এ-প্রবন্ধের কেন্দ্রে আছে শরীর, সমাজ ও ব্যাধি। মহামারি বিষয়ক কতগুলো ধারণা ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলী। শরীরের সঙ্গে আধুনিক রাষ্ট্রের সম্পর্ক কী? একটু ভাবলেই বোঝা যাবে সম্পর্কটি জটিল ও গভীর। পরিবার-পরিকল্পনা থেকে শুরু করে মহামারি নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত সর্বত্রই দেখা যায় আমাদের এই তথাকথিত নিতান্ত ‘ব্যক্তিগত’ বস্তুটির সঙ্গে সরকারের সম্বন্ধের নজির। বুর্জোয়া সভ্যতা মানুষের শরীরকে যেভাবে ব্যবহার করে ও যে তাৎপর্য দেয়, তা প্রাক-ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় শরীরের যে অবস্থান থাকে তার থেকে আলাদা। ‘কৃষ, শরীর’, ‘আদিবাসী-শরীর’কে ভেঙে-চুরে, দুমড়ে-মুচড়ে, নতুন অভ্যাসের ফাঁদে ফেলে, নতুন রুটিনের ছাঁচে ঢেলে তবে তো তৈরি হয় শ্রমিকের শরীর, বিপণন সমাজের অসংখ্য ভোগ্যবস্তুর ক্রেতার শরীর, ফ্যাশন-ম্যাগাজিনের স্বাস্থ্য-পত্রিকার শরীর।
এই পরিবর্তন এক দিনে হয় না। পুরোপুরিও ঘটে না কোনও সময়। পরিবর্তনের পথটিও সর্বত্র মসৃণ নয়। স্থান-কালভেদে জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সরকারের সংঘর্য দেখা যায়। যেমন জরুরি অবস্থা চলাকালীন সাধারণ মানুষের ‘নাসবন্দি’-বিরোধিতা। এই অসম ও বন্ধুর পরিবর্তন-প্রক্রিয়ার ইতিহাসে রাষ্ট্রের হাতে ‘অস্ত্র’ থাকে নানা ধরনের—আইনব্যবস্থা, সেনাবাহিনী, আর্থনীতিক ব্যবস্থা। কিন্তু একটি বিরাট ‘অস্ত্র’ আধুনিক শারীরবিদ্যা ও চিকিৎসাবিজ্ঞান-ভিত্তিক ‘জনস্বাস্থ্য’ নীতি।
আমাদের দেশে উনিশ শতকের শেষ দিকে বোম্বাই ও অন্যান্য শহরে সরকারের প্লেগ-নীতির বিরুদ্ধে দাঙ্গা হয়, এ খবর অনেকেরই জানা আছে। এ ছাড়া বসন্ত, কলেরা ইত্যাদি মহামারি নিয়ন্ত্রণ-বিষয়ে অনেক সময়ই সরকার, জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব ও সাধারণ মানুষ যে একমত হননি এ-ও সুবিদিত। হাসপাতাল সম্বন্ধে সাধারণ মানুষের ভীতি, ‘সুঁই’ নিতে অনিচ্ছা, এ সব হয়তো আমাদের মধ্যবিত্ত অনেকেরই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অংশ। এ বিষয়ে কিছু কিছু ঐতিহাসিক তথ্য আমরা প্রবন্ধের পরবর্তী অংশগুলিতে আলোচনা করব। তা থেকেই বেরিয়ে আসবে শাসনের সঙ্গে শরীরের, রাষ্ট্রের সঙ্গে সমাজের দ্বন্দ্বমূলক সম্পর্কের ইতিহাস। আলোচনার বৃহত্তর পটভূমিতে আমরা আবার ফিরে আসব বর্তমান নিবন্ধের শেষে।
জনস্বাস্থ্য ও ভারতশাসন
জনস্বাস্থ্য, সংক্রামক ব্যাধি, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ইত্যাদি ‘আধুনিক’ ধারণা এদেশে আমদানি করে ইংরেজ। জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নটির সঙ্গে ঔপনিবেশিক ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় দেশশাসনের প্রশ্নটি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। সাম্রাজ্যবাদের গর্ভে যেমন নৃতত্ত্ববিদ্যার জন্ম ঘটে, চিকিৎসাশাস্ত্রেরও অনেক শাখাপ্রশাখা বিস্তৃত হয়েছে উপনিবেশের কাণ্ডটিকে বেষ্টন করে।
