১০
চতুর্থ একটি উত্তরও অবশ্য ছিল। সেটি এতই অস্পষ্ট এবং অসম্পূর্ণ যে তাকে উত্তর না বলে বলা উচিত উত্তরের সম্ভাবনা। তাতে ভারতের ইতিহাসের অখণ্ডতা সম্বন্ধে একটা সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। উৎপত্তির প্রশ্নটাও সেখানে অনিশ্চিত। এই ইতিহাসকে রাষ্ট্রীয় না বলে বলা যেতে পারে যুক্তরাষ্ট্রীয়।
বঙ্কিমের লেখাতেই এই আভাস রয়েছে।২১ ‘রাজা ভিন্ন-জাতীয় হইলেই রাজ্যকে পরাধীন বলিতে পারা যায় না। ‘বাংলার স্বাধীন সুলতানদের আমলকেই বঙ্কিম প্রকৃত রেনেসাঁসের যুগ মনে করতেন।
পরাধীনতার একটি প্রধান ফল ইতিহাসে এই শুনা যায় যে, পরাধীন জাতির মানসিক স্ফূৰ্ত্তি নিবিয়া যায়। পাঠানশাসনকালে বাঙ্গালীর মানসিক দীপ্তি অধিকতর উজ্জ্বল হইয়াছিল। …এই দুই শতাব্দীতে বাঙ্গালীর মানসিক জ্যোতিতে বাঙ্গালার যেরূপ মুখোজ্জল হইয়াছিল, সেরূপ তৎপূর্ব্বে বা তৎপরে আর কখনও হয় নাই। (পৃ. ৩৩২)
আমাদের এই Renaissance কোথা হইতে? কোথা হইতে সহসা এই জাতির এই মানসিক উদ্দীপ্তি হইল? …এ আলোক নিবিল কেন? (পৃ. ৩৩৯)
যে আকবর বাদশাহের আমরা শতমুখে প্রশংসা করিয়া থাকি, তিনিই বাঙ্গালার কাল। তিনিই প্রথম প্রকৃতপক্ষে বাঙ্গালাকে পরাধীন করেন। …মোগলই আমাদের শত্রু, পাঠান আমাদের মিত্র।’ (পৃ. ৩৩২)
ভারতের ইতিহাস আর বাংলার ইতিহাস, দুই ধারায় ঘোর অসংগতি এসে যাচ্ছে এখানে। রাষ্ট্র বা জাতির সার্বভৌম কেন্দ্র কোনটা, তাও আর স্থির থাকছে না। একদিকে দেখা যাচ্ছে, আর্যদের বাংলায় অনুপ্রবেশ অপেক্ষাকৃত দেরিতে। তা হলে আর্যসভ্যতার উত্তরাধিকারী হিসেবে বাঙালির দাবি কি দুর্বল হয়ে পড়ে?
অনেকেই মনে করিবেন যে, বাঙ্গালার ও বাঙ্গালীর বড় লাঘব হইল। আমরা আধুনিক বলিয়া বাঙ্গালীজাতির অগৌরব করা হইল; আমরা প্রাচীন জাতি বলিয়া আধুনিক ইংরেজদিগের সম্মুখে স্পর্দ্ধা করি—তা না হইলে আমরাও আধুনিক হইলাম। আমরা দেখিতেছি না যে, অগৌরব কিছু হইল। আমরা সেই প্রাচীন আর্যজাতিসম্ভূতই রহিলাম—বাঙ্গালায় যখন আসি না কেন, আমাদিগের পূর্ব্বপুরুষগণ সেই গৌরবান্বিত আৰ্য। বরং গৌরবের বৃদ্ধিই হইল। আর্যগণ বাঙ্গালায় তাদৃশ কিছু মহৎ কীৰ্ত্তি রাখিয়া যান নাই—আৰ্যকীৰ্ত্তিভূমি উত্তর পশ্চিমাঞ্চল। এখন দেখা যাইতেছে যে, আমরা সে কীৰ্ত্তি ও যশেরও উত্তরাধিকারী। সেই কীর্তিমন্ত পুরুষগণই আমাদিগের পূর্ব্বপুরুষ। দোবে, চোবে, পাঁড়ে, তেওয়ারীর মত আমরাও ভারতের আর্য্যগণের প্রাচীন যশের ভাগী বটে। (পৃ. ৩২৬)
কিন্তু অন্য দিকে প্রশ্ন উঠছে, বাঙালিদের মধ্যে আর্য কারা? জাতি হিসেবে বাঙালির উৎপত্তি কোথায়? সাতটি পরিচ্ছেদে বিভক্ত এক দীর্ঘ প্রবন্ধে বঙ্কিম ভাষাতত্ত্ব-নৃতত্ত্বের নানা আবিষ্কার জড়ো করে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছিলেন। সেইসব বৈজ্ঞানিক সাক্ষ্যের অধিকাংশই এখন মনে হবে সম্পূর্ণ আষাঢ়ে। এই প্রবন্ধটিও বঙ্কিমের অন্যান্য লেখার তুলনায় এখন প্রায় বিস্মৃতই বলা চলে। কিন্তু প্রবন্ধের সিদ্ধান্তটি অখণ্ড জাতীয় ইতিহাস লেখার পক্ষে খুব স্বস্তিজনক ছিল না।
