…
Home, Sweet Home! The Sweetest, Healthiest
Homes are those where Hudson’s Extract of SOAP
is in Daily Use.
পাঠক অনায়াসেই লক্ষ করে থাকবেন, কীভাবে ‘গৃহ’, ‘স্বাস্থ্য’ ও ‘জনস্বাস্থ্যে’র ধারণা—যার গোড়ায় রয়েছে জীবাণু তত্ত্ব—মিলেমিশে আছে একটি সাধারণ, নিত্যব্যবহার্য বস্তুর বর্ণনায় ও বিজ্ঞাপনে।
এই মনোভাব ভারতের মাটিতে প্রোথিত করার মতো ক্ষমতা বা ইচ্ছে কোনওটাই ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের ছিল না। একদিকে তার ছিল ভারতীয় শরীরবিষয়ে ছুতমার্গ (যার আলোচনা আগেই করেছি)। অন্যদিকে বিদ্রোহের ভয় ভারতীয় অনেক প্রথাকে ‘কুসংস্কার’ বলে চিহ্নিত করলেও, তাতে হস্তক্ষেপ নিতান্ত প্রয়োজন না হলে করতে চাইতেন না সরকার। প্লেগ-বিষয়ে প্রথমদিকে কড়াকড়ি চললেও, পরে অনেক নরম নীতি নেওয়া হয়েছিল দাঙ্গা এড়াবার জন্য। এর অনেক আগে ১৮৭০-এর দশকে প্রকাশিত টিকাদারদের প্রতি উপদেশ-এ দেখছি সরকারের সাবধানী ভাব। ওই পুস্তিকার ‘ব্যক্তিদিগের প্রতি ব্যবহার’-বিষয়ক পরিচ্ছেদে বলা হচ্ছে টিকাদারেরা যেন অত্যাচার না করেন বা অপ্রিয় কথা না বলেন, অন্যথায় ‘পর বৎসর সেই স্থানে টিকা দেওয়া কষ্টকর হইবে’। আরও বলা হচ্ছে:
জুর, উদরাময়, কাশী, কি হাম যাহার ইংরাজী টিকার সহিত কোন সম্বন্ধ নাই এরূপ প্রকার পীড়া উপস্থিত হইলে ইংরাজী টিকা দেওয়া প্রযুক্ত উহার উপপত্তি হয়ে নাই এই বিষয়টি ব্যক্তিগণকে বুঝাইয়া দিতে বিশেষ কষ্ট স্বীকার করিবে।৪২
আমরা আগেই দেখেছি—স্বাস্থ্যশিক্ষা বিষয়েও বস্তুত বিশেষ নজর দেননি ইংরেজ সরকার। গা বাঁচিয়ে চলাই ছিল তার নীতি। বলা যেতে পারে, সামাজিক যে বন্ধনের সঙ্গে আশ্লিষ্ট ছিল মড়ক-মহামারির ধারণা ও অভিজ্ঞতা, সেই বন্ধনগুলিকে প্রচণ্ড আঘাত করার মতো ক্ষমতা ছিল না ওই সরকারের। সাম্রাজ্যবাদের তা প্রয়োজনও ছিল না। ‘আধুনিকতা’র প্রয়োজনীয় সব আয়োজন ‘আমাদের’ মনের মতো করে করেননি, এ তো জাতীয়তাবাদের পুরনো অভিযোগ।
বরঞ্চ জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের ও মধ্যবিত্তশ্রেণীরই আকাঙ্ক্ষা ছিল যে দেশে ‘আধুনিক’ ও ‘স্বাস্থ্যসম্মত’ বিধিব্যবস্থা নেওয়া হোক ও সাধারণ মানুষের ‘কুসংস্কার’ দূর করার জন্য স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিষয়ক শিক্ষার ব্যাপক প্রচার হোক।৪৩ প্লেগের সময় তিলকের মারাঠা পত্রিকায় বলা হয়েছিল যে শিক্ষিত ভারতীয়ের কর্তব্যই হল গরিব মানুষের ‘ভুল’ ধারণা ও ‘কুসংস্কার’ দূর করতে চেষ্টা করা। মারাঠা আরও বলেছিল:
এটা সত্যি যে জনসাধারণ প্লেগকে দৈবপ্রেরিত মনে করেন ও আধুনিক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের উপায়গুলির কার্যকারিতা সম্বন্ধে তাঁদের খুব একটা বিশ্বাস নেই। কিন্তু জনগণ মূর্খ বলেই এটা ধরে নেওয়া উচিত হবে না যে শীর্ষস্থানীয় ও বিশেষত শিক্ষিত শ্রেণীর মানুষেরা আধুনিক স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতিগুলোর গুরুত্ব বোঝেন না।৪৪
