তা আমার মা যখন মারা যান, তখন মাধুর বয়েস আট৷ একদিন হঠাৎ আমাকে ডেকে বললেন, ‘আমার আর বেশিদিন নেই রে শর্মিলা, সামনের কৌশিকী অমাবস্যায় আমি দেহ রাখব৷ তোরা যজ্ঞের আয়োজন কর৷’ আমরা তো অবাক৷ তখনও মায়ের চুল সব পাকেনি, দিব্যি কর্মঠ আছেন৷ কিন্তু তাঁর কথা অমান্য করার উপায় নেই, যজ্ঞের আয়োজন করতেই হল৷’’
‘‘কীসের যজ্ঞ?’’ আমার খাওয়ার গতি স্তব্ধ হয়ে এল৷
‘‘সে বলতে পারব না বাবা৷ তিনি যজ্ঞের আয়োজন করলেন কৌশিকী অমাবস্যার ঠিক আগের রাতে৷ তার আগেই বাড়ির সব্বাইকে বলা হয়েছিল সে রাতটা বাইরে অন্য কোথাও কাটাতে, বাড়িতে শুধু আমি, মা আর মাধু৷ রাত বারোটার সময় মা হোমে বসলেন৷ যেসব বিচিত্র জিনিস দিয়ে সে যজ্ঞে আহুতি দিলেন মা, তা দেখে তো আমার বুক ভয়ে দুরুদুরু৷ সে যজ্ঞ চলল ভোররাত অবধি৷ ততক্ষণ যজ্ঞস্থল ছেড়ে মা আমাদের দুজনকে উঠতে অবধি দেননি৷ হোম শেষ হওয়ার পর মা যজ্ঞকুণ্ডে জল ছিটিয়ে মাধুকে বললেন, ‘ছাইয়ের ভেতরে হাত দে মেয়ে’৷’’
‘‘তারপর?’’
এবার মাধুরীর গলা, ‘‘আমি তো ছাইয়ের ভেতরে হাত দিয়ে হাতড়াচ্ছি৷ দিদুন আমার দিকে উদ্বিগ্নভাবে চেয়ে আছেন৷ এমন সময় নরম নরম গোলমতো কী একটা যেন আমার হাতে ঠেকল৷ দিদুনকে সেটা বলতেই দিদুন বলল, ‘এক্ষুনি ওটা বার করে আন মা৷’ আমি বার করতেই দিদুন ওটা আমার হাত থেকে ছিনিয়ে নিল প্রায়৷’’
‘‘সেইদিন ভোরে মা একটা মাদুলি দিয়ে যান ওকে সবসময় পরার জন্য৷ আর সেইদিনই সন্ধে আটটা নাগাদ মা মারা যান৷’’
আবার খাওয়াতে মনোনিবেশ করলাম৷ এরকম গল্প জীবনে কম শুনিনি৷ বাংলার হাটেবাজারে কান পাতলেই এমন গল্প হাজার একটা শোনা যায়৷ একটা কুমড়োফুলের বড়া মুখে দিয়ে বেশ আয়েশ করে বললাম, ‘‘আরও একজন মস্ত বড় সাধক তিনসুকিয়া আসছেন কাল বিকেল নাগাদ, এই মাধুরীর ব্যাপারেই আমাকে একটু সাহায্য করতে, জানেন তো?’’
‘‘কে বাবা? কে আসছেন?’’ সাধক শুনেই কাকিমা উত্তেজিত হয়ে পড়লেন৷
খেতে খেতে আমি কাকার আসার কথা বললাম৷ কাকিমা শুনে সবিশেষ সন্তুষ্ট হলেন, তাঁর মেয়ের সমস্যার সমাধানের ব্যাপারে আরও একজন এক্সপার্ট যোগ দিচ্ছেন বলে৷ মাধুরী কিছু বলল না বটে, তবে হাবেভাবে বোঝা গেল যে তার বিশেষ আপত্তি নেই৷ গত কয়েকদিনের কাঠিন্য এখন অনেকটাই উধাও৷
খেয়েদেয়ে ঘরে গিয়ে একটু গড়িয়ে নিতে নিতেই বেলা বয়ে গিয়ে বিকেল৷ ঘর থেকে উঠে বাইরে বেরিয়ে একটা সিগারেট ধরালাম৷ চারিদিকে দিব্যি ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে, কাকুর বাংলোর সামনে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে তিনসুকিয়া টাউনের শান্ত অলস বিকেল৷ কলতলার দিক থেকে শিউলিফুলের হালকা সুবাস ভেসে আসছে৷ মাথা উঁচু করে একটা ধোঁয়ার রিং ছাড়লাম৷ আকাশে ঝকঝকে সাদা মেঘের দল৷ কোথায় ভেসে যাচ্ছে কে জানে?
