আগের পক্ষের শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক টিঁকিয়ে রাখার এত কি প্রয়োজন ছিল? আশার বক্তব্য, তাঁর ছোট ননদের প্রতি ভালবাসার জন্যই তিনি এত সচেষ্ট ছিলেন যাতে একটা কোনও সম্পর্ক বজায় থাকে।
‘আমার যখন বিয়ে হয়, এই ননদটি তখন খুব ছোট। সে সবসময় আমার সঙ্গেই থাকত। নানারকম খেলা তৈরি করেছিল আমার সঙ্গে। আমরা একজন আর একজনের দুপাট্টা পরতাম। এক থালায় খেতাম। সে এক গ্রাস আমার মুখে পুরে দিত, আমি এক গ্রাস ওর মুখে দিতাম। অন্যেরা আমাদের দেখে হাসত। খুব মজা হত।…আমার স্বামীর সঙ্গে তো খুব একটা বেশি দিন থাকতে পারিনি। ফুল ফুটতে না ফুটতেই যেন ডাল থেকে পেড়ে নিল কে। আমার শখ-আহ্লাদ ছিল অনেক। অন্য সময়, অন্য অবস্থায় সে সব মিটত নিশ্চয়ই। কিন্তু এটা নিশ্চিত জানতাম, ওই বাড়ির সঙ্গে সম্পর্কটা আমায় রাখতেই হবে।’
দ্বিতীয় বিয়ের তাৎপৰ্যটা তাহলে কি? আপাতদৃষ্টিতে সে বিয়েটা তো সুখের। সুন্দর দুটি মেয়ে হয়েছে আশার। তাদের নিয়েই থাকেন সবসময়
হ্যাঁ, খুব সুখে আছি। এরকম স্বামী পাওয়া আমার সৌভাগ্য। উনি আমায় কোনও কষ্ট দেননি। আমিও যথাসাধ্য ওঁর যত্ন করি। কিন্তু দ্বিতীয় বিয়েটা তো করতে হল এই পোড়া শরীরটার জন্য। তার তাড়নাগুলো তো আমি সামলাতে পারি না। শুধু আমার নিজের তাড়নাই নয়, পুরুষেরা যখন আমার দিকে তাকাত, আমার তো তখন কিছু করার থাকত না। ওরা তো আমায় দেখত না, আমার এই শরীরটাকে দেখত। নন্দাই যদি আমার দিকে নজর না দিতেন, আমি হয়তো শুদ্ধ হয়েই থাকতে পারতাম, বিধবার যেমন থাকা উচিত। কিন্তু ওই ঘটনার পর আমার ননদের সামনে আর দাঁড়াতাম কি করে? পরলোকে স্বামীর সামনেই বা দাঁড়াতাম কি করে? এখনকার স্বামীর সঙ্গে তো সাময়িক বোঝাপড়া। সমুদ্রে ঝড় উঠলে দু-টুকরো কাঠে যেমন হঠাৎ ঠোকাঠুকি লেগে যায় আর পরক্ষণেই আলাদা আলাদা ভেসে চলে যায়, সেই রকম। ওনার সঙ্গে সব দেওয়ানেওয়া এ-জন্মেই চুকিয়ে ফেলতে হবে। তা হলে আর আমার কোনও দুঃখ থাকবে না। ওনার তো আর একজন স্ত্রী আছে। ঈশ্বরের চোখে সেই ওঁর পাশে থাকবে। আমি তো পাপী।
মনে হতে পারে তাঁর মৃত স্বামীর প্রতি আশার একটা গভীর টান আছে। কথা বলতে গিয়ে কিন্তু দেখেছি, স্বামীর চরিত্রটা তাঁর কাছে খুবই ধোঁয়াটে। একবার যেমন বললেন, স্বামীর সঙ্গে ওঁর কয়েকটা পুরনো ফটোগ্রাফ আছে। ‘সেগুলো দেখলে মনে হয় অচেনা দুটো লোক।’ ওঁর কথাবার্তায় ননদেরাই অনেক বেশি জীবন্ত চরিত্র হিসেবে উপস্থিত হত। বিশেষ করে ছোট ননদ যে পরিবারের আপত্তি সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত একটা সম্পর্ক টিঁকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। মনজিতের ক্ষেত্রে যেমন দাদা, ঠিক তেমনি আশার ক্ষেত্রে তাঁর নন্দাই—যাকে রক্ষক হিসেবে ভেবেছিলেন, তার দিক থেকেই যখন আক্রমণটা এল, আশার পরিচিত জগৎটা খানখান হয়ে গেল। বর্তমানের সঙ্গে অতীতের সম্পর্কটা জোড়া লাগল শেষ পর্যন্ত অন্য মেয়েদের সাহায্যে। আশা কিন্তু মেয়েদের এই স্বতন্ত্র সামাজিকতার শক্তি সম্বন্ধে সচেতন ভাবে কিছু বলতে পারেননি। প্রচলিত স্ত্রী-পুরুষ সম্পর্কের মধ্যে দিয়েই তাঁর জীবনকাহিনী বোঝাবার চেষ্টা করেছেন।
