বস্তুত জাতীয়তার অর্থ হিন্দু জাতীয়তা, এই ধারণাটিকে কোনও প্রাক-আধুনিক ধর্মীয় মতাদর্শের ভগ্নাবশেষ বলে ভাবলে মারাত্মক ভুল করা হবে। ধারণাটি সম্পূর্ণ আধুনিক। আধুনিক অর্থেই তা যুক্তিবাদী; অযৌক্তিক আচার-ব্যবহার কুসংস্কার বিরোধী। আধুনিক অর্থেই তা রাষ্ট্রকেন্দ্রিক; রাষ্ট্রের অখণ্ডতা এবং সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে কট্টরপন্থী এবং সমাজনীতি নির্ণয় ও সংস্কারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে বিশ্বাসী। এই মতবাদের মুল আবেদন ধর্মীয় নয়, রাষ্ট্রীয়। সেই অর্থে এর যুক্তির কাঠামো সম্পূর্ণ সেকুলার। একটু ভাবলেই দেখা যাবে মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের ইতিহাসবোধ কোনও অর্থেই সেকুলার ছিল না। তুলনায় তারণীচরণ আদ্যোপান্ত সেকুলার।
সত্যি কথা বলতে কি, এই মতবাদে ‘হিন্দুত্ব’ ধারণাটির আদপেই কোনো ধর্মীয় অনুষঙ্গ নেই। ‘হিন্দু’ হওয়ার জন্য কোনও বিশেষ ধর্মীয় আচার বা বিশ্বাস বা চিহ্নের প্রয়োজন নেই। হিন্দুদের মধ্যে অজস্র সাম্প্রদায়িক পার্থক্য এই মতবাদের কাছে অপ্রাসঙ্গিক। এমন-কি বৌদ্ধ বা জৈন ধর্মের মতো বেদবিরোধী ব্রাহ্মণবিরোধী ধর্মকেও অনায়াসে হিন্দু বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। একই ভাবে ব্রাহ্মণ্যধর্ম এবং বর্ণসমাজের বাইরে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীগুলিকেও হিন্দুজাতির অংশ বলে দাবি করা চলে; কিন্তু ইসলাম বা খ্রিস্টান ধর্ম নিশ্চিতভাবে এই জাতীয়তার বাইরে।
অন্তর্ভুক্তি এবং বহিষ্কারের যুক্তিটা তাহলে কী? যুক্তিটা আসলে ঐতিহাসিক উৎপত্তির যুক্তি। বৌদ্ধ বা জৈনধর্ম ‘হিন্দু’, কারণ তা ভারতে উদ্ভূত। ইসলাম বা খ্রিস্টানধর্ম ভারতীয় নয়, বিদেশি। এখানে ‘ভারত’ বলতে সম্পূর্ণ আধুনিক অর্থে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানাবিশিষ্ট সার্বভৌম রাষ্ট্রই বোঝাচ্ছে। আগেই দেখেছি, জাতীয়তাবোধের জন্ম থেকেই আমাদের ইতিহাসকল্পনায় এই সার্বভৌমত্বের ধারণা এসে গেছে। আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার বৈশিষ্ট্যই এই যে সার্বভৌমত্বের ভৌগৌলিক সীমা আর নাগরিকত্বের পরিচয় নিয়ে কোনও দ্বিধা বা অসঙ্গতি সে বরদাস্ত করতে পারে না। হিন্দু জাতীয়তাবাদ গত একশো বছর ধরে এই আধুনিক ঐতিহাসিক যুক্তি ব্যবহার করেই নিজেকে প্রকৃত ভারতীয় জাতীয়তাবাদ বলে দাবি করে চলেছে।