সিগারেট শেষ করতে না করতেই কানের কাছে একটা মৃদু ঘসঘস আওয়াজ শুনলাম৷ চোখ নামিয়ে দেখি মাধুরী৷ পরে এসেছে একটা খুব সাধারণ মেখলা শাড়ি৷ জমির রং সাদা, পাড় গাঢ় সবুজ রং-এর৷ হঠাৎ করে আমার কেমন যেন মনে হল উজনি আসামের এই উন্মুক্ত প্রকৃতির যিনি অধীশ্বরী, সেই সাক্ষাৎ বনদেবীই যেন নেমে এসেছেন আমার সামনে৷ এই প্রথম লক্ষ করলাম মাধুরীর সুঠাম সুডৌল শরীর, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ ত্বক, পদ্মকাণ্ডের মতো ফর্সা দুটি হাত আর গভীর কালো আঁখি দুখানি৷ মুখে একটা হালকা হাসির আভাস৷ এই প্রথম লক্ষ করলাম যে হাসলে মাধুরীর গজদন্ত দুটি সামান্য উন্মুক্ত হয়, আর তাতে ভারী সুন্দর দেখায় তাকে৷
মনটাকে শক্ত করলাম৷ অনেক দিন ধ্যান প্রাণায়াম এসব হয় না, তাই চিত্ত কুপিত হয়েছে৷ নইলে এসব উদ্ভট চিন্তা মাথায় আসবে কেন?
মাধুরীকে নিয়ে ঘরের ভেতরে এসে বসলাম৷ তারপর সেই প্রশ্নটা করলাম, যেটার উল্লেখ প্রথমেই করেছি৷
মাধুরী খানিকটা বিবর্ণ হয়ে গেল যেন৷ একটু আগের সেই ঝলমলে ভাবটা উধাও৷ মাথা নীচু করে কী যেন ভাবল একটা৷ তারপর বলতে লাগল, ‘‘এইখান থেকে যে কী হল দাদা, সে আমি এখনও বুঝিনি৷ তবে পুরো বিষয়টা মনে পড়লেই গা ঘিনঘিন করে ওঠে৷
ওদের বাড়িতে যখন পৌঁছোই, তখন দুপুর হবে হবে করছে৷ দরজায় দাঁড়িয়ে সবে বেল বাজিয়েছি কি বাজাইনি, দরজাটা খুলে গেল৷ দেখি দিভাই বেরিয়ে এসেছেন৷ কোথাও যেন একটা যাচ্ছিলেন৷ আমাকে দেখে একটু চমকে গেলেন, বললেন, ‘এ কী মাধু, মুখ-চোখ এমন শুকনো দেখাচ্ছে কেন? শরীর ভালো তো?’
দিভাইকে প্রণাম করে ঘরে গিয়ে উঠলাম৷ যাদবকাকু লাগেজ পৌঁছে দিয়ে ফিরে গেলেন৷ অনির্বাণ ভেতরেই ছিল, সেও সাততাড়াতাড়ি বেরিয়ে এল৷
দুজনকে পুরো ঘটনাটা বললাম৷ জ্বরের কথা, স্বপ্নের কথা, ভোরের দিকে হঠাৎ করে জ্বর ছেড়ে যাওয়া, সবই বললাম৷ দিভাই মাথায় হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন৷ অনির্বাণ শুনে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠল ডাক্তার দেখানোর জন্য৷ আমিই বারণ করলাম৷ বললাম যে বিকেল বা সন্ধের দিকে দেখালেও হবে৷
সেদিন রাত্রে খাওয়াদাওয়া করে শুতে যাব, এমন সময় দিভাই ঘরে এলেন৷ ব্যস্তসমস্ত ভাবে বললেন, ‘মাধু, তোকে যে ঠাকুরের মূর্তিটা দিয়েছিলাম, ওটা কোথায়?’
মূর্তিটা নীচে আমাদের আলমারিতে রেখে দিয়েছিলাম৷ শুনে দিভাই ভারী রাগ করলেন, বললেন, ‘ও কি ঘর সাজাবার জিনিস? সঙ্গে রাখতে হয়৷ ওইজন্যই তো তোর এত অসুখবিসুখ! এক্ষুনি নিয়ে আয় ওটাকে, মাথার দিকে ওই কুলুঙ্গির মধ্যে রাখ৷’
