কান্তার কাহিনীর আরও একটা দিক আছে। দেশান্তরের অভিজ্ঞতার ভয়াবহতা বোধ হয় সব চেয়ে বেশি আঘাত করে তাদেরই, পরিবারের ভেতর যাদের নিরাপত্তা কিছুটা কম। এর ফলে সাধারণভাবেই পুরুষদের তুলনায় মেয়েদের ওপর এইসব ঘটনার প্রতিক্রিয়া ভিন্ন। কান্তার ক্ষেত্রে তার ওপর আরও জটিলতা এসে জড়ো হয়েছে। নতুন পরিবেশের সঙ্গে বোঝাপড়া করার দায়িত্ব প্রায় সম্পূর্ণই এসে পড়েছিল তাঁর একার ঘাড়ে। অসুস্থতার জন্য কান্তার স্বামীর যৌথ পরিবারের মধ্যে কোনও ক্ষমতা ছিল না। ঠিক সেই রকম, বাপের বা শ্বশুরবাড়ির ওপর নির্ভরশীল অল্পবয়সী বিধবা মেয়েদের ক্ষেত্রেও এই একই জটিলতা দেখা যায়। এই রকম এক বিধবার গল্প দিয়ে এই লেখাটা শেষ করব।
বিপন্নতা
ধরা যাক এঁর নাম আশা। আমার সঙ্গে যখন দেখা হয় তখন আশার বয়স পঞ্চান্ন। ১৯৪১ সালে আশার যখন কুড়ি বছর বয়স, তখন স্বামী টাইফয়েডে মারা যান। যৌথ পরিবারে ভাইদের মধ্যে স্বামীই ছিলেন সব চেয়ে ছোট। মা মারা যাওয়ার পর দাদারাই তাঁকে মানুষ করেন, ফলে দাদাদের সঙ্গে স্বামীর সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ ছিল। স্বামী মারা যাওয়ার পর আশা শ্বশুরবাড়িতেই থেকে যান। ভাশুর-জায়েরা তাঁকে সাহায্য করতে কার্পণ্য করেননি। আশার ছেলেপুলে ছিল না। ছোট ননদ তাঁর নিজের ছেলেকে আশাকে দিয়ে দেন পোষ্য হিসেবে। ছেলে অবশ্য তার নিজের মায়ের কাছেই থেকে যায়। সকলেই ধরে নেয়, বড় হলে এই ছেলেই আশার ভরণপোষণের দায়িত্ব নেবে। এরকম ব্যবস্থা যৌথ পরিবারে প্রায়ই ঘটত।
এইভাবে দেশভাগ হওয়া পর্যন্ত আশা শ্বশুরবাড়িতেই বাস করছিলেন। বাপের বাড়ি ছিল জলন্ধরে। এপারে চলে আসার পর সেখানেই আশ্রয় নিতে পারতেন আশা। বিশেষ করে যখন শ্বশুরবাড়ির লোকেরা একেবারে নিঃস্ব অবস্থায় লাহোর ছেড়ে চলে আসতে বাধ্য হয়। আশা তাঁর ‘পালিত’ পুত্রের সঙ্গে কিছুদিন বাপের বাড়িতেই রইলেন। কিন্তু পারিবারিক জটিলতা ক্রমে অসহনীয় হয়ে উঠল। যে-কোনও ঝামেলাতেই দোষ এসে পড়ত আশার ওপর। এমনকি শ্বশুরবাড়ির লোকেরা তাঁকে তাঁর স্বামীর মৃত্যুর জন্যও দায়ী করতে লাগল। ‘ওঁরা বলত, আমি যথেষ্ট সুন্দর নই বলে নাকি আমার স্বামীর বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাই চলে গিয়েছিল। সে খুব সুপুরুষ ছিল, আর আমি একেবারেই সাদামাটা। কথাটা শুনতে আমার এত খারাপ লাগত যে মাঝেমাঝে ভাবতাম আত্মহত্যা করব।’
চার বছর ধরে আশা একবার বাপের বাড়ি, একবার ননদের বাড়ি, এইভাবে চালাতে লাগলেন।
সবখানেই আমি সংসারের কাজে সাহায্য করার চেষ্টা করতাম। