মাহমুদ শাহিয়া বংশের রাজা আনন্দপালের বিরুদ্ধে অগ্রসর হলেন (তারিণীচরণ লিখছেন অনঙ্গপাল)।
‘মুসলমানেরা সমগ্র ভারতবর্ষের স্বাধীনতা ধ্বংস ও হিন্দুধর্মের বিলোপ সঙ্কল্প করিয়াছে এবং লাহোর গ্রহণ করিতে পারিলেই অমনি অন্যান্য ভাগ আক্রমণ করিবে, সুতরাং সকলে একযোগ হইয়া ম্লেচ্ছদিগের দমন করা নিতান্ত আবশ্যক হইয়াছে’ এই বলিয়া [অনঙ্গপাল] সুমুদয় প্রধান প্রধান হিন্দু রাজার নিকট দূত প্রেরণ করিয়াছিলেন। তাঁহার আবেদনও নিষ্ফল হয় নাই। দিল্লী, কনোজ, উজীন, গোয়ালিয়ার, কালিঞ্জর প্রভৃতির রাজারা অনঙ্গপালের সহিত একযোগ হইলেন: রাশি রাশি সেনা আসিয়া পাঞ্জাবে উপস্থিত হইল। মামুদ তাদৃশ আকস্মিক বলোপচয়ে ভীত হইয়া আত্মরক্ষার উদ্দেশেই পেশোয়ারের সন্নিধানে অবস্থিত রহিলেন। দিন দিন হিন্দুসৈন্য বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। দূরদেশ হইতেও হিন্দু মহিলাগণ, হীরকাদি বিক্রয় ও স্বর্ণালঙ্কার দ্রবীভূত করিয়া, যুদ্ধের সংস্থান পাঠাইতে লাগিলেন…। (পৃ. ৪৩-৪)
মাহমুদ লাহোর দখল করলে ‘সমগ্র ভারতবর্ষের স্বাধীনতা’ ধ্বংস হবে, এই ইতিহাস-জ্ঞান বলা বাহুল্য রাজা আনন্দপালের থাকা সম্ভব ছিল না। এ তারিণীচরণেরই কথা। কিন্তু কথাগুলিকে তাঁর সৃষ্ট ‘অনঙ্গপাল’ চরিত্রটির মুখে বসিয়ে দিয়ে তিনি কিন্তু এই কাহিনীটিকে সমগ্র হিন্দু জাতির যুদ্ধে পরিণত করে ফেলতে পারছেন: ‘রাজারা একযোগ হইলেন’, ‘রাশি রাশি সেনা আসিয়া পাঞ্জাবে উপস্থিত হইল’, ‘দূরদেশ হইতে হিন্দু মহিলাগণ যুদ্ধের সংস্থান পাঠাইলেন’ ইত্যাদি। কিন্তু তার পরেই এল দুর্দৈব। ‘অতঃপর মুসলমান-শিবির হইতে একটা জ্বলৎ-বন্দুক অথবা তীক্ষ্ণশর আসিয়া হিন্দু-সেনানায়ক অনঙ্গপালের হস্তীর অঙ্গে বিদ্ধ হইল। মাতঙ্গ রণক্ষেত্র হইতে রাজাকে পৃষ্ঠে করিয়া পলায়ন করিল। অমনি হিন্দুসৈন্য ছত্রভঙ্গ হইয়া পড়িল।’ (পৃ. ৪৪) এ-গল্পের শেষেও আছে প্রতিহিংসার ঘটনা, তবে এবারে একটু অন্য ধরনের।
মামুদের সহিত মৈত্রীনিবন্ধন কনোজরাজ হিন্দুভূপাল সমাজে ঘৃণা ও নিগ্রহের ভাজন হইয়াছিলেন; তচ্ছ্রবণে গজনিপতি শরণাগতের প্রতিপালন সঙ্কল্পে দশম বার ভারতবর্ষে উপস্থিত হন। কিন্তু তিনি পহুঁছিবার পূর্বেই কালিঞ্জরধিপতি কনোজ-রাজের প্রাণসংহার সম্পন্ন করেন। (পৃ. ৪৬)
বলা বাহুল্য, এটিও একটি অনুষ্ঠান, সুতরাং ‘প্রাণসংহার করেন’ নয়, ‘প্রাণসংহার সম্পন্ন করেন’।
মুহম্মদ ঘুরির সেনারা ছিলেন
