ভাবা যেতে পারে, এরকম স্বতন্ত্র ইতিহাস যদি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে লেখা হয়, তাহলে সামগ্রিকভাবে ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’-এর ভারকেন্দ্রটা আর্যাবর্তে কিংবা আরও নির্দিষ্টভাবে দিল্লির সিংহাসনে আর বেঁধে রাখা যাবে না। ইতিহাসের কেন্দ্রিকতার প্রশ্নটাই অনেক অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। বিষয়টা তখন আর ‘জাতীয়’ ইতিহাস আর ‘আঞ্চলিক’ ইতিহাসের ব্যাপার থাকবে না। কোনটা সমগ্র আর কোনটা অংশ, কে অবয়ব কে অবয়বী, এ-প্রশ্নও নতুন করে বিচার করতে হবে। তাই বলছিলাম, এই বিকল্প ইতিহাসের সামগ্রিকতা যদি কিছু থাকে, তবে তা রাষ্ট্রীয় নয়, যুক্তরাষ্ট্রীয়।
কিন্তু এই বিকল্প ইতিহাস রচনার জন্য প্রস্তুতি এখনও পর্যন্ত আমাদের নেই। ভারতের ইতিহাসের অখণ্ডতার ধারণাটাই যে আজ পর্যন্ত ভারতের অধিবাসীদের খণ্ডিত করে চলেছে, এই সত্যটা না বুঝতে পারলে বিকল্প ইতিহাস খোঁজার পথ প্রশস্ত হবে না।
টীকা
১ উনিশ শতকে বাঙালির ইতিহাসচিন্তা এবং সেই পটভূমিতে বঙ্কিমের ইতিহাস-বিষয়ক রচনার তাৎপর্য নিয়ে সম্প্রতি উল্লেখযোগ্য আলোচনা করেছেন Ranajit Guha, An Indian Historiography for India :A Nineteenth Century Agenda and its Implications (Calcutta, 1988)
২ ‘বিবিধ প্রবন্ধ দ্বিতীয় খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত বাংলার ইতিহাস সংক্রান্ত বঙ্কিমের প্রবন্ধগুলি সুপরিচিত। এখানে শুধু ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’ এবং ‘বাঙ্গালার ইতিহাস সম্বন্ধে কয়েকটি কথা’ প্রবন্ধ দুটি থেকে উদ্ধৃতি দিলাম। বঙ্কিম রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড (কলকাতা: সাহিত্য সংসদ, ১৯৫৪), পৃ. ৩৩০-৩, ৩৩৬-৪০।
৩ মৃত্যুঞ্জয় শর্মণঃ, রাজাবলি (শ্রীরামপুর, ১৮০৮)।
৪ অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাংলার সম্ভ্রান্ত পরিবারে প্রচলিত রাজবংশের তালিকা সম্বন্ধে রমেশচন্দ্র মজুমদারের একটি আলোচনা আছে। ‘সংস্কৃত রাজাবলী গ্রন্থ’, সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা, ৪৬, ৪ (১৩৪৬), পৃ. ২৩২-৯। গৌতম ভদ্র আমায় এই সূত্রটির খোঁজ দিয়েছেন।
৫ মুন্সী আলিমদ্দিন, দীল্লির রাজাদির নাম (বরিশাল, ১৮৭৫)।
৬ রামগতি ন্যায়রত্ন, বাঙ্গালার ইতিহাস, প্রথম ভাগ, ‘হিন্দু রাজাদিগের চরমাবস্থা অবধি নবাব আলীবর্দি খাঁর অধিকার কাল পর্যন্ত’ (হুগলি, ১৮৫৯)।
৭ রামসদয় ভট্টাচার্য, বাঙ্গালা ইতিহাসের প্রশ্নোত্তর (কলকাতা, ১৮৬৯)।
৮ ক্ষেত্ৰনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, শিশুপাঠ বাঙ্গালার ইতিহাস, বীর হাঙ্গাম হইতে লার্ড নর্থব্রুকের আগমন পর্য্যন্ত (কলকাতা, ১৮৭২)।
৯ কৃষ্ণচন্দ্র রায়, ভারতবর্ষের ইতিহাস, ইংরেজদিগের অধিকারকাল (কলকাতা, ১৮৭০; প্রথম প্রকাশ, ১৮৫৯)।
১০ ক্ষিরোদচন্দ্র রায়চৌধুরী, সমগ্র ভারতের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (কলকাতা, ১৮৭৬)।
১১ তাবাকৃষ্ণ হালদার, চমৎকার স্বপ্নদর্শন (কলকাতা, ১৮৬৮)।
১২ ভোলানাথ চক্রবর্তী, সেই একদিন আর এই একদিন, অর্থাৎ বঙ্গের পূর্ব ও বর্তমান অবস্থা (কলকাতা, ১৮৭৬)।
১৩ তারিণীচরণ চট্টোপাধ্যায়, ভারতবর্ষের ইতিহাস, প্রথম ভাগ (কলকাতা, ১৮৭৮; প্রথম প্রকাশ ১৮৫৮)।
১৪ এই প্রসঙ্গে দ্রষ্টব্য J.S. Girewal, Muslim Rule in India: The Assessments of British Historians (Calcutta, 1970)
