রূপান্তর
যে সব মহিলাদের সঙ্গে দেখা করেছি, তাঁদের বেশির ভাগই নিজেদের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলতে চাননি। দেশভাগের ঘটনা নিয়ে একেবারেই কোনও কথা বের করা যায়নি, এমন নয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেটা নিরপেক্ষ দর্শকের জবানিতে। অনেক সময় সংঘাতের কোনও বিশেষ মুহূর্তের খুব খুঁটিনাটি বর্ণনা পাওয়া গেছে। যেমন:
‘দুপাট্টাটা টেনে নেওয়ার সময়টুকুও পাইনি। যেমন ছিলাম সেভাবেই পালাতে হল।’
‘রুটিটা সবে তাওয়ায় চাপিয়েছি এমন সময় গোলমালের আওয়াজ পেলাম।
পালালাম। রুটিটা উনুনের ওপরেই পড়ে রইল।’
‘খালি পায়েই দৌড়লাম।’
‘বাচ্চাকে দুধ খাওয়াচ্ছিলাম। জামার বোতামগুলো লাগাবার পর্যন্ত সময় পেলাম না।’
এই যে পরিচিত দৈনন্দিন জীবনের ধারাবাহিকতা হঠাৎ বিপর্যস্ত হয়ে যাওয়া, এটাও মহিলাদের কথনভঙ্গির একটা বৈশিষ্ট্য। মেয়েদের গল্পে মৃত্যুর বর্ণনাও সাধারণত এইভাবেই উপস্থাপিত হয়। কোনও নিকট আত্মীয়ের মারা যাওয়ার কথা বলতে গেলে মেয়েরা প্রায়শই এরকম ছোটখাটো ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তাঁদের শোক বোঝাতে চায়। যেখানে আগের পরিচিত জগৎটাই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে, তার সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলো নতুন পরিস্থিতিতে আর মনে আনা সমীচীন নয়, সেখানে একমাত্র মৃত্যুর উপমার আড়ালেই সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ সম্ভব হয়ে উঠেছে।
দ্বিতীয় লক্ষণীয় বিষয়: দেশভাগের পর পুরনো আর নতুন জগতের সীমানা যে চিরস্থায়ী, এই সত্য আবিষ্কারের বিস্ময়। মহিলাদের কথায় তাদের সে-সময়কার মনোভাবটা বারে বারে বেরিয়ে আসে। তাঁরা ধরে নিয়েছিলেন, পলায়নটা সাময়িক, একটা আকস্মিক বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায়মাত্র। মহামারি, যুদ্ধবিগ্রহ, দুর্ভিক্ষ—এসব সময় বাঁচার জন্য সাময়িকভাবে পালাতে হয়, এ তো সবাই জানে। বিপদ কেটে গেলে আবার লোকে ঘরে ফিরে যায়। ‘হিন্দুরা কতরকম রাজত্বে বাস করেছে। আমরা তো আর ক্ষমতা চাইনি। ব্রিটিশদের সঙ্গে যেমন মানিয়ে চলেছি সেরকম মুসলমানদের সঙ্গেও মানিয়ে চলতাম। যারা রাজত্ব করবে তারা আমাদের ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করতে চাইবে কেন?’ রাষ্ট্রের যে নির্দিষ্ট এবং চিরস্থায়ী সীমানা থাকে, বহু মহিলাই এই প্রথম এটা শিখলেন। ব্রিটিশ আমলেও ব্রিটিশশাসিত অঞ্চল আর দেশীয় রাজ্যগুলির মধ্যে যাতায়াতের বাধা ছিল না। ‘কাপুরথালায় বা পাটিয়ালার লোকেদের সঙ্গে লাহোর বা অমৃতসরের লোকেদের স্বচ্ছন্দে বিয়ে-থা হত।’ এঁদের মনে রাষ্ট্রের সীমানা ছিল সহজভেদ্য, সামাজিক সম্পর্ক অনায়াসেই রাজনৈতিক সীমারেখা অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়তে পারত। বিপদে পড়লে সীমানা পেরিয়ে ওপারে যেতে হবে, বিপদ কাটলে আবার এপারে ফিরে আসব, এটাই ছিল প্রত্যাশিত। নতুন দুই সার্বভৌম রাষ্ট্রের সীমানা যে একেবারেই দুর্ভেদ্য, একবার পার হলে আর ফিরে আসার কোনও উপায় নেই, এই নির্মম সত্যটি হৃদয়ঙ্গম করার প্রস্তুতি এঁদের অভিজ্ঞতায় ছিল না।
