এই সমস্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও পূর্বের আলোচনার ভিত্তিতে আমার বক্তব্য একটাই। ঔপনিবেশিক ভারতে যে ‘সামাজিক শরীর’ রাষ্ট্র এবং জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের দ্বারা ‘কুসংস্কারপ্রসূত’ বলে চিহ্নিত হচ্ছিল, তার বিরুদ্ধে লড়াই করার ও তার পরিবর্তে বুর্জোয়া শরীরবোধকে সম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ ঔপনিবেশিক ভারতে ছিল না। প্রথমত ‘সামাজিক’ জীবনে রাষ্ট্রের অনুপ্রবেশ-নীতি ছিল মিনিমালিস্ট—পরার্থে নয়, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের নিজস্ব স্বার্থচেতনাই ছিল এর সঙ্গে জড়িত।
অপরপক্ষে জাতীয়তাবাদী চিন্তায় ছিল স্ববিরোধ। ‘আধুনিকতা’র লাগামহীন সাধনাকে মনে হত ‘ইংরেজিয়ানা’র নামান্তর। ইংরেজ শাসনের অপমান যতদিন ছিল, ‘ইংরেজিয়ানা’ ছিল আত্ম-অবমাননার সামিল। সব কিছুতে একটা ‘ভারতীয়’ ভাব বজায় রাখতে পারলে তবেই আত্মসম্মান বাঁচত। ‘পশ্চিমের আমরা অন্ধ অনুকরণ করি না’—এই কথাটা সোচ্চারে ঘোষণা করতে হত নিজেদের কাছে। ‘ভারতীয়ত্ব’ খোঁজার পথ কিন্তু হাজির করত এক ধরনের ‘হিন্দুত্বের দরবারে। ফলে মনের একটা দিক যাকে ‘কুসংস্কার’ বলে খারিজ করেছে, মনের আরেক দিকের প্রয়োজন ছিল তাকেই সাজিয়ে গুছিয়ে, কিছু সংস্কার করে ‘আধুনিকতা’র কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার। আর এ-কথাও মনে রাখা দরকার যে, ইংরেজ-বিরোধী মনোভাবের জন্মের উর্বরক্ষেত্র ছিল তথাকথিত পিছিয়ে পড়া, রক্ষণশীল মতাদর্শগুলোই। এক অর্থে জাতীয়তাবাদী চিন্তাও এই সব জীবনদর্শনের কাছে গভীরভাবে ঋণী।
ফলকথা, ‘আধুনিকতা’, ‘প্রগতি’, ‘উন্নতি’র (অর্থাৎ, বর্তমানে যা ভারতবর্ষে ধনতান্ত্রিক বিকাশের রূপ নিয়েছে) সর্বাঙ্গীণ প্রয়াসের মানসিক ও সামাজিক ক্ষেত্র তৈরি হবার একটি পূর্বশর্ত ছিল। তা হল এলিটের পক্ষে ইংরেজের হাত থেকে রাষ্ট্রযন্ত্রটিকে ছিনিয়ে নেওয়া। একবার ইংরেজ সরাসরি প্রভুত্ব থেকে হটে গেলে তো আর ‘ইংরেজিয়ানা’য় কোনও অপমান নেই—কারণ ওটা আর তখন ‘নকল-নবিশী’ নয়, ওটা বিশুদ্ধ ‘প্রগতি’। ‘ভারতীয়ত্বের’ প্রশ্নটি তাই আর স্বাধীন ভারতবর্ষের শাসকশ্রেণীর কাছে অত জরুরি নয়। তাছাড়াও ধনতান্ত্রিক বিকাশে ও সেই সূত্রে ‘আধুনিকতা’র শর্তপালনে এই রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘উন্নতি’র জন্য প্রয়োজন যে জনসংখ্যার ম্যানেজমেন্ট, তা-ও তো রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব। তাই ‘স্বাস্থ্য’, ‘শরীর’ ইত্যাদি প্রশ্নে স্বাধীন রাষ্ট্র আর ঔপনিবেশিক সরকারের মতো মিনিমালিস্ট নীতি চলে না। আজ সুদূর গ্রামাঞ্চলেও স্বাস্থ্য-কেন্দ্র, পরিবার পরিকল্পনা-কেন্দ্র, স্বাস্থ্যকর্মীদের দৌলতে কৃষকের চেতনায় আধুনিক শারীরবিদ্যা পৌঁছে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। এই শরীরভাবনাকে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে।