এর একটা ভাল উদাহরণ ‘ট্রপিক্যাল মেডিসিন’ বিষয়টি। ১৮৯০-এর দশকে এটি একটি স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। লন্ডন স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন স্থাপিত হয় ১৮৯৯ সালে। সেই বছরই প্রথম প্রকাশিত হয় জার্নাল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিন। একটি সাম্প্রতিক গবেষণাধর্মী প্রবন্ধে দেখতে পাই যে, যে-আলোচনা-বিতর্ক ইত্যাদির মধ্য দিয়ে এই বিষয়টির জন্ম, তার মূল ছিল একটি নিতান্তই সাম্রাজ্যবাদী ও রাজনীতিক প্রশ্নে: শ্বেতাঙ্গ প্রভুরা কি গ্রীষ্মপ্রধান দেশগুলিতে উপনিবেশ গড়তে পারবেন? অষ্টাদশ শতকের ইউরোপীয় চিকিৎসাবিদরা অনেক রোগের ব্যাখা দিতেন ‘মায়াস্মা’ বা ‘পূতিবাষ্প’র তত্ত্বের মাধ্যমে। ওয়রবয়স দেখাচ্ছেন যে, উনিশ শতকের প্রথমার্ধেও এই ধারণা খুব চালু ছিল—জে, লিন্ড রচিত ১৭৬৮ সালের বই এসে অন ডিসিসেস ইন্সিডেন্ট অফ ইউরোপিয়ানস ইন হট ক্লাইমেটস-এর ষষ্ঠ সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে গত শতাব্দীর গোড়ায়, ১৮০৮ সালে।১ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মেডিকাল সার্ভিস চালু হয় ১৭৬৪ সালে।২ ১৮১৯ সালেও তাদের ভারতগামী কর্মচারীদের ‘ডিসিসেস অফ হট ক্লাইমেটস’ বিষয় অধ্যয়ন করতে হত।৩ পৃতিবাষ্পের তত্ত্বে বিশ্বাসীরা বলতেন, গরম দেশগুলি স্বভাবতই শ্বেতাঙ্গ মানুষদের পক্ষে অস্বাস্থ্যকর, তাই সেখানে দীর্ঘস্থায়ী রাজত্ব বা উপনিবেশ চালানো মুশকিল। এই তত্ত্বের বিরোধী যে গবেষণা চলে চিকিৎসাবিদ্যায় তারই ফল ট্রপিক্যাল মেডিসিন। ১৮৬০-এর পর থেকে পাস্তুর প্রমুখের গবেষণায় প্রতিষ্ঠিত হয় জীবাণু তত্ত্ব। বিভিন্ন রোগের মূল বিভিন্ন জীবাণুতে, এবং এই জীবাণু সনাক্ত করা ও তদনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াটাই চিকিৎসাশাস্ত্রের মূল দায়িত্ব—এটাই ছিল এই তত্ত্বের মূলকথা। এর সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদের সম্পর্ক যে কত ঘনিষ্ঠ তা বোঝাতে গিয়ে এক উদ্ধৃতি দিয়েছেন ওয়রবয়স। উদ্ধৃতিটির উৎস ১৮৯৮ সালের ব্রিটিশ মেডিকাল জার্নাল, এবং উক্তিটি করেছিলেন প্যাট্রিক ম্যানসন যাঁকে ট্রপিক্যাল মেডিসিনের জনক বলে অনেক সময় ভাবা হয়। ম্যানসন বলেছিলেন:
আমি এখন এ বিষয়ে স্থিরনিশ্চিত যে, শ্বেতাঙ্গদের পক্ষে গ্রীষ্মপ্রধান দেশগুলিতে উপনিবেশ স্থাপনা করা সম্ভব। শুধু তাপ বা বাষ্পই যে গরম দেশে সমস্ত অসুখের উৎস, তা নয়। এইসব অসুখের শতকরা নিরানব্বই ভাগের কারণ হল বিভিন্ন ধরনের জীবাণু।…তাদের বিনাশ করা হল জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানের প্রয়োগের প্রশ্ন।৪