শরীরের ভাষা
উর্দু লেখক সাদাত হাসান মান্টোর ‘ফুন্দানে’ নামে একটি গল্প আছে। তাতে মেয়েদের দুটো করে শরীর—একটা জন্মগত স্বাভাবিক শরীর, অন্যটা যাতে হিংসার ফল লালিত হয়। ‘মেয়েরা স্বামীর দোষ নিজেদের শরীরের মধ্যে লুকিয়ে রাখে’—পুরুষের অত্যাচার সম্বন্ধে যে নীরবতা, মেয়েরা এভাবেই তার ব্যাখ্যা দেয়। দেশভাগকে কেন্দ্র করে মেয়েদের ওপর যে আক্রমণ, তা শুধু শত্রু পক্ষের পুরুষদের দিক থেকেই আসেনি। তার চেয়েও মর্মান্তিক তাদের আত্মীয় পুরুষদের প্রতারণা। এই প্রতারণার কথা তারা মুখে বলে না, এ-কথা আগেই বলেছি। কিন্তু মুখের ভাষা নীরব থাকলেও শরীর তার নিজের ভাষায় এই যন্ত্রণা প্রকাশ করে ফেলে।
একজন মহিলা যেমন দাবি করলেন যে পালাবার সময় তাঁর শরীরে এমন একটা আঘাত লাগে যেটা কখনোই আর সারেনি। এমনিতে নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি আমায় প্রায় কিছুই বলতে চাইলেন না, কিন্তু এই আঘাতের কথাটা খুব বিস্তারিতভাবে বললেন। একের পর এক বৈদ্য আর ডাক্তার দেখিয়েছিলেন তিনি। কেউই কিছু করতে পারেনি। মাঝে মাঝে ব্যাথাটা থাকত না, অন্য সময় অসহ্য ব্যথা হত। তাঁর পুত্রবধূরা অবশ্য এই আঘাতের ব্যাপারটা মোটেই বিশ্বাস করতেন না, বলতেন ওটা তাঁর ছেলেদের তাঁবে রাখার কৌশল। আমার কিন্তু মনে হয়েছিল যে, এই আঘাতের গল্পটা আসলে গভীর কোনও যন্ত্রণার প্রকাশ, যা খোলাখুলি বলা যায় না। তাই শরীরের ভাষায় বলতে হয়।
কান্তার গল্পটা আরও নাটকীয়। কান্তা একজন প্রৌঢ়া। মাঝে মাঝেই তাঁর ফিট্ হত। হঠাৎ শরীরটা শক্ত হয়ে আসত আর তিনি মূর্চ্ছা যেতেন। তাঁর স্বামীর একটু মাথার দোষ ছিল। লাহোরের যৌথ পরিবারে থাকার সময় তাতে খুব একটা অসুবিধা হয়নি। স্বামীরা তিন ভাই। তাদের স্ত্রী-সন্তান, তার ওপর শ্বশুর-শাশুড়ি, সব মিলিয়ে কান্তার শ্বশুরবাড়ির অবস্থা বেশ সচ্ছলই ছিল। দেশভাগের দাঙ্গায় এক ভাই মারা যান। বাকিরা অমৃতসরে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়। কিন্তু আর্থিক অবস্থা হয়ে পড়ে সঙ্গিন। মানসিক রোগগ্রস্ত স্বামীকে নিয়ে কান্তা চলে আসতে বাধ্য হলেন দিল্লির এক বস্তিতে। এক দোকানদারের জন্য সেলাইয়ের কাজ করে কান্তার সংসার চলত। স্বামী জি. পি. ও.-র সিঁড়িতে বসে অন্যের চিঠিপত্র লিখে দিয়ে দিনে পাঁচ-দশ টাকা রোজগার করতেন। আত্মীয়েরাও মাঝে-মধ্যে অল্পস্বল্প সাহায্য করত। কারও মৃত্যু ঘটলেই কিন্তু কান্তার ফিটের অসুখ দেখা দিত। শুধু আত্মীয়স্বজন বা বন্ধু-বান্ধবদের মৃত্যুতেই নয়, পাড়ার যে-কেউ মারা গেলেই দেখা যেত, কান্তা উদভ্রান্তের মতো কাঁদতে কাঁদতে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছেন। তার পরেই ফিট্। পাড়া-পড়শির মৃত্যুতে মেয়েদের সমবেত বিলাপ অবশ্য সম্পূর্ণ প্রথাগত। তাই সেদিক দিয়ে দেখলে কান্তার আচরণ এমন কিছু অদ্ভুত নয়। কিন্তু অন্য মহিলারা কান্তার এই কান্নাকাটির ব্যাপারটাকে বাড়াবাড়ি বলেই মনে করতেন। বলতেন, নিজে এত কষ্ট পেয়েছে বলেই সে ওরকম করে।
