প্রথম স্মৃতিচারণ
আমরা যখন লাহোর ছাড়তে বাধ্য হই তখন আমার বয়স তেরো। শহরে যে দাঙ্গা হচ্ছে, তা আমরা জানতাম। কিন্তু দাঙ্গা আগেও হয়েছে। মাঝে মাঝে হয়, তারপর সব আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। দাঙ্গার জন্য, কেউ কখনও দেশ ছেড়ে চলে যায়নি। কিন্তু ক্রমে দেখলাম, অবস্থা দুর্বিষহ হয়ে উঠল। রোজ সকালে দেখতাম শহরে আগুন জ্বলছে। রাস্তা দিয়ে রক্তের স্রোত বইছে, এদিক-ওদিক সাদা কফন। সকলেই চলে যেতে শুরু করল। আমরাও ভাবলাম,একা-একা পড়ে থাকা সম্ভব নয়। বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে হিন্দু-মুসলমান যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী একসঙ্গে বাস করেছে, তারা আর একত্রে থাকতে পারবে না। কয়েকজন প্রতিবেশীর সঙ্গে আমরাও ট্রাকে উঠলাম। মোটা টাকার বিনিময়ে ড্রাইভার কথা দিল অমৃতসর পর্যন্ত পৌঁছে দেবে। পথে ট্রাকটি আক্রান্ত হল। আমার আর কিছু মনে নেই। শেষ পর্যন্ত অমৃতসর পৌঁছলাম, এটুকুই শুধু মনে আছে। সম্প্রতি শিখ তীর্থযাত্রীদের একটি দলের সঙ্গে আমি লাহোর গিয়েছিলাম। গভীর দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, ওখানে হিন্দু মন্দির আর শিখ গুরদুয়ারার অবস্থা সঙ্গিন। গুরদুয়ারার উন্নতির জন্য ভারত সরকারের কিছু করা উচিত।
এই কাহিনী এবং কাহিনীকারের কণ্ঠস্বর সম্বন্ধে প্রথমেই লক্ষ করার বিষয়, এর আনুষ্ঠানিক প্রথাগত ঢঙ। নিজের অভিজ্ঞতার গল্প বলতে গিয়ে মনজিত হঠাৎ এই আনুষ্ঠানিক কথনের পেছনে লুকোতে চাইলেন কেন?
আমরা জানি, এই ধরনের কাহিনীতে স্থানকে কিভাবে ভাগ করা হচ্ছে, সেটা খুব তাৎপর্যপূর্ণ। নানাভাবে স্থান ভাগ করা যায়। একটা হল ভেতর আর বাইরের মধ্যে ভাগ। এই ভিতর ভাগ আর বাহির ভাগের মধ্যে আবার নানা মাত্রা সংযোজন করা যায়, তার প্রত্যেকটির এক-এক রকমের তাৎপর্য। গোটা কাহিনীটি আবার হয় ভেতরের দিকে নয় বাইরের দিকে নির্দিষ্ট থাকে—এটা নির্ভর করে কাহিনীকারের অবস্থানের ওপর। আমরা আরও জানি, অভিবাসীদের ক্ষেত্রে ভেতর আর বাইরের সম্পর্ক খুব জটিল হয়ে যায়। বাস্তবে যা অনেক দূরে, মনের দিক দিয়ে সেই জায়গাটাই হয়তো অত্যন্ত কাছের। আবার দেশান্তরী মানুষ বাস্তবে যে নতুন জগতে অবস্থিত, সেই জায়গাটাই হয়তো তার মনে হয় ভয়ানক দূরের। দেশান্তরের কারণ যেখানে হিংসা আর সংঘাত, ভেতর আর বাইরের জগতের সীমানাগুলো যেখানে জোর করে টানা হয়েছে, সেখানে যে ভিতর-বাহিরের সম্পর্ক আরও অনেক বেশি জটিল হয়ে যাবে, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। মনজিতের কাহিনী থেকে এটাই দেখাতে চাই।
গল্প বলতে গিয়ে মনজিত যে নিতান্তই আনুষ্ঠানিক একটা ঢঙ বেছে নিলেন, আমার ধারণা এইভাবে তিনি আমায় বোঝাতে চাইছিলেন যে, স্মৃতি অত্যন্ত বিপজ্জনক। নৃতত্ত্ববিদ হিসেবে আমি যখন মনজিতকে বলি, ‘আপনার অভিজ্ঞতার কথা মনে করে বলুন’, তাঁর মনের ওপর এর ফলে যে প্রতিক্রিয়া হতে পারে তার জন্য তো আর আমি কোনও দায়িত্ব নিচ্ছিলাম না। এতে যে বিপদ আছে, সেটাই মনজিত আমায় মনে করিয়ে দিলেন। সেজেগুজে এলেন, হাতে লিখিত বক্তব্য, সেটা বক্তৃতা দেওয়ার ঢঙে পড়ে গেলেন। এতে করে তাঁর নিজের বক্তব্যের সঙ্গেই একটা দূরত্ব স্থাপন করে রাখলেন মনজিত। বোঝা গেল, এই প্রাথমিক বক্তব্যটা একবার বলা হয়ে গেলে তারপর অন্য কথায় যাওয়া যাবে।
