স্বপ্ন দেখে ভয় পেয়ে মনজিত যা বললেন তার একটা অংশ হল দূর থেকে জ্বলারু দৃশ্য দেখা, অন্যটা হল ঘরের ভেতরকার আতঙ্ক। দাদা ঘরে থেকে বোনকে রক্ষা করার দায়িত্ব নেয়নি। বাইরে গিয়ে লুঠ করা, আগুন দেওয়া, ধর্ষণ করা, এটাই তার কাছে অনেক বেশি পুরুষোচিত মনে হয়েছিল। দাদা যে ঠিক কি করত, আমরা জানি না। মনজিতের কথা থেকে এটুকুই স্পষ্ট যে পুরুষসমাজের অংশ হয়ে সে ওইসব কাজে অন্তত উপস্থিত থাকত। বোনের হাতে বিষের পুরিয়া ধরিয়ে দিয়ে পাড়ার ছেলেরা জানিয়ে দিল, তাদের বোনেরা যেন শত্রুর হাতে গিয়ে না পড়ে। আপাতদৃষ্টিতে মনজিতের আতঙ্কের কারণ তার নিজের মনোবল নিয়ে একটা সন্দেহ—সে যদি এই মারাত্মক দায়িত্বটা পালন করতে না পারে? একটু গভীরে দেখলে, আমার ধারণা, আতঙ্কের সূত্রটা যে অন্য জায়গায় নিহিত রয়েছে, সেটা বোঝা যাবে। এই প্রথম বোধ হয় মনজিত বুঝতে পারল যে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটা মান-ইজ্জতের লড়াইয়ে তার শরীরটা শুধুমাত্র একটি চিহ্ন হয়ে গেছে। তাই তার শরীর নিয়ে দুপক্ষেরই এত মাথাব্যথা।’
একটা অন্য কাহিনী বিচার করলে মনজিতের ভয়টা হয়তো আর একটু ভাল করে বোঝা যাবে। মনজিত নিজেই আমায় বললেন অমৃতসরের এক লব্ধপ্রতিষ্ঠ মুসলিম পরিবারের কথা। তারা পাকিস্তানে যেতে পারেনি, কারণ বৃদ্ধ পিতা তখন অত্যন্ত অসুস্থ এবং তাঁর দুই মেয়ে বাবাকে এই অবস্থায় ফেলে রেখে যেতে রাজি হয়নি। মেয়েরা পর্দানশিন, তাই বাইরের সঙ্গে যা যোগাযোগ সবই হত তাদের ছোট ভাই-এর মাধ্যমে। একদিন বাবার অবস্থা খুব খারাপ হওয়ায় ভাই গেল ডাক্তার ডাকতে। ঠিক সেই সময় এক বিরাট জনতা তাদের বাড়ি ঘেরাও করল। ছেলেটিকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হল। মৃতপ্রায় বাবা আর দুই দিদি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল ছেলেটিকে তলোয়ার দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারা হচ্ছে। বাবা এ-দৃশ্য সহ্য করতে পারলেন না, ওই অবস্থাতেই মারা গেলেন।
গল্পের এখানেই শেষ নয়। সেই দাঙ্গাকারী জনতার সামনে এবার দুই বোনকে হাজির করা হল মুজরা নাচার জন্য। ‘মুসলমানেরা পরে বলে বেড়ায় যে মেয়ে দুটো তাদের জামার ভেতর ছুরি লুকিয়ে রেখেছিল। নাচতে নাচতে তারা দাঙ্গাবাজদের নেতাকে ছুরি মেরে হত্যা করে। তার পর নিজেরা আত্মহত্যা করে।’ এইটুকু বলে মনজিত নিজে থেকেই যোগ করলেন, ‘এটা অবশ্য একেবারেই বানানো গল্প হতে পারে। অধিকাংশ লোকই বিশ্বাস করে যে মুজরা নাচের পর মেয়ে দুটো অনেক পুরস্কার পায়। তার পর যারা ওদের ভাইকে মেরেছিল, তাদেরই রক্ষিতা হয়ে যায় ওরা।’
আমার সন্দেহ, এই গল্পটার মধ্যে লৌকিক ধারার অনেক উপাদানই মিশে গেছে। এর সত্যাসত্য বাস্তব ঘটনার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে না, কারণ এর অর্থ বহুলাংশেই মনস্তাত্ত্বিক। সত্যটা লুকিয়ে আছে নারীত্বের সেই সংকটময় অবস্থায় যেখানে দুটিই মাত্র বিকল্প—হয় কোনওমতে প্রাণরক্ষা করে বেঁচে থাকা, না-হয় পুরুষ-সমাজের নির্ধারিত মান-ইজ্জতের নিয়ম মেনে নিয়ে মৃত্যু বরণ করা। মনজিতের নিজের অভিজ্ঞতার কাহিনী বা অন্যের মুখে শোনা এই গল্প, দুই-এর মধ্যেই এটা লক্ষ করা যাবে। দুটো গল্পেই দেখছি ভেতর আর বাইরের সীমানা ভয়ানকভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে, ভদ্র পর্দানশিন মহিলা রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে মুজরাওয়ালিতে, নারীর শরীর নিয়ে বিবদমান পুরুষদের মধ্যে ঘটছে সংঘাত। দেশান্তরী মহিলাদের ফেলে-আসা সত্য লুকিয়ে আছে এইসব ঘটনার মধ্যে। এবার দেখা যাক পুরনো জগতের এই স্মৃতি অভিবাসীদের নতুন পরিবেশে কেমনভাবে বদলে যায়।
