আকবর মুসলমান ধৰ্ম্ম-নির্দ্দিষ্ট কতিপয় অযৌক্তিক কর্ম্ম-কলাপের বিলোপ সাধনের চেষ্টা পাইয়াছিলেন। হিন্দুদিগের পক্ষেও তিনি অনেক অযৌক্তিক পদ্ধতি রহিত করিবার প্রয়াস পান। তিনি অগ্নি-পরীক্ষা, বিধবাদিগের অমতে তাহাদিগকে স্বামীর চিতায় আরোপণ এবং বাল্য বিবাহ নিষেধ করেন। বিধবাদিগের পুনৰ্ব্বার বিবাহ করিতেও অনুমতি দেন।…ধর্ম্ম বিষয়ে আকবরের প্রাগুক্তরূপ উদার মত দেখিয়া গোঁড়া মুসলমানেরা তাঁহার অত্যন্ত বিদ্বেষী হইয়াছিল। অনেকেই তাঁহাকে নাস্তিক বলিত। (পৃ. ১৪১)
ধর্ম সম্বন্ধে নিরপেক্ষতা নয়, রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহার করে হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মেরই অযৌক্তিক আচারের সংস্কার করতে চেয়েছিলেন বলে আকবর প্রশংসনীয়।
মুসলমান রাজার ছলনার সাহায্যে যুদ্ধজয়ের কাহিনীও আরও আছে। যেমন শের শাহ-র রাইসিন দুর্গদখল। দুর্গে অবরুদ্ধ ‘হিন্দু রাজা’-র সঙ্গে আক্রমণকারীদের চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু
মুসলমানেরা পূৰ্ব্বকৃত নিয়ম অসিদ্ধ, এই ভান করিয়া, তাহাদিগকে আক্রমণ করিল। তাহারা অতিশয় সাহসের সহিত আত্মরক্ষা করিতে লাগিল, কিন্তু অবশেষে পরাস্ত ও মুসলমানদিগের নিষ্ঠুর হস্তে নিহত হইল। ….সেরের এই বিশ্বাসঘাতকতা ও ক্রূরতার বিশেষ উদ্দেশ্য কি ছিল জানা যায় না। যাহা হউক, পরিণামে তাঁহাকে এই ঘোর অপরাধের জন্য বিলক্ষণ শাস্তি ভোগ করিতে হইয়াছিল। (পৃ. ১০৪)
মুসলমান শাসকদের সঙ্গে কোনো কোনো হিন্দু রাজার মৈত্রীর বিষয়টিও আবার এসেছে। যেমন মুঘলদের সঙ্গে রাজপুতদের বৈবাহিক সম্পর্ক।
যে সকল রজঃপূত রাজারা এইরূপ বিবাহদানে সম্মত হইতেন, তাঁহারা সম্রাটের বিলক্ষণ অনুরাগভাজন ও অনুগৃহীত হইয়া উঠিতেন। তন্নিবন্ধন তাদৃশ বিবাহ জাতিভ্রংশক ও অবমানকর জ্ঞান করা দূরে থাকুক, উদয়পুরের অধিপতি ভিন্ন, সমুদয় রজঃপূত রাজারাই তদ্দ্বারা আপনাদিগকে কৃতার্থ ও সম্মানিত বোধ করিতে লাগিলেন। কিন্তু উদয়পুরপতি সেই সমুদয় যবনান্ত রাজাদিগের সহিত আদান-প্রদান পর্য্যন্তও পরিত্যাগ করিলেন। সেই হেতু অধুনা উদয়পুরের রাজবংশ জাত্যাংশে রজঃপূতদিগের মধ্যে সর্বাপেক্ষা পবিত্র বলিয়া সম্মানিত হইয়া থাকে। তাঁহার সহিত আদান প্রদানে অন্যান্য রাজারা অতিশয় শ্লাঘা জ্ঞান করেন। (পৃ. ১২৫-৬)
৮
আগেই বলেছি, তারিণীচরণের ইতিহাস বই-এর শুধু যে প্রতি বছর নতুন সংস্করণ বেরোত তাই নয়, অন্য অনেক পাঠ্যবই-ই তারিণীচরণকে মডেল ধরে নিয়ে লেখা হত।১৫ এরকম বেশ কয়টি বই-এর মধ্যে একটি হল ভারতবর্ষের ইতিহাসের প্রশ্নোত্তর, ‘বরিশাল জিলার অন্তর্গত গোপালপুরে নিবাসী শ্রীছৈয়দ আবদুল রহিম দ্বারা সংগৃহীত।’১৬ অধিকাংশটাই তারিণীচরণ অবলম্বনে লেখা। কিন্তু অল্প কয়টি জায়গায় পরিবর্তন আছে: সেগুলি লক্ষ্য করার মতো।
