মুঘল বাদশাহ মারাঠা রাজা রামচন্দ্রের হাতে শাসনভার তুলে দিলেন।
নিমেষ মধ্যে সকলের গাত্রোত্থানের আজ্ঞা হইল। উঠিয়া আর কেহই সাহ আলমকে দেখিতে পাইলেন না। দিল্লীর সিংহাসনোপরি শিবাজী বংশ-সস্তৃত রাজা রামচন্দ্র একাকী উপবিষ্ট—তাঁহার শিরোদেশে সাহ আলম প্রদত্ত সেই রাজমুকুট। (পৃ. ৩৪৬-৭)
যাঁরা ভূদেবের এই আশ্চর্য রচনাটি পড়েননি, তাঁদের জানাই যে এর পর একটি ব্যবস্থাপক সভায় ভারতবর্ষের নতুন শাসনতন্ত্র গৃহীত হয়। সম্পূর্ণ আধুনিক শাসনতন্ত্র, নিঃসন্দেহে ভূদেবের সমসাময়িক নবপ্রতিষ্ঠিত জার্মান রাষ্ট্রের অনুপ্রেরণায় রচিত। তাতে এমনই শক্তিশালী এক সার্বভৌম আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে ওঠে যে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে শিল্প-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সমান তালে পাল্লা দিয়ে ভারতবর্ষ ঔপনিবেশিক শক্তিকে চিরতরে ঠেকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়।
সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘুর হিসেব করে অন্য যে-উত্তরটি আমরা পাই, তাকেই স্বাধীন ভারতে ‘সেকুলার’ বলা হয়ে থাকে। এই মতটির বক্তব্য, সংখ্যাগুরুর উৎপীড়ন থেকে বাঁচাবার জন্য রাষ্ট্রের উচিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে আলাদাভাবে রক্ষা করা। সমস্যা হল, রাষ্ট্রব্যবস্থায় ধর্মীয় সম্প্রদায় অনুযায়ী প্রতিনিধিত্বের কোনও ব্যবস্থা নেই, অথচ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব রাষ্ট্রকে স্বীকার করতে হচ্ছে। ফলে স্বাতন্ত্রের সব চেয়ে প্রকট চিহ্নধারী ব্যক্তি বা সংগঠনই সংখ্যালঘুর প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃত হয়। স্বাধীনতার পর ভারতের মুসলিম সমাজে সংস্কার-আন্দোলন যতটা হতোদ্যম হয়ে পড়েছে, পৃথিবীর কোনও মুসলিম দেশে তা হয়নি।
তৃতীয় একটি উত্তরও অবশ্য আছে। তবে সেটি সমাজ-জীবনে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ভূমিকা স্বীকার করে না। বাংলায় এই মতটির একাধিক প্রবক্তা ছিলেন। স্বদেশী-পরবর্তী যুগে রবীন্দ্রনাথের লেখায় এই মতটির প্রতিফলন সুপরিচিত। রাষ্ট্রনীতির সংকীর্ণ সীমা ছাড়িয়ে বৃহত্তর জনজীবনে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের পারস্পরিক আদানপ্রদান ও সৌহার্দ্যের যে অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে, এই মতের প্রবক্তারা সেদিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁরা বলেন, রাজারাজড়ার যুদ্ধবিগ্রহে নয়, এই লোকাচার-দেশাচারের জগতেই ভারতবর্ষের প্রকৃত ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যাবে। এই ইতিহাস, বিভিন্নতার মধ্যে ঐক্যের ইতিহাস। ভারতীয় জনজীবনের বিভিন্নতা সবরকম ধর্মবিশ্বাসকেই ধারণ করতে পারে; রাষ্ট্রের ক্ষমতা থেকে উদ্ভূত বিবাদ তাকে স্পর্শ করে না।