তাহলে হিন্দু নয় অথচ ভারতের অধিবাসী, এমন জনগোষ্ঠীর স্থান কোথায়? এর একাধিক উত্তর আছে। রাষ্ট্রের কেন্দ্রত্ব মেনে নিয়ে যে-উত্তর, তাতে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংখ্যাই হল প্রধান নির্ণায়ক। সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় হিন্দু, বাকিরা সংখ্যালঘু। উগ্রহিন্দুর বক্তব্য, রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে সংখ্যালঘুদের কর্তব্য সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব এবং প্রাধান্য মেনে নেওয়া। এই উত্তরটি আধুনিক জাতীয়তাবাদের আদিপর্ব থেকেই পাওয়া যাচ্ছে। ভূদেব মুখখাপাধ্যায়ের স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস (১৮৭৬) মনে করুন।২০ পানিপতে আহমদ শাহ আবদালির সঙ্গে মারাঠাদের যুদ্ধ চলেছে। এমন সময় মারাঠা সেনাপতির দূত আহমদ শাহ-র কাছে গিয়ে বললেন যে যদিও মুসলমানেরা চিরকাল হিন্দুদের প্রতি অন্যায় করে এসেছে, তবু হিন্দুরা ক্ষমাশীল।
…আপনি নিজ দলবল সহিত নির্ব্বিঘ্নে স্বদেশ গমন করুন। ভারতবর্ষনিবাসী যদি কোন মুসলমান আপনার সমভিব্যাহারে যাইতে ইচ্ছা করেন, তাহাতেও কোন প্রতিবন্ধকতা নাই। তবে তাদৃশ মুসলমানের পক্ষে পাঁচ বৎসর পর্যন্ত এ দেশে প্রত্যাগমন নিষিদ্ধ।
কাল্পনিক ইতিহাস। তাই আহমদ শাহ বললেন,
তুমি মহারাষ্ট্র-সেনাপতিকে গিয়া বল…আর কখনও ভারতবর্ষ আক্রমণে উদ্যম করিব না।
এই কথা শুনিয়া দূত অভিবাদনপূৰ্ব্বক কহিল, মহারাজের আজ্ঞা শিরোধার্য্য। আমার প্রতি আর একটি কথা বলিবার আদেশ আছে। এ দেশীয় যে সকল মুসলমান নবাব, সুবাদার, জমিদার, জায়গীরদার প্রভূতি আপনার সমভিব্যাহারী না হইবেন, তাহারা অবিলম্বে যে যাঁহারা আপনাপন অধিকার এবং আবাসে প্রতিগমন করুন। মহারাষ্ট্রীয় সেনাপতি বলিয়াছেন ‘ঐ সকল লোকের পূর্ব্বকৃত সমস্ত অপরাধ মার্জ্জনা হইল’। (পৃ. ৩৪৪)
এর পর ভারতের সমস্ত প্রান্তের শাসকবৃন্দের সভা বসল। ‘একজন গম্ভীর প্রকৃতির মধ্যবয়স্ক পুরুষ’ বললেন:
‘ভারতভূমি যদিও হিন্দুজাতীয়দিগেরই যথার্থ মাতৃভূমি, যদিও হিন্দুরাই ইহার গর্ভে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, তথাপি মুসলমানেরাও আর ইহার পর নহেন, ইনি উহাদিগকেও আপন বক্ষে ধারণ করিয়া বহুকাল প্রতিপালন করিয়া আসিতেছেন। অতএব মুসলমানেরাও ইহার পালিত সন্তান।
‘এক মাতারই একটি গর্ভজাত ও অপরটি স্তন্যপালিত দুইটি সন্তানে কি ভ্রাতৃত্ব সম্বন্ধ হয় না? অবশ্যই হয়—সকলের শাস্ত্র মতেই হয়। অতএব ভারতবর্ষ-নিবাসী হিন্দু এবং মুসলমানদিগের মধ্যে পরস্পর ভ্রাতৃত্ব সম্বন্ধ জন্মিয়াছে…
‘এক্ষণে সকলকে সম্মিলিত হইয়া মাতৃদেবীর ভার গ্রহণ করিতে হইবে। কিন্তু সকলের কৰ্ত্তা একজন না থাকিলেও সম্মিলন হয় না। কোন ব্যক্তি আমাদিগের সকলের অধিনায়ক হইবেন? দৈবানুকুলতায় এ বিষয়েও আর বিচার করিবার স্থল নাই। রাজাধিরাজ রামচন্দ্রের নিমিত্ত এই যে সিংহাসন প্রস্তুত হইয়াছে,…পৃথিবী টলিলেও আর ইহা টলিবে না—আর ঐ দেখ, মহামতি সাহ আলম বাদশাহ স্বেচ্ছাতঃ রাজা রামচন্দ্রকে আপন শিরোভূষণ মুকুট প্রদান করিয়া তাঁহার হস্তে সাম্রাজ্য পালনের ভার সমর্পণ করিবার নিমিত্ত আসিতেছে।’(পৃ. ৩৪৫-৬)