প্রথমেই আর্যদের কথা। আবদুল রহিম কথাটা অন্যভাবে লিখছেন। ‘হিন্দুর ভারতবর্ষের আদি নিবাসী নহেন, ইহারা সিন্ধু নদের পশ্চিম তীর হইতে আসিয়া, বাহুবলে ভারতবর্ষের অধিবাসী হইয়াছেন।’ (প. ২) তারিণীচরণ লিখেছিলেন, ‘অনার্যেরা আর্যসম্প্রদায়ে গৃহীত হয়’, ‘আর্যের উপনিবেশ স্থাপন করে’, ‘হিন্দুপতাকা উড্ডীন করে’ ইত্যাদি। আবদুল রহিম লিখছেন, ‘বাহুবলে ভারতবর্ষের অধিবাসী হইয়াছেন’।
এর পর ইতিহাসের ঘটনার বর্ণনায় কিন্তু মোটামুটি তারিণীচরণকেই অনুসরণ করছেন তিনি। যেমন, মহম্মদ গজনবী ও মহম্মদ গোরী এতদুভয়ের মধ্যে মহম্মদ গোরীই হিন্দুদিগের প্রধান অপকারী, কারণ মহম্মদ গজনবী কেবল ভারতবর্ষে উপস্থিত হইয়া লুঠপাঠ পূৰ্ব্বক ডাকাইতি করিতেন, আর মহম্মদ গোরী হিন্দুদিগের পরম স্বাধীনতা-রত্ন হরণ করেন।’ (পৃ. ১৬)
অথবা, ‘মহাত্মা আকবর জিজিয়া কর উঠাইয়া দিয়াছিলেন, দুরাত্মা আরঞ্জিব তাহা পুনঃ সংস্থাপিত করিলেন।’ (পৃ. ৭৮) এমন-কি, ‘মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ আরঞ্জিবের গোঁড়ামি ও দৌরাত্ম’, এই বিষয়ে তারিণীচরণের প্রতিধ্বনি করে একটি প্রশ্নের উত্তরও আছে।
পরিবর্তন আবার আসছে একেবারে শেষ প্রশ্নে এসে। প্রশ্নটা এই: ‘শিক্ষক। তুমি মুসলমান রাজত্বের বিবরণ পাঠ করিয়া কি উপদেশ পাইলে?’ এর উত্তরে সৈয়দ আবদুল রহিম লিখছেন :
ছাত্র। আৰ্য! আমি মুসলমান রাজত্বের ইতিবৃত্ত পাঠ করিয়া নিশ্চয় জানিয়াছি। রাজত্ব ইহকাল ও পরকালের ভয়ানকাম্পদ। ইহাতে ঈশ্বর দত্ত ক্ষমা ও দয়াবৃত্তি এককালীন বিসর্জন দিতে হয়। হায়! কি আক্ষেপের বিষয়, যাহার সঙ্গে একত্র আহার বিহার ও শয়ন উপবেশন করিয়া বহুদিন অতিক্রম করা হইয়াছে। …ভয়ঙ্কর রাজত্বের নিমিত্ত এমন স্নেহাস্পদ সহোদরের শোণিত পাত পূৰ্ব্বক অম্লানবদনে মেদিনীকে রঞ্জিত করিতেছে। রাজত্ব তুমি মনুজ নিকরের মনকে কিরূপ পাষাণময় কর, তাহা আমি মুসলমান রাজত্বের ইতিহাস পাঠ করিয়া সুন্দররূপ বুঝিয়াছি। তোমার জন্য পিতা মাতা ভ্রাতা ভগ্নীর ও অন্য অন্য মানব কুলের শিরোচ্ছেদ এমন কি, স্থায়ীধন ধর্মও তুচ্ছ বলিয়া গণিত হয়। হায় রাজত্ব! ধন্য তোমার প্রলোভন শক্তি। (পৃ. ১০০-১)
তারিণীচরণের কাছে পাঠ নেওয়া সত্ত্বেও আধুনিক ইতিহাসবিদ্যার সারমর্ম এই ছাত্রটির মনে মোটেই প্রবেশ করে নি। সৈয়দ আবদুল রহিমের নিজস্ব বয়ানে আমরা। সেই মৃত্যুঞ্জয়ের প্রজার কথাই এখনও শুনতে পাচ্ছি।