এই উত্তরটা নিয়েও অবশ্য মুশকিল আছে। প্রথম অসুবিধা হল, আধুনিক ইতিহাসবোধের সঙ্গে একে কিছুতেই খাপ খাওয়ানো যায় না। এর যুক্তিটা আসলে ইতিহাসের ঊর্ধ্বে অবস্থিত। ইতিহাসে যা-ই পরিবর্তন ঘটে থাকুক না কেন, ভারতের সমাজজীবনের অন্তর্নিহিত সত্য এক এবং অপরিবর্তিত—এই হল এর বক্তব্য। ফলে কোথাও না কোথাও আধুনিক ইউরোপের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ভারতীয় সমাজদর্শনের একটা মৌলিক পার্থক্য এখানে তুলে ধরার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। রবীন্দ্রনাথ ন্যাশনালিজম নামে ইংরেজি বক্তৃতায় যেমন সরাসরিই বলেছিলেন, জাতীয়তাবাদ আধুনিক ইউরোপের এক মারাত্মক আবিষ্কার, ওটা আমাদের ঘাড়ে না চাপলেই আমাদের মঙ্গল। দ্বিতীয় অসুবিধা, উৎপত্তির সমস্যাটা এখানেও এড়ানো যাচ্ছে না। লোকাচারের ঢিলেঢালা ঐক্যের কাঠামোয় ইসলামকে সেই ভূদেবের মতো ‘পালিত সন্তান’ হিসেবেই একমাত্র জায়গা দেওয়া যায়। ফলে এই ধরনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ধর্মীয় ‘সমন্বয়’-এর উদাহরণ—ইসলাম যেখানে দেশীয় জল-হাওয়ার প্রভাবে ‘ভারতীয়’ চেহারা ধারণ করেছে। তৃতীয় অসুবিধা, লৌকিক আচার-বিশ্বাসকে যতই খাতির করা হোক না কেন, উচ্চমার্গের সংস্কৃতির সঙ্গে তার মৌলিক বিরোধ মুছে ফেলা যায় না। লোকসমাজের স্বাতন্ত্র্য সত্যি সত্যি স্বীকার করে নিলে আধুনিক সংস্কার-আন্দোলনের যৌক্তিকতাই হারিয়ে যায়। ‘বিভেদের মাঝে ঐক্য’-র এইসব নিদর্শনকে আধুনিক জাতীয় জীবনের মঞ্চে হাজির করতে হলে তাকে রীতিমতো সাবান ঘষে সাফসুতরো করে নিতে হয়। রবীন্দ্রনাথ নিজেও তাই করেছিলেন। আজকালকার ‘ফেস্টিভাল অফ ইণ্ডিয়া’ বা ‘অপনা উৎসব’ অন্যভাবে তাই করছে। তাতে লোকজীবনের নিজস্বতা বজায় থাকছে কি?
এই তিনটে উত্তরের কোনওটাতেই কিন্তু ইসলামের উত্তরাধিকারে সমগ্র ভারতীয় জাতির কোনো দাবি থাকতে পারে, এ সম্ভাবনাকে স্বীকার করা হয় নি। জাতীয় ইতিহাসের অখণ্ডতার ধারণা অনিবার্যভাবে টেনে নিয়ে গেছে একটিমাত্র সূত্রের দিকে, যেখানে ভারতীয় ঐতিহ্যের উৎপত্তি এবং যার নাম প্রাচীন হিন্দু সভ্যতা। ইসলাম এখানে হয় বিদেশী আক্রমণের ইতিহাস, না হলে দেশজ লোকাচারের অন্তর্গত। ইসলামের নিজস্ব ক্লাসিকাল ঐতিহ্যের স্থান ভারতের ইতিহাসের বাইরে।
মজার কথা হল, ইউরোপের ক্লাসিকাল ঐতিহ্যকে কিন্তু আমাদের আধুনিকতা অনায়াসেই আপন করে নিয়েছে। ইউরোপের ঐতিহ্য বিশ্বজনীন, এটাই বোধ হয় যুক্তি। এতে যে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের প্রধান লক্ষণটি প্রকাশ পাচ্ছে, সেটা অবশ্য আমরা স্বীকার করি না। ইউরোপ যত আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে আমাদের পরাধীন করতে পেরেছে, পাঠান-মুঘল সৈন্যেরা তার ধারে কাছেও কোনওদিন পৌঁছতে পারে নি। কিন্তু আমাদের স্বাদেশিকতা ইউরোপীয় ঐতিহ্যকে আজও অনুকরণীয় মনে করে।
