এখনও পাচ্ছি, কিন্তু বেশিদিন আর পাব না। ভারতীয় সমাজসংস্কৃতির ক্লাসিকাল সূত্রগুলির মধ্যে যদি ইসলামের কোনও জায়গা না থাকে, তা হলে বিকল্প ঐতিহ্য হিসেবেই ইসলামকে ভাবা হবে। ১৮৮৬ সালে শেখ আবদুর রহিম হজরত মহম্মদের জীবনী১৭ লিখতে গিয়ে ঠিক তারিণীচরণেরই মতো ইংরেজ পণ্ডিতদের উদ্ধত করে দাবি করছেন:
ইসলাম ঈসায়ী ধৰ্ম্ম অপেক্ষা মানবজাতির বিশেষ কল্যাণ সাধন করিয়াছে। দর্শন ও বিজ্ঞান শাস্ত্র প্রভৃতি এসিয়া মহাদেশের মোসলমান ও স্পেনদেশীয় মুরগণ কর্ওৃক ইউরোপ মহাদেশে আনীত হইয়াছিল।…স্পেনদেশীয় মোসলমানগণ ইউরোপের দর্শন শাস্ত্রের জন্মদাতা। (পৃ. ১৭৩)
কিন্তু তার পরই ইসলাম সম্বন্ধে ইউরোপীয়দের মিথ্যা অপবাদের প্রতিবাদ:
ইতিপূৰ্ব্বে বঙ্গভাষায় হজরত মহম্মদের যে কয়খানি জীবনী বাহির হইয়াছে, তাহা প্রায় সমস্তই অসম্পূর্ণ বিশেষতঃ ঐ সকল পুস্তক ইংরাজী গ্রন্থাবলম্বনে লিখিত বলিয়া কোন কোন বিষয় মোসলমানদিগের উপযোগী হয় নাই। হজরতমহম্মদ তরবারি বলে স্বীয় ধর্ম্ম প্রচার করিয়াছেন বলিয়া ভিন্ন ধর্মাবলম্বীগণ তাঁহার নামে যে বৃথা দোষারোপ করিয়া থাকেন, এই পুস্তক পাঠ করিলে তাহা কতদূর সত্য, সকলেই সহজে বুঝিতে পারিবেন। (ভূমিকা)
এর পর আরও সরাসরি ভারতে মুসলিম শাসন সম্বন্ধে প্রচলিত মতের—বলা উচিত হিন্দু লেখকদের দ্বারা প্রচলিত মতের—খণ্ডন করা হচ্ছে :
যদিও কোন কোন মোসলমান শাসনকর্তা ধৰ্ম্ম সম্বন্ধে লোকের ওপর অত্যাচার করিয়াছেন, কিন্তু তাহা ধৰ্ম্মবিগর্হিত কার্য্য, তথাপিও তাহা দেখিয়া যে, ইসলামের উপর উক্তরূপ দোষারোপ করা উচিত নহে। (পৃ. ১৭৮)
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে এই আবদুর রহিম সম্পাদিত মিহির ও সুধাকর পত্রিকাতে প্রায় বঙ্কিমের সুরেই ‘বঙ্গীয় মুসলমানদিগের উপযোগী জাতীয় ইতিহাস’ লেখার আহ্বান জানানো হবে।১৮ সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে শতাব্দীর শেষ বছরগুলিতে আবদুল করিম লিখবেন ভারতবর্ষে মুসলমান রাজত্বের ইতিহাস (১৮৯৮) কিংবা ইসমাইল হোসেন সিরাজী লিখবেন ইতিহাসাশিত কাব্য অনল প্রবাহ(১৮৯৯)।১৯ এঁদের চেতনা বাংলার আধুনিক ইংরেজি-শিক্ষিত মধ্যবিত্তের চেতনা। প্রজাবর্গের নেতা, এইক্ষেত্রে বাংলার মুসলমান প্রজার নেতা হিসেবে তাঁদের অবস্থান সম্বন্ধে তাঁরা সম্পূর্ণ সচেতন। ‘হায় রাজত্ব! ধন্য তোমার প্রলোভন শক্তি!’ বলে আর তাঁরা বই শেষ করবেন না।
৯
