উনিশ শতকে ‘স্বাস্থ্য’, ‘পরিচ্ছন্ন পরিবেশ’ বা ‘চিকিৎসা-বিষয়ে বাংলাভাষায় প্রকাশিত যে-সব পুস্তক-পুস্তিকা দেখেছি, তাতেও জাতীয়বাদের শরীর-ভাবনায় স্ববিরোধী চরিত্র স্পষ্ট। এক দিকে পাশ্চাত্য চিকিৎসাবিদ্যার ‘স্যানিটেশন’ আন্দোলনের প্রভাবে নানাবিধ মত প্রকাশ পাচ্ছিল, যেমন:
‘শরীরকে সম্পূর্ণরূপে রোগশূন্য করার নাম স্বাস্থ্য।’৪৮
বা:
‘বাটী পরিষ্কার রাখার ভার গৃহস্থের উপর নির্ভর করে, এবং দেশ পরিষ্কারের ভার মিউনিসিপ্যালিটির উপর নির্ভর করে। যখন উভয়ে নিয়মিত যত্ন ও ব্যয় স্বীকার করিয়া নিজ নিজ সীমা পরিচ্ছন্ন রাখিতে পারে, তখন সে-দেশে অপরিচ্ছন্নতাহেতু অনেক রোগও উপস্থিত হইতে পারে না।৪৯
এই মনোভাবে ‘অসুখ’ ‘স্বাস্থ্য’ ইত্যাদি বিষয়ে প্রথাগত চিন্তা ‘কুসংস্কার’ হিসেবে প্রতিভাত হত। যেমন একটি পুস্তিকায় বলা হচ্ছে, যাঁরা মনে করেন
পুরাতন জ্বর, প্লীহা, পাত অর্থাৎ যকৃত, এ সমুদায়ের প্রাদুর্ভাব এক্ষণে যেরূপ দৃষ্ট হয়, পূর্বে সেইরূপ হইত না…কুইনাইনই এই সকল আপদের মূল’, তাঁরা ‘অশিক্ষিত কুসংস্কারাবিষ্ট ব্যক্তি।৫০
অথবা অন্য একটি পুস্তিকায় বলা হল:
কতক লোকে মনে করে অদৃষ্ট দোষে, বা দৈববশত পীড়া হইয়া থাকে, কাজেই নিরুপায়।…অদৃষ্ট বা দৈব টেব কিছু নাই। যখন পীড়া হইবে তখন জানিবে যে কোনো কারণবশত হইয়াছে।৫১
এই সমস্ত রচনায়—যৌক্তিকভাবেই—অনেক দেশাচারের সমালোচনা করা হত। সবটাই ‘জাতীয় উন্নতি’র কথা চিন্তা করে, সন্দেহ নেই। অথচ ‘ইংরাজ জাতির অনুকরণ’ অতিমাত্রিক না হয়, এ-ও ছিল এক দুশ্চিন্তা। ফলত অনেক রচনাতেই চেষ্টা চলেছে। পাশ্চাত্যের চিকিৎসাশাস্ত্রের সঙ্গে আয়ুর্বেদ মেলানোর।৫২
তবে জাতীয়তাবাদী চিন্তায় ইংরেজ-বিরোধিতার যে-দিক সেটা—স্বাস্থ্যের ও শরীরের প্রশ্নে—স্বভাবতই অনেক বেশি প্রকট হত যাঁদের আমাদের দেশের ‘ট্র্যাডিশনাল ইন্টেলিজেন্টসিয়া’ বলা যায় সেই হাকিম-বৈদ্য-জ্যোতিষীদের রচনায়।৫৩ এঁদের রচনায়ই বারবার ঘুরে ঘুরে এসেছে ‘দেশ কালে’র কথা, ইংরেজের অনুকরণশীলতার বিপদের কথা।৫৪ উনিশ শতকের জাতির ভগ্নস্বাস্থ্যের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে এঁরাই পাশ্চাত্য-শিক্ষার বিরোধিতা করেছেন, যে-শিক্ষার ‘দেশীয় আহার-বিহারের বিরুদ্ধে অনেক কথা উপদিষ্ট হইয়া থাকে।’ স্বাস্থ্যভঙ্গের বিচারে বলা হয়েছে ‘দেশীয় ভাব, দেশীয় রুচি, দেশীয় প্রকৃতি, দেশীয় আহার, দেশীয় বিহার হারাইয়াছি’, এমনকী ইংরেজ সভ্যতার জীবাণুনাশক যে ‘সাবান’ তার ব্যবহারের সম্বন্ধেও সাবধান করে বলা হয়েছে, যে ‘দেশের অর্থ ভিন্ন দেশে দিতেছি’ ও ‘সাবান তত পবিত্র পদার্থ নহে’।৫৫