১৫ একটি বই দেখেছি যা সম্পূর্ণভাবেই তারিণীচরণের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ—গোটা গোটা অনুচ্ছেদে হুবহু এক। জীবনকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়, ভারতবর্ষের পুরাবৃত্ত (কলকাতা, পঞ্চম সংস্করণ, ১৮৭৫; প্রথম প্রকাশ ১৮৬৮)।
১৬ ছৈয়দ আবদুল রহিম, ভারতবর্ষের ইতিহাসের প্রশ্নোত্তর (ঢাকা, ১৮৭০)।
১৭ শেখ আবদুর রহিম, হজরত মহম্মদের জীবন চবিত ও ধর্ম্মনীতি (কলকাতা, ১৮৮৬)।
১৮ এই প্রসঙ্গে দ্রষ্টব্য Rafiuddin Ahmed. The Bengal Muslims 1871-1906. A Quest for Identity (Delhi. 1981), p.93-7,
১৯ Guha. An Indian Historiography.p. 62-67
২০ ভূদেব রচনা সম্ভার, প্রমথনাথ বিশী সম্পাদিত, (কলকাতা, ১৯৬২), পৃ. ৩৪১-৭৪।
২১ বিবিধ প্রবন্ধ দ্বিতীয় খণ্ডের এই প্রবন্ধগুলো থেকে উদ্ধৃতি দিলাম এখানে ‘বঙ্গে ব্রাহ্মণাধিকার’, ‘বাঙ্গালার ইতিহাস,’ ‘বাঙ্গালার ইতিহাস সম্বন্ধে কয়েকটি কথা’, ‘বাঙ্গালীর উৎপত্তি’। বঙ্কিম রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ. ৩১৯-২৭, ৩৩০-৩, ৩৩৬-৪০, ৩৪১-৬৩।
২২ রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, প্রথম শিক্ষা বাঙ্গালার ইতিহাস (কলকাতা, ১৮৭৫), পৃ ৬১-২।
২৩ কৃষ্ণচন্দ্র রায়, ভারতবর্ষের ইতিহাস, ইংরাজদিগের অধিকাবকাল (কলকাতা, চতুর্দশ সংস্করণ, ১৮৭৫), পৃ. ২৪৫।
শরীর, সমাজ ও রাষ্ট্র : ঔপনিবেশিক ভারতে মহামারি ও জনসংস্কৃতি – দীপেশ চক্রবর্তী
সাম্প্রতিককালে ভারত-বিশেষজ্ঞ কয়েকজন মহামারি, মড়ক, বন্যা, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদির সামাজিক ইতিহাস রচনায় মন দিয়েছেন। বিষয়টির গুরুত্ব এঁদের রচনায় ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে। বর্তমান প্রবন্ধের অন্যতম উদ্দেশ্য এঁদের গবেষণালদ্ধ তথ্যসমূহের পুনর্বিবেচনা করা। আমার বৃহত্তর উদ্দেশ্য ভারতবর্ষে তথা সাধারণভাবে আধুনিক রাষ্ট্রের চরিত্র ও ক্ষমতার কয়েকটি দিক তুলে ধরা। এই চেষ্টার সপক্ষে দু-একটি কথা বলা প্রয়োজন মনে করি।
আধুনিক রাষ্ট্র যেভাবে অন্যান্য সামাজিক বন্ধনকে আত্মসাৎ, দমন বা শিথিল করে বা প্রয়োজনবোধে হটিয়ে দিয়ে—নাগরিকের ওপর নিজের দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করেও অগ্রাধিকার দেয়—ভারতীয় ইতিহাস রচনায় সে আলোচনা শুরু হয়নি বললেই চলে। ‘শান্তি বজায় রাখা’ বা ‘আইন-শৃঙ্খলা’ রক্ষা করা, ‘আর্থিক উন্নতি’ ও ‘জনস্বাস্থ্য’ রক্ষা করা রাষ্ট্রব্যবস্থার মুখ্য কর্তব্য বলে ধরা হয়। এগুলো যেমন রাষ্ট্রের কর্তব্য, তেমনি তার মতাদর্শগত হাতিয়ারও বটে। এই রাষ্ট্রিক মতাদর্শের একটি ভান থাকে—যা সংবাদপত্র থেকে ইস্কুলের পাঠ্যপুস্তক পর্যন্ত ছড়ানো—যেন রাষ্ট্রের স্বনির্বাচিত কর্তব্যগুলি ইতিহাস-বহির্ভূত কোনও ‘প্রাকৃতিক’ বিধানের অংশ, যেন রাষ্ট্রীয় উদ্দেশ্যের মূল মতাদর্শগত সূত্রগুলি (যেমন, প্রগতি, উন্নতি, স্বাস্থ্য) মানুষের স্বাভাবিক ও আদিমতম আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। যদি কোনও প্রতিষ্ঠান ও মানুষ মৌলিকভাবে ‘প্রগতি’, ‘উন্নতি’ ইত্যাদির মূলমন্ত্রের বিরোধিতা করে, তাঁদেরই বর্ণনা করা হবে ‘কুসংস্কারাচ্ছন্ন’ বা ‘মূর্খতার অন্ধকারে’ নিমজ্জিত বলে। পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে সম্প্রতি এমন কথাও পড়েছি যে রাষ্ট্রের অস্তিত্বের মৌলিক সমালোচনা হয় এমন ইতিহাস রচনা করা নাকি দেশদ্রোহিতারই নামান্তর।