নীরবতা
আগে বলেছি, মনজিতকে উদ্ধার করে ভারতে নিয়ে আসে স্বেচ্ছাসেবকেরা। পরে মনজিত আর তার দাদা মামার বাড়িতে এসে থাকে। মামা তাঁর দায়িত্ব সম্বন্ধে সচেতন ছিলেন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তিনি মনজিতের বিয়ের চেষ্টা করতে লাগলেন। এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের সঙ্গে মনজিতের বিয়ে হয়। কুলমর্যাদায় শ্বশুরবাড়ি কিছুটা খাটো ছিল। বিয়েতেও বিশেষ ঘটা হয়নি। ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মনজিত বললেন, এটাই স্বাভাবিক। দেশভাগের ওইসব সাংঘাতিক ঘটনায় মেয়ের কুমারীত্ব নষ্ট হয়নি, তা নিয়ে কেউই নিঃসন্দেহ হতে পারত না। তাই নিচু ঘরে বিয়ে দেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।
আমার খুড়তুতো বোনকে মুসলমানেরা ধরে নিয়ে যায়। শুনেছি সে মুসলমান হয়ে গেছে। ভালই করেছে। এখানে এলে কেউ কি বিশ্বাস করত যে তার কুমারীত্ব নষ্ট হয়নি।
খুড়তুতো বোনের গল্পটা হয়তো অজুহাত। আসলে মনজিত বোধ হয় নিজের কথাই বলতে চাইছিলেন। আমায় অনেকবার বলেছেন, নতুন জায়গায় এলে অনেক ব্যাপারে নীরব থাকাটাই শ্রেয়। ‘ভাল বিয়ে হলে মেয়েদের খুব সতর্ক থাকতে হয়। অসাবধানী কথায় সবকিছু ওলটপালট হয়ে যেতে পারে।’ জগৎকে এই দুভাগে ভাগ করা—এক যেখানে কথা বলা যায়, আর-এক যেখানে কথা বলা নিষেধ—এটা শুধু মনজিতের ব্যক্তিগত ব্যাপার নয়। সাধারণভাবেই হিন্দু পরিবারে মেয়েরা বহু কথা লুকিয়ে রাখতে শেখে। বাপের বাড়িতে যে কথা প্রাণ খুলে বলা যায়, শ্বশুরবাড়িতে এসে তা খুব সাবধানে লুকিয়ে রাখতে হয়, এ প্রায় প্রত্যেক মহিলারই জীবনের অভিজ্ঞতা। মনজিতের বেলায় কিন্তু এই চিরাচরিত প্রথার কিছুটা ব্যতিক্রম ঘটেছে। কৈশোরের অভিজ্ঞতাকে নীরবতার আড়ালে ঢেকে রেখে, কার্যত সেটাকে যেন ভুলে যাওয়ার সুযোগ দিয়ে সমাজ তাঁকে আর পাঁচজন মহিলার মতোই জীবনযাপন করার রাস্তা খুলে দিয়েছিল। মনোবিজ্ঞানে যেমন বলে যে ভয়াবহ কোনও অভিজ্ঞতা ভাষায় বর্ণনা করতে পারলে ভয়টি কাটিয়ে ওঠা যায়, এক্ষেত্রে তা হয়নি। মনজিতের স্বামী অবশ্য মাঝে মাঝে মদ খেয়ে এসে তাঁকে বেশ্যা ইত্যাদি বলে গাল দিত। মনজিত নিজেই সে-কথা আমায় বলেছিলেন। কিন্তু মত্ত অবস্থায় এরকম উদ্ভট অপবাদ তো অনেকেই দেয়। মনজিতের আশপাশের মহিলারা এ-সব অপবাদে কান দিত না। ফলে যতই বিচ্ছিন্ন, যতই বিষময় হোক না কেন, এক ধরনের সহনীয় জীবনযাত্রা সম্ভব হয়ে উঠেছিল তাঁর পক্ষে। যে-সময়কার ঘটনা মনজিত মনে আনতে চাইতেন না, জোর করে তা নিয়ে কথা বলাতে গেলে তাঁর স্বামী, মামা, দাদা, প্রত্যেকেই বাধ্য হত একে অপরকে দোষী করতে। মান-ইজ্জতের ভয়ানক লড়াই বেধে যেত আবার। সন্তর্পণে তাই প্রত্যেকেই যেন একমত হয়ে গিয়েছিল, এ-নিয়ে আর বেশি ঘাঁটানোর দরকার নেই। মনজিতের জীবনের এই ঘটনা যে সবার ক্ষেত্রেই ঘটত তা নয়। অন্য মহিলাদের কথা জানি যাঁরা ধর্ষিতা হয়েছেন এই সন্দেহে আত্মীয়দের কাছ থেকে চরম দুর্ব্যবহার পেয়েছেন।