আধুনিক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের ও চিকিৎসাবিদ্যার প্রচার চাইলেও, তিলকের চিন্তায় দ্বিধা ছিল। আর্নল্ড লিখেছেন তিলকের ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদ’ তাঁকে আয়ুর্বেদের পুনর্জাগরণের প্রতিও আকৃষ্ট করত ও মারাঠা-র পাতায় তিনি পাশ্চাত্য-চিকিৎসা-বিদ্যা ও আয়ুর্বেদের চিন্তাধারা দুটির একটি ‘সুচিন্তিত সংমিশ্রণ’কেই কাম্য বলে প্রচার করতেন।৪৫
এখানে কথাটা বলে নেওয়া প্রয়োজন। পাশ্চাত্য তথা আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রে যে বিমূর্ত ব্যক্তিশরীরের ভাবনা আছে তা যতদূর জানি আয়ুর্বেদে নেই। চরক-সংহিতা-য় ব্যক্তিবিশেষের শরীর তার জাত-কুলসাপেক্ষ। তাছাড়া মানুষের সমস্ত কার্যাবলীর গোড়ায় জীবনের একটি ছক ধরে নেওয়া হয়। সেই ছকের উৎস তিন প্রকার আকাঙ্ক্ষায়: (১) জীবনধারণের আকাঙ্ক্ষা, (২) অর্থ ও কামের আকাঙ্ক্ষা ও (৩) মোক্ষের আকাঙ্ক্ষা।৪৬ এখানে ব্রাহ্মণ্য সভ্যতার পুরুষার্থের কথা স্পষ্টতই মনে পড়বে। অর্থাৎ শরীর-চিন্তাকে ধরে আছে একটি সামাজিক, নৈতিক ও ধার্মিক ভাবনা। গীতায় ‘শরীর’ বিষয়ে যা কথা পাওয়া যায়, তাতে তো দেখা যায় ‘আহার’ও একটি নীতির তত্ত্বে ধরা আছে—শ্রীকৃষ্ণ বলছেন ত্রিগুণভেদে আহাৰ্য্যদ্রব্যের প্রকারভেদের কথা—সাত্ত্বিক, রাজসিক ও তামসিক আহার।৪৭ এই সব কথাগুলোই সরাসরি সমাজের নীচের তলার মানুষের চেতনায় এসেছে এমন দাবি করি না। কিন্তু আমাদের ইতিহাসে যে মার্গসংস্কৃতি ও জনসংস্কৃতির বহু আদানপ্রদান ঘটেছে, এ নিয়ে হয়তো তর্ক হবে না।
জাতীয়তাবাদী মধ্যবিত্তশ্রেণী ও তাদের নেতৃত্ব এই ধরনের ধার্মিক-সামাজিক-নৈতিক শরীর-দর্শনের সঙ্গে আধুনিক চিকিৎসা-শাস্ত্রের যে শরীর তার একটা ‘সমন্বয়’ ঘটাতে চেয়েছিলেন। এটা আমাদের জাতীয়তাবাদী চিন্তার স্ববিরোধী চরিত্রের একটি লক্ষণ (এমন আরও অনেক লক্ষণ আছে)। ইংরেজ যতদিন সরকারি প্রভুর জায়গায় ছিল, ততদিন এই স্ববিরোধ ছিল অবশ্যম্ভাবী। একদিকে যেমন ইংরেজ-আনীত ‘আধুনিকতা’, ‘দেশীয় উন্নতি’, ‘প্রগতি’ প্রভৃতির প্রতি আকৃষ্ট হতেন শিক্ষিতশ্রেণীর মানুষেরা, তেমনি অন্যদিকে ভয় ছিল যে এই সকল আইডিয়ার বল্গাহীন চর্চায় ‘ভারতীয়ত্ব’ই না লোপ পায়। আসলে ইংরেজ আমলে জাতীয়তাবাদী চিন্তায় ‘ভারতীয়ত্ব’ই ছিল আত্মসম্মানের জায়গা। আমরা পাশ্চাত্যভাবের ‘হনুকরণ’ (রাজশেখর বসুর ভাষায়) করি না। ভারতীয়ত্ব বজায় রেখে এক ধরনের ‘স্বীকরণ’ করি—জাতীয়তাবাদী মনোভাবের এইটেই ছিল ভঙ্গি। অথচ কোনটা ‘হনুকরণ’ আর কোনটা ‘স্বীকরণ’ এর তো কোনও সর্ববাদিসম্মত সংজ্ঞা ছিল না—হওয়া সম্ভবও ছিল না—ফলে তর্ক হত বিস্তর। উত্তর যাই হোক, ‘ভারতীয়ত্ব’-বিষয়ক প্রশ্নটা তোলাই ছিল জাতীয়তাবাদী মানসিকতার লক্ষণ।