প্লেগ-মহামারির যে-ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন এক বাঙালি জ্যোতিষী, তাতেও ধর্মচেতনা ও ইংরেজ-বিরোধিতা প্রবল। ‘ভারতবর্ষে মহামারী বা প্লেগ আসিবার কারণ’ সভ্যতা তথা আধুনিক সভ্যতার প্রভাব; বোম্বাই, করাচিতে এর আধিক্য, কারণ’ ‘সমুদ্র’ উপকূলে বৈদেশিক সংমিশ্রণাধিক্যদোষ বর্তমান’।৫৬ প্লেগের টীকা সঙ্গত কিনা’ এই আলোচনায় সরকারের সমালোচনা করে বলা হয়েছে:
টীকা হইলেও যখন সংক্রামক ব্যাধির সংক্রামতা নিবারণ সম্বন্ধে সন্দেহ আছে, বিষ প্রবেশ করাইয়াও যখন সময়, ঋতু, কাল, স্থান ও আত্মদোযহেতু বিষের স্রোত রোধ করা যায় না, তখন টীকা দিয়া নির্দোষ দেহে দোষ সংক্রামণ করা কোন প্রকারেই। যুক্তিসঙ্গত হইতে পারে না।…তোমার প্লেগ, কলেরা প্রভৃতি সংক্রামক ব্যাধির নিশ্চয়াত্মক ঔষধী এ পর্যন্ত ঠিক হইল না, অগ্রেই তুমি তাহার বীজ লইয়া মানবশরীরে বপন করিতে অগ্রসর হইয়াছ!৫৭
এই বিশ্লেষণে মহামারি ভারতবর্ষের ধার্মিক, সামাজিক ও নৈতিক অধঃপতনের লক্ষণমাত্র, আর এর মূলে বিদেশি শাসনব্যবস্থা:
ভারতবর্ষ এখন আর সেই পূর্বতন ঋষি নির্বাচিত ভারতবর্ষ নাই, ভারতবর্ষ এখন পাপ ও ক্লেদকণায় পরিপূর্ণ হইয়াছে।…বৈদেশিক সংমিশ্রণ দোষ, বেজাতীয় আচার নিয়মানুষ্ঠান, ব্যবহার পরিচ্ছেদের স্বতন্ত্রতা, আহারবিহারাদির অনুচিত ও অস্বাভাবিক সংঘটন, রাজপূজা ও দেশসেবার অভাব, স্বদেশানুকূল আচারনীতির ব্যাঘাত, সভ্যতার অতিচার, সভ্য ভব্যের স্বেচ্ছাচার, দরিদ্রতার প্রাণশোষক আতঙ্ক, আইনকানুনের খর প্রস্রবণের প্রখরভাব, জল বায়ু ও দেশ কাল পাতানুকূল ঔষধী ভাষা ও ক্রিয়াকলাপের পরিত্যজ্যতা, বৈদেশিক লবণ ও চিনির অতি প্রচলন, সাত্ত্বিক। নিরামিষাশী ফলমূলাহারী মনুষ্যের স্বল্পতা, গো-খাদক ও অপশুরভক্ষকজীবীর প্রাধান্য, বৈদেশিক অপ বা ভিন্নযোনিসংসর্গজনিত বর্ণসঙ্করাধিক্য, ভূগর্ভজাত বিষ-তৈল (কেরোসিন), বিষ-কাষ্ঠ (পাথুরিয়া কয়লা) ইত্যাদির অতি প্রচলন; এই সমস্ত বিষম…ক্রিয়া বা বস্তু হইতে ভারতবর্ষের মূল ধ্বংসপ্রায় হইয়াছে। এক্ষণে ভারতবাসী নামে জীবিত মাত্র, বংশে গৌরব মাত্র, স্থানে স্থিতিমাত্র, অস্থিকঙ্কালসদৃশ দণ্ডায়মান রহিয়াছে। কার্যে আর সে পুণ্যভূমি ভারতবর্ষ নাই—তাই শোক, দুঃখ, অসহনীয় মর্মবেদনা, মহামারী, প্লেগ বা ভুকম্পজনিত অকালমৃত্যুর আধিক্য, ভয় বিভীষিকায় চতুঃদিক আচ্ছন্ন, ভীষণ দুর্ভিক্ষ রাক্ষস তাড়নায় অন্নাভাবে জীর্ণ…।৫৮
এই ‘পাঠটির জাতীয়তাবাদ অনস্বীকার্য, যদিও এতে ব্যক্ত মনোভাব বহুলাংশে ‘আধুনিকতা’র পরিপন্থী। বরং জনসংস্কৃতির আলোচনায় আমরা সংক্রামক ব্যাধি সম্বন্ধে ধারণার নিদর্শন পেয়েছিলাম, এই মনোভাব তার কাছাকাছি (যদিও নিম্নবর্গের কল্পনায় বিমূর্ত ‘ভারত’ চেতনার এত স্পষ্ট অভিব্যক্তি না থাকাই স্বাভাবিক)।