অনুবাদ: পার্থ চট্টোপাধ্যায়
কথকতার নানা কথা – গৌতম ভদ্র
১ কথকের জন্ম: পাঠ থেকে ‘কথা’
বাংলাদেশে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে কথকদের বোলবোলা ছিল বলেই মনে হয়। সুরধুনী কাব্যে গঙ্গা-প্রবাহের যাত্রাপথের সঙ্গে সঙ্গে দীনবন্ধু মিত্র বিখ্যাত জায়গা ও তাদের খ্যাতির কারণ বলছেন। তাঁর মতে, বাঁশবেড়িয়া (বংশবাটি) বা ভাটপাড়ার খ্যাতির পিছনে আছেন শ্রীধর কথক বা রামধন ‘কথকরতন’।১ অপরপক্ষে তর্কযুদ্ধে অবতীর্ণ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রতিপক্ষদের জব্দ করতে কৃষ্ণহরি শিরোমণি নামে কথক চূড়ামণি সম্পর্কে চালু লোকগল্পকে মোক্ষম অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন।২ গৌড়দেশ-খ্যাত কথকদের জন্ম ও কৃতি এই সময়কালে আবদ্ধ।
‘বাগ্জীবন’ বা কথোপজীবীরা মানুষজনকে আনন্দ দিয়ে দুই পয়সা কামাই করে এবং সেইজন্য কর দিতে তারা বাধ্য, কৌটিল্য সেইদিকে সজাগ দৃষ্টি কতকাল আগেই রেখেছিলেন।৩ তবে উনিশ শতকে প্রচলিত দেশজ রীতিতে পুথি তৈরি করে পৌরাণিক আখ্যান বলার চল অষ্টাদশ শতকের আগে চালু ছিল বলে মনে হয় না।৪ উনিশ শতকের, প্রারম্ভে ওয়ার্ড সাহেবের বর্ণনায় স্পষ্ট যে, সকালে মূল গ্রন্থ পাঠ বা পারায়ণ হত। বিকেলে সাধারণের জন্য বাংলায় মূল গ্রন্থের অনুবাদ ও ব্যাখা করতেন যাঁরা ‘কথক’ বলা হত তাঁদেরই।৫ সংস্কৃত ও বাংলা, দুই ভাষার দুই গোত্রের পড়ুয়া: পাঠক ও কথক। ঊনবিংশ শতকের গোড়াতে জয়নারায়ণ ঘোষাল তাঁর ‘করুণা নিধান বিলাসে’ (১৮১১) পাঁচালি, রামায়ণ, তরজা ইত্যাদি অবসর বিনোদনের নানা অনুষ্ঠানের তালিকাতেও কথকতাকে স্থান দিয়েছিলেন।৬
লোকগ্রাহ্য জনশ্রুতি অনুসারে প্রতিযোগিতার চাপে ভাগবত চিত্তাকর্ষক করতে বাঁকুড়ার সোনামুখীর গদাধর শিরোমণি বঙ্গদেশে কথকতার ঢঙ চালু করেন। অন্ততপক্ষে বাংলা সাহিত্যের আদি ইতিহাসের চটি বইগুলিতে এই কথা বার বার লেখা হয়েছে।
বৈকালে শিরোমণি মহাশয় বেদীতে বসিয়া ভাগবতের কোন কোন স্থান ব্যাখ্যা করিতেন। তিনি উত্তম ব্যাখ্যাতা ছিলেন। অন্যান্য স্থানে তাঁহার ব্যাখ্যা শুনিতে বিস্তর লোক উপস্থিত হইত। কিন্তু ঐ স্থানে অধিক শ্রোতা আসিতেছে না দেখিয়া শিরোমণি মহাশয় তাঁহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। শুনিলেন, নিকটে একস্থানে রামায়ণ গান হইতেছে। শিরোমণি মহাশয় বলিলেন ‘আচ্ছা, সকলকে বলিবে কল্য হইতে আমার নিকট ভাগবত গান শুনিতে পাইবে।’ তিনি যেমন সুপণ্ডিত তেমনি গায়ক ও কবি ছিলেন। রাত্রিতে পরদিনের ব্যাখ্যেয় অংশকে তাঁহার স্বকপোল উদ্ভাবিত কথকতার রীতিতে পরিণত করিয়া রাখিলেন। পরদিন বৈকালে নতুনরীতির কথকতা আরম্ভ করিলেন; চারিদিক হইতে লোক ভাঙ্গিয়া পড়িল। তাঁহার স্বরসংযোগ, বাক্যবিন্যাস, ব্যাখ্যা ও সঙ্গীত পদাবলী শুনিয়া লোকে বিস্মিত ও মোহিত হইল। এইরূপে শিরোমণি মহাশয় প্রতিদিন ধ্রুবচরিত্র, প্রহ্লাদচরিত্র, দক্ষযজ্ঞ, বামনভিক্ষা প্রভৃতি শ্রীমদ্ভাগবতের অংশ সকল ব্যাখ্যা করিতে লাগিলেন। ইহাই কথকতার প্রথম সৃষ্টি।৭