সুতরাং রাজনৈতিক সংঘাত আর দেশান্তরের ফলে যে স্থানটি বাস্তবে দূরের, মনের দিক দিয়ে তা কাছের হলেও সেটা বর্ণনা করার সময় মনজিত নিজেকে তার থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাইছিলেন। দেশভাগের ঘটনা নিয়ে যে কথাসাহিত্য, সেখানেও দেখেছি যে গল্পের লেখক একটা নৈর্ব্যক্তিক ভাষ্যকারের ভূমিকা নিয়ে ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছেন। এ-সব গল্পের ক্রিয়ার কাল সব সময় অতীতে, ঘটনার স্থান নৈর্ব্যক্তিক, যেমন হাসপাতাল কিংবা হোটেল। একমাত্র নৈর্ব্যক্তিক ভাষ্যকারই যেন এ-সব ঘটনার যথাযথ বর্ণনা দিতে পারে। একান্ত নিজস্ব অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে মনজিতও দেখলাম একই ভঙ্গি অবলম্বন করলেন।
একটা কথা অবশ্য বলা দরকার। যে স্থানটি এক সময় মনজিতের নিজের দেশ ছিল, এখন বিদেশ হয়ে গেছে, তার ওপরেও কিন্তু তিনি একটা দাবি জানিয়ে রাখতে চাইছিলেন। তাই বললেন, গুরদুয়ারাগুলোর সংরক্ষণের জন্য ভারত সরকারের কিছু করা উচিত। অন্য অনেক জায়গায় দেখা গেছে, অভিবাসীরা তাদের ফেলে-আসা জগতের মূল্যবোধ দিয়েই নতুন পরিবেশকে অর্থবহ করে তুলতে চায়। মনজিতের কাহিনীতে এর আরও দৃষ্টান্ত পরে দেখব। এখানে শুধু লক্ষ করা দরকার যে, পুরনো জগৎটা থেকে চিরতরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও তার ওপর একটা দাবি কিন্তু থেকেই যাচ্ছে, যে দাবি পূরণ করার প্রায় কোনওই সম্ভাবনা নেই।
দ্বিতীয় স্মৃতিচারণ
মনজিত আরও একবার আমায় তাঁর অভিজ্ঞতার গল্প বলেন। এবার নিজের উদ্যোগেই। প্রথম সাক্ষাৎকারের প্রায় এক মাস পর আমি ওঁদের পাড়ায় গিয়েছিলাম। খবর পেয়ে মনজিত এসে আমায় বললেন:
কাল রাতে একটা বিশ্রী স্বপ্ন দেখেছি। দেখলাম আমি লাহোরে ফিরে গেছি। চারদিকে আগুনের গন্ধ। আমি ছুটে ছাদে চলে গেলাম আগুন আর ধোঁয়া দেখব বলে। লাহোরে থাকতে আমি ওইরকম ছাদে গিয়ে আগুন দেখতাম।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘স্বপ্নের মধ্যে আপনি সব চেয়ে বেশি ভয় পেলেন কিসে?’ তিনি বললেন, ওই সময় লাহোরে ওঁর দাদা রোজ রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে বেরিয়ে যেতেন। একদিন সকালে বেরোবার সময় মনজিতের হাতে একটা ছোট্ট পুরিয়া ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘সঙ্গে রাখ। গুণ্ডারা এলে সঙ্গে সঙ্গে খেয়ে ফেলবি। খবরদার, ওদের হাতে পড়িস না।’ মনজিত পাশের বাড়ির এক বান্ধবীকে কথাটা বলেছিলেন। ‘আমাদের সাহস ছিল না দাদাকে জিজ্ঞেস করি পুরিয়াতে কি আছে। আমরা দুজনেই শালোয়ারের দড়ির সঙ্গে পুরিয়াটা বেঁধে রাখতাম। আসলে জানতাম, ওটা নিশ্চয়ই বিষ। দরকার হলে সাহস করে খেতে পারব কিনা, তাই নিয়ে আমাদের আতঙ্কের সীমা ছিল না।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ওঁর দাদা কোথায় যেত সেটা তিনি জানতেন কি না। মনজিত বললেন, ‘নিশ্চয় অন্যদের মতো লুঠপাট করতেই যেত। যখন ফিরে আসত, দেখতাম চোখে কেমন একটা অদ্ভুত দৃষ্টি।’ এর বেশি আর কিছু জানতে পারলাম না।