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজকর্মে লেগে থাকতাম। বাচ্চাগুলোকে আমি খুব ভালবাসতাম, তাই কোনও কষ্ট হত না। কিন্তু সকলেই আমায় ঠেস দিয়ে কথা বলত। ব্যাপারটা একেবারে অসহ্য হয়ে উঠল যখন বড় নন্দাই আমার দিকে নজর দিতে শুরু করলেন। (বড় ননদ দাঙ্গায় মারা গিয়েছিলেন।) একদিকে মৃত স্বামীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে চাইতাম। বড় ননদকেও খুব ভালবাসতাম। কিন্তু নতুন একটা সম্পর্ক হতে পারে, এটাও আমাকে আকৃষ্ট করত। কি করা উচিত, বুঝতে পারতাম না। আমাকে নিয়েই যেন সকলের টানাটানি। নন্দাই কখনো বিয়ের কথা বলেননি। এতদিন এক বাড়িতে আছি, সে ভয়ানক লজ্জার ব্যাপার হত। আমার স্বামীর এক বন্ধু থাকতেন পুনায়। শেষ পর্যন্ত তাঁকেই চিঠি লিখলাম। তিনি আমায় পুনায় এসে কিছুদিন থাকতে বললেন। পুনায় যাওয়ার পর তিনি আমায় খুব বোঝালেন। বললেন, ‘গোটা জীবনটাই পড়ে রয়েছে তোমার সামনে। এভাবে সব সময় অপমানিত হয়ে থাকবে কেন? আবার বিয়ে করো।’ পুনার এক ভদ্রলোক ওঁর বন্ধু ছিলেন। ধনী লোক। ওঁর স্ত্রী তাঁকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে আমার বিয়ের সম্বন্ধ হল। বাপের বাড়ি আর শ্বশুরবাড়িতে লিখলাম বিয়ের কথা। তুমুল গোলমাল বেঁধে গেল। ওঁরা বললেন, আর আমার মুখদর্শন করবেন না। আমি গোটা পরিবারের ইজ্জত ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছি। ঠিকই বলেছিলেন ওঁরা। কলঙ্ক তো বটেই। ওঁরা আমায় কত ভালবাসতেন। তারপর ওঁদেরই যখন বিপদ এল, তখন আমি পালিয়ে গিয়ে ওঁদের বংশে কালি দিলাম। সমাজে আর ওঁরা মুখ দেখাতে পারবেন না। কিন্তু আমিই বা কি করব বলুন? আমার কোনও উপায় ছিল না।
তীব্র সংকটের মধ্যে পড়লেন আশা, বিয়ে করার চার বছরের মধ্যে তাঁর দুটি সন্তান হল। কিন্তু পুরনো শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারলেন না। এদিকে নতুন স্বামীরও তাঁর প্রাক্তন স্ত্রী-র সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রইল। আগের স্ত্রী মাঝে মাঝেই চলে আসতেন। বোঝাতে চাইতেন যে সম্পত্তির ওপর তাঁর ছেলেমেয়ের দাবি অটুট রয়েছে। একটি ছেলে এ-বাড়িতে এসেই থাকতে শুরু করল। আশার সঙ্গে একাধিক সাক্ষাৎকারের পর আমার মনে হয়েছিল আশা নিজেও নিজেকে খানিকটা তাঁর স্বামীর রক্ষিতা হিসেবেই ভাবতেন, স্ত্রী হিসেবে নয়। আগের পক্ষের স্ত্রী যখন আসতেন, তখন তাঁর কেমন লাগত জিজ্ঞেস করাতে আশা একটু আশ্চর্য হয়েই আমায় বললেন, ‘কেন? ওর তো আসার অধিকারই ছিল।’
ব্রাহ্মণ্যধর্মে বৈবাহিক সম্পর্কের যে গভীর ধর্মীয় ভিত্তি আছে, এটা হয়তো তারই প্রতিফলন। কিন্তু যেটা লক্ষণীয়, সেটা হল প্রাক্তন স্বামীর পরিবারের সঙ্গে আশার সম্পর্ক। পুনর্বার বিবাহের পর আশা খুব সহজেই আগের সম্পর্কগুলো মুছে ফেলতে পারতেন। তা না করে সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য প্রাণপাত চেষ্টা চালিয়ে গেলেন তিনি। দ্বিতীয়বার বিয়ে করার পরেও ছোট ননদের সঙ্গে তাঁর চিঠির আদানপ্রদান ছিল। যে নন্দাই একসময় তাঁকে নানারকম প্রস্তাব দিতেন, তিনি অবশ্য আশার চরিত্র সম্বন্ধে সব চেয়ে বেশি কুৎসা রটিয়েছিলেন। কিন্তু ছোট ননদ একটা মিটমাট করার চেষ্টা করে যেতে লাগলেন। অবশেষে আট বছর পর ছোট ননদ একদিন পুনায় আশার কাছে এলেন।