একদিকে আধুনিক ইতিহাসবিদ্যা, রাষ্ট্র আর জাতির সমীকরণ, জাতীয় একাত্মবোধ এবং জাতির স্বাধীনতারক্ষায় বাহুবলের ভূমিকা, আর অন্য দিকে জাতীয় ইতিহাস বলতে কেবল হিন্দুর স্মৃতি, হিন্দুর ঐক্য, হিন্দুর বাহুবল—বিশেষ করে বঙ্কিমের রচনায় এই দু-টি ধারণার পারস্পরিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে রণজিৎ গুহ বলেছেন, এখানে একটা স্ববিরোধ আছে। বঙ্কিম আহ্বান জানাচ্ছেন বটে যে নিজেদের ইতিহাস নিজেদেরই লিখতে হবে, এবং এ-ও দাবি করছেন যে সে ইতিহাস হবে বাহুবলের ইতিহাস, কারণ বাহুবলে প্রতিষ্ঠিত পরতন্ত্র একমাত্র বাহুবলের সাহায্যেই ধ্বংস করা যায়, কিন্তু এই বাহুবলের ইতিহাস বঙ্কিম খুঁজেছেন প্রাক-ব্রিটিশ যুগে। উপনিবেশের পর্বে পরাধীন জাতির ঐতিহাসিক মুক্তি যে আধুনিক চেতনা, তার শর্তগুলো উপস্থিত করেও বঙ্কিম কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বাহুবল প্রয়োগের কথা বলছেন না। তিনি শোনাচ্ছেন কেবল মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে হিন্দু জাতির বাহুবলের কাহিনী। এর ফলে বঙ্কিম তাঁর নিজের প্রস্তাবটি নিজেই ভেস্তে দিচ্ছেন।
বঙ্কিমকে যদি তাঁর সমসাময়িক ইতিহাস-রচয়িতাদের পাশে দাঁড় করিয়ে দেখি, তাহলে প্রথমেই দেখতে পাব যে সে-সময়কার নগণ্য পাঠ্যপুস্তক লেখকদের মধ্যে অনেক কম পরিশীলিত হলেও মোটামুটি একই ধরনের ইতিহাসবোধ প্রচলিত ছিল। দ্বিতীয়ত, এই নতুন ইতিহাস-রচনার সব চেয়ে প্রভাবশালী ধারাটির মধ্যেও ঠিক একই স্ববিরোধ উপস্থিত। তৃতীয়ত, এই স্ববিরোধের কারণ বোঝাতে গিয়ে বঙ্কিমের ক্ষেত্রে যদিও বা বলি—রণজিৎ গুহ যেমন বলেছেন-যে চেতনার অন্তরালে স্বাধীনতার আসল লড়াই ব্রিটিশের বিরুদ্ধেই ছিল কিন্তু প্রস্তাবটা তখনও প্রকাশ্যে হাজির করা যায়নি, অন্য লেখকদের ক্ষেত্রে কিন্তু সে-কথাটা বলতে পারব না। কারণ ইতিহাস লেখার স্বাধীনতা আর রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা, এই দুই সংগ্রামই যে উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে, একথা ১৮৮০-র দশকে একাধিক বাঙালি লেখক বেশ সরাসরিই বলেছেন। সমস্যা হল, ব্রিটিশ শাসন এবং মুসলিম শাসন, দুটোকেই তাঁরা বলেছেন পরতন্ত্র। উভয় ক্ষেত্রেই জাতীয় স্বাধীনতার লক্ষ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান। উভয় ক্ষেত্রেই স্বাধীনতা রক্ষার একমাত্র উপায় বাহুবল। কোনও স্ববিরোধ নেই এখানে।
উনিশ শতকের শেষ দিকে ইংরেজি-শিক্ষিত মধ্যবিত্তের নতুন বাংলা সাহিত্য এবং নতুন শিক্ষাব্যবস্থায় জাতীয় ইতিহাসের এই ছকটির যে কী-একচ্ছত্র প্রভাব ছিল তা আবিষ্কার করলে একটু চমকেই যেতে হয়। আধুনিক রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ইতিহাস-রচনা চালু হওয়ার পর থেকে বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিক পর্যন্ত এর প্রায় কোনও ব্যতিক্রম নেই। জাতীয়তাবোধের ইতিহাসের এই দিকটা নিয়ে কিছুটা অস্বস্তি আছে বলেই বোধ হয় কথাটা ভুলে যাওয়ার একটা ঝোঁক আছে আমাদের মধ্যে। তাতে কিন্তু উগ্রহিন্দু প্রচারের সব চেয়ে জোরাল উপাদানটিকেই হিসেবের বাইরে রেখে দেওয়া হয়।