পৰ্বতবাসী, কষ্টসহ ও সমরচতুর; এ দিকে হিন্দু রাজারা পরস্পর অনৈক্যদৃষিত, তাঁহাদের সৈন্যকুল অপেক্ষাকৃত শান্ত ও বিশৃঙ্খলা; সুতরাং মহম্মদ অনায়াসেই জয়লাভ করিবেন আপাতত এরূপ বোধই হইতে পারে, কিন্তু বস্তুতঃ তাহা হয় নাই। প্রায় কোন হিন্দু রাজাই ঘোর সংগ্রাম বিনা স্বাধীনতা বিসর্জ্জন করেন নাই। বিশেষ রজঃপূতেরা কখনই পরাভূত হয় নাই। মুসলমান রাজত্বের উৎপত্তি, স্থিতি ও বিনাশ সম্পন্ন হইয়াছে, রজঃপূতের অদ্যাপিও স্বাধীন রহিয়াছে। (পৃ. ৫৩)
হিন্দু রাজারা শুধু যে বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পণ করেন নি, তাই নয়, মুহম্মদের প্রথম আক্রমণের পর ‘হিন্দুরা বিংশতি ক্রোশ পর্যন্ত মুসলমানদিগের পশ্চাৎ পশ্চাৎ তাড়াইয়া গিয়া প্রতিনিবৃত্ত হইলেন।’ (পৃ. ৫৪) দ্বিতীয় বার জয়চাঁদের বিশ্বাসঘাতকতা এবং মুহম্মদের কপটাচারের ফলে পৃথ্বীরাজের পরাজয় ঘটে। মৃত্যুঞ্জয়ের কাহিনীর সঙ্গে তারিণীচরণের এই বিবরণের কোনওই মিল নেই। শেষে প্রতিহিংসার গল্পও আছে। ‘গোক্ষুর’ নামে এক পার্বত্য জাতি মুহম্মদের হাতে পরাস্ত হয়েছিল। তাদের কয়েকজন সুযোগ পেয়ে রাত্রে মুহম্মদের তাঁবুতে প্রবেশ করে নিদ্রিত সুলতানকে হত্যা করে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করে।
এর পর ভারতে সুলতানদের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ধর্মান্ধ শাসকদের হিন্দুদের ওপর অত্যাচারের কাহিনী একাধিকবার আসবে। যেমন সিকন্দর লোদি।
সেকেন্দর তীর্থ-পর্য্যটন ও পৰ্ব্বাহ্নে গঙ্গা প্রভৃতি পবিত্র সরিতে স্নান নিষেধ এবং নানাস্থানের দেবালয় চূর্ণ করিলেন। একদা কোন ব্রাহ্মণ ঘোষণা করেন ‘কায়মনোবাক্যে অনুষ্ঠান করিলে সকলপ্রকার ধর্ম্মই পরমেশ্বরের সমান গ্রাহ্য’। সেকেন্দর তাঁহাকে ধরিয়া আনিলেন, এবং তিনি আপনার অনন্যবিদ্বেষী মত পরিত্যাগে অস্বীকৃত হইলে, নিষ্ঠুর নৃপতি তাঁহার প্রাণসংহার করিলেন। কোন ইষ্টনিষ্ট মুসলমান তীর্থযাত্রা প্রতিষেধ অন্যায় বলাতে ‘পাষণ্ড! পৌত্তলিকদিগের পোষকতা করিতেছিস’ বলিয়া রাজা কর্তৃক ভর্ৎসিত হইলে, তিনি উত্তর করিলেন, “না, আমি তাহা করিতেছি না, আমি বলিতেছি রাজাদিগের প্রাজাপীড়ন অতিশয় অন্যায়’। তচ্ছ্রবণে সেকেন্দর ক্ষান্ত হইলেন। (পৃ. ৮৩)
অওরঙজেবের প্রতি তারিণীচরণের লেখনীর খোঁচা বলা বাহুল্য সব চেয়ে তীক্ষ্ণ। ‘আরাঞ্জিব প্রতারক, পরস্বাপহারক ও মনুষ্যঘাতক ছিলেন।’ (পৃ. ২২০) ‘মুসলমান ধৰ্ম্মে আস্থাপ্রকাশ তাঁহার স্বার্থসাধনের পক্ষে উপকারীই হইয়াছিল।…বস্তুতঃ আরাঞ্জিব ধৰ্ম্ম বা সন্নীতি কিছুরই অনুরোধে আপন স্বার্থ পরিত্যাগ করিতেন না।’ (পৃ. ১৭৩)
অপর পক্ষে আকবর সম্বন্ধে তারিণীচরণ প্রশংসার কথাই বলেছেন, তবে প্রশংসার কারণটি তাৎপর্যপূর্ণ।