অর্থাৎ ‘সামাজিক’ শরীরকে বদলে বুর্জোয়া ‘শরীর’ করার যে ঐতিহাসিক যজ্ঞ, আধুনিক রাষ্ট্রই তার প্রধান হোতা ও ‘আধুনিকতা’র মতাশ্রয়ী শিক্ষিত মানুষেরা তার পুরোহিতশ্রেণী। এর মানে এই নয় যে, ‘সমাজ’-এর যুথবদ্ধতার মতাদর্শ সম্পূর্ণ হটে যাবে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা এবং ‘ফর্ম’-এর সঙ্গে নানান ঐতিহাসিক সমঝোতায় আসবে সে। এ-প্রসঙ্গের বিশদ আলোচনার অবকাশ বর্তমান প্রবন্ধে নেই। তবে আধুনিক রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য পরিষ্কার—‘সমাজ’কে পোষ মানাননা, এবং ‘শরীর’-এর প্রশ্নটিকে ‘সামাজিক’ রাজনীতি বা রাষ্ট্রবিরোধী চিন্তার বাইরে নিয়ে আসা। এ-লড়াই এখনও চলছে। অবশ্য তৃতীয় দুনিয়ায় রাষ্ট্রের নানান গাঁটছড়া বাঁধা থাকে সামন্তশক্তির সঙ্গে, যা স্বভাবতই তার ‘আধুনিকীকরণে’র ক্ষমতাকে অনেকটা দুর্বল করে দেয়। আমাদের পরিবার পরিকল্পনা প্রোগ্রামের ব্যর্থতার দিকগুলিতে ‘শরীর’ নিয়ে এই লড়াইতে রাষ্ট্রের বহুলাংশিক পরাজয়ের ইতিহাস লেখা আছে।
উপসংহার
‘সমাজ’ বস্তুটিকে কোনও রোমান্টিক দৃষ্টিতে উপস্থাপিত করা এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। ‘সমাজ’-এরও নিপীড়ন ক্ষমতা আছে, যদিও তার পদ্ধতি রাষ্ট্রের নিপীড়নপদ্ধতি থেকে আলাদা। স্মর্তব্য এ-ও যে, এই ‘সামাজিক’ শরীরকে একভাবে ব্যবহার করেই সামন্ততান্ত্রিক শাসন গড়ে উঠেছে। ‘সামাজিক শরীর’-এর যাঁরা তাত্ত্বিক সেই পুরোহিত-জ্যোতিষী-কবিরাজ শ্ৰেণীও সামন্তপ্রভুদের পৃষ্ঠপোষকতায় লালিত। তাছাড়া মানুষের সভ্যতায় বিজ্ঞানের ও বৈজ্ঞানিক মনের দানও অনস্বীকার্য। আজ নিশ্চয়ই ঘড়ির কাঁটা পিছিয়ে কেউ বসন্ত-কলেরা-প্লেগ-ম্যালেরিয়ার মহামারিতে বেঘোরে মারা পড়তে চাইবেন না। সেটা কাম্যও নয়। তাই ‘সমাজ’কে পুজো করা আমার উদ্দেশ্য নয়।
আমার উদ্দেশ্য ‘স্বাস্থ্য’ ও ‘শরীর’-এর প্রশ্নকে ঘিরে আধুনিক রাষ্ট্র কীভাবে ও কী কারণে তার ক্ষমতার বিস্তার ও ব্যবহার করে, কী ধরনের বিরোধী-শক্তির মোকাবিলা তাকে করতে হয়—তা আলোচনা ও বোঝার চেষ্টা করা। বিজ্ঞানের শক্তি অস্বীকার করা আমার উদ্দেশ্য না হলেও, বিজ্ঞানকে চিরদিন রাষ্ট্রিক এবং/অথবা ধনতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বাহন হয়ে থাকতেই হবে, ইতিহাসের এমন কোনও অমোঘ নিয়ম আছে বলে আমার বিশ্বাস নেই। তা ছাড়া রাষ্ট্র ও ধনতন্ত্রের কবল থেকে বিজ্ঞানকে উদ্ধার না করতে পারলে প্রযুক্তির চেহারাটাও বদলাবে না।
