে কিছু বললাম না আর, কারণ ব্যাপারটা আমি নিজেই ভালো করে বুঝে উঠতে পারিনি৷
আড়চোখে দেখলাম প্লেটে আরও কয়েকটা কুমড়োফুলের বড়া নিয়ে মাধুরী এদিকেই আসছে৷ আমি স্বাভাবিক হলাম৷ উচ্চকণ্ঠে মাধুরীর রান্নার প্রশংসা করলাম৷ মেয়েটার গাল দুটো অল্প লাল হল৷ অল্প হেসে বলল, ‘‘তাও তো আমার দিদিমার হাতের রান্না খাননি৷’’
‘‘তাই নাকি? তিনি এর থেকেও ভালো রাঁধতেন?’’
‘‘ভালো? অসাধারণ বললেও কম বলা হয় বাবা’’, এবার জবাব দিলেন কাকিমা, ‘‘আমার মায়ের হাতের রান্না একবার যে খেয়েছে সে জীবনে ভুলতে পারত না৷ আর শুধু রান্নাবান্না কেন, অনেক কিছুতেই মায়ের হাত একেবারে সোনায় মোড়া ছিল৷ হোমিওপ্যাথি জানতেন খুব ভালো, অপূর্ব সুন্দর গান গাইতে পারতেন, সেলাই-ফোঁড়াই থেকে শুরু করে বাগান করা, আমার মায়ের সবেতেই আশ্চর্য দক্ষতা ছিল৷’’
‘‘আরিব্বাস, দিদিমার তো অনেক গুণ ছিল বলতে হবে৷’’
‘‘সে আর বলতে? তা ছাড়াও মায়ের ছিল দয়ার শরীর৷ পাড়ায় কার মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না, টাকার অভাবে কার বাচ্চার পড়াশোনা আটকে আছে, কার শরীর খারাপ, কে মা-বাবাকে দেখছে না, সব কিছু মায়ের নখদর্পণে থাকত৷ লোকে ভগবানের মতো মানত মাকে৷ মায়ের নামটিও ছিল তেমনই মানানসই, মহামায়া৷’’
‘‘আর আমাকে যে খুব ভালোবাসত দিদুন, সে কথা বললে না?’’ আদুরে গলায় বলল মাধুরী৷
‘‘সে তো বাসতেনই’’, আদর করে মেয়ের নাকটা টিপে দিলেন কাকিমা৷ তারপর আমাকে বললেন, ‘‘বুঝলে বাবা, আমার মেয়েকে প্রাণের থেকেও ভালোবাসতেন আমার মা৷ দিনরাত কোলে নিয়ে বসে থাকতেন আর মাথায় বুকে হাত বুলোতেন৷ আমাকে বলতেন, ‘ওকে খুব যত্ন করে মানুষ করিস মা, তোর মেয়ে ভৈরবীচিহ্ন নিয়ে জন্মেছে৷ ও ঈশ্বরকোটির মেয়ে, ও সাধারণ মেয়ে নয়’৷’’
ভৈরবীচিহ্ন, ঈশ্বরকোটি, এসব শুনে মাথার মধ্যে কিছু একটা টিকটিক করে উঠল৷ কিন্তু আমি কিছু বলার আগেই মাধুরীর ফের সেই আদুরে গলা, ‘‘আর ওই যজ্ঞটার কথা বললে না মা?’’
‘‘ধুর পাগলি৷ সেসব কি এখন বলার সময়?’’ মেয়ের মাথায় আদরের হাত বুলিয়ে দিলেন কাকিমা৷
‘‘কীসের যজ্ঞ? শুনি শুনি’’, বেশ উৎসাহিত হয়ে উঠলাম৷
‘‘আরে সে এমন কিছু নয়’’, সামান্য হাসলেন কাকিমা, ‘‘আমার মা খুব ধার্মিক মানুষ ছিলেন বাবা৷ যত কাজই থাক, ঈশ্বরচিন্তা করতে ভুলতেন না৷ কতদিন দেখেছি দিনরাত সংসারের নানা কাজ সামলে রাত্রে ধ্যানে বসতে৷ মানে ধরো আমি পাশে শুয়ে আছি ঘুমের ভান করে, আর চোখ পিটপিট করে দেখছি মা শিরদাঁড়া সোজা করে পদ্মাসনে বসে ধ্যান করছেন৷’’
‘‘বাপ রে! এসব তো সাধিকা যোগিনীরা করেন৷’’
‘‘তা আমার মা কোনো যোগিনীর থেকে কম ছিলেন না বাবা৷ আর হবে নাই বা কেন, কার মেয়ে সেটা দেখতে হবে তো৷ আমার দাদামশাই কৃষ্ণশঙ্কর মণ্ডল ছিলেন একজন বিখ্যাত অবধূত, গৃহী তান্ত্রিক৷ বহু লোকের উপকার করেছেন জীবনে৷ গোটা পরগনার লোক আমার দাদামশাইকে যেমন ভালোবাসত, তেমনই ভক্তিশ্রদ্ধা করত৷ এমনও শুনেছি দাদামশাই রাস্তায় বেরোলে নাকি লোকে রাস্তার ধারে সরে যেত, যাতে ওঁর ছায়ার ওপর কারও পা না পড়ে, এমনই সম্মান পেতেন মণ্ডলমশাই৷ আমার মা তেমনই সাধকের বেটি বটে!