ইংরেজ একজাতি, বাঙ্গালীরা বহুজাতি। বাস্তবিক এক্ষণে যাহাদিগকে আমরা বাঙ্গালী বলি, তাহাদিগের মধ্যে চারি প্রকার বাঙ্গালী পাই। এক আৰ্য, দ্বিতীয় অনাৰ্য্য হিন্দু, তৃতীয় আযানার্য হিন্দু, আর তিনের বার এক চতুর্থ জাতি বাঙ্গালী মুসলমান। চারি ভাগ পরস্পর হইতে পৃথক থাকে। বাঙ্গালীসমাজের নিম্নস্তরেই বাঙ্গালী অনাৰ্য বা মিশ্ৰিত আৰ্য্য ও বাঙ্গালী মুসলমান; উপরের স্তরে প্রায় কেবলই আৰ্য। এই জন্যে দূর হইতে দেখিতে বাঙ্গালীজাতি অমিশ্রিত আৰ্যজাতি বলিয়াই বোধ হয় এবং বাঙ্গালার ইতিহাস এক আৰ্য্যবংশীয় জাতির ইতিহাস বলিয়া লিখিতে হয়। (পৃ. ৩৬৩)
শুধু বঙ্কিমেই নয়, অন্য লেখকদের রচনাতেও এই সম্ভাব্য স্বতন্ত্র ইতিহাসের উপাদান খুঁজে পাওয়া যাবে। রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের যে বইটিকে বঙ্কিম ‘সুবর্ণের মুষ্টিভিক্ষা’ বলেছিলেন, তাতে দেখছি বলা হচ্ছে যে ভারতের অন্যত্র যা-ই ঘটে থাকুক, বাংলায় অন্তত বাহুবলের কারণে মুসলমান ধর্মের প্রসার ঘটেনি।২২ কৃষ্ণচন্দ্র রায় ইংরেজ আমলের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন যে মুসলমান সুলতান বা নবাবদের সময় বাংলায় ‘এদেশীয়দিগের উচ্চ রাজ কর্ম্ম প্রাপ্তির কোন বাধা ছিল না।’২৩ আর বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার ‘জাতীয়করণ’ প্রক্রিয়াটা আমরা আগেই লক্ষ করেছি।
কথা হলো, দুটি স্বতন্ত্র ‘জাতীয়’ ইতিহাস—একটি আৰ্য-সভ্যতা-উদ্ভূত, প্রধানত উত্তরভারত কেন্দ্রিক, ‘ভারতবর্ষীয়দিগের’ ইতিহাস, অন্যটি অনিশ্চিত সূত্র থেকে উদ্ভূত, ‘বহুজাতিক’ বাঙালির ইতিহাস—এই দুই ইতিহাসের ক্রমপর্যায়, গতিপথ, ছন্দের যে বৈসাদৃশ্য, তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের যে জটিলতা, তাতে ভিন্নতর কোনও ইতিহাসবোধের সম্ভাবনা নিহিত ছিল কি? এ-প্রশ্নের বিশদ আলোচনার জায়গা এই প্রবন্ধে আর নেই। বাংলায় ইতিহাস রচনার এই ধারাটি অন্তঃশীলা। গত একশো বছর ধরেই আর্য হিন্দু-ভারতবর্ষের পর্বতপ্রমাণ ভারে তা সম্পূর্ণ চাপা পড়ে গিয়েছে। তবে সামান্য যে কটি উদাহরণ দিলাম, তা থেকেই তো দেখা যাচ্ছে যে এই ভিন্ন ইতিহাসে পাঠান আর মুঘলকে একত্র করে ‘মুসলমান শাসনকাল’ নাম দিয়ে পর্ব ভাগ করা সম্ভব হচ্ছে না। পাঠানপর্ব আর মুঘলপর্বের মধ্যে মৌলিক প্রভেদ এসে যাচ্ছে। অথবা বাংলায় মুসলমান ধর্মের প্রসারের কথা বলতে গিয়ে ‘মুহম্মদ বলিলেন, তরবারি লইয়া কাফেরদের নির্মূল করো’, এইভাবে গল্প শুরু করা যাচ্ছে না।
