আরবে ইসলাম ধর্মের প্রতিষ্ঠা থেকে যে নতুন কাহিনী শুরু হল, তারিণীচরণ তাকে ভারতবর্ষের রঙ্গমঞ্চে নিয়ে আসছেন ধীরে ধীরে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর গোড়ায় তথাকথিত দাস রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অনেক আগে আরবদের সিন্ধ আক্রমণ, মাহমুদ গজনভির দফায় দফায় পঞ্জাব, সিঁন্ধ, গুজরাট আক্রমণ—এই সব ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন তারিণীচরণ। প্রতিটি কাহিনীর মোটামুটি একই ছক। মুহম্মদ ইব্ন-কাসিমের সিন্ধ আক্রমণ, মাহমুদ গজনভির পঞ্জাব আক্রমণ এবং মুহম্মদ ঘুরির যুদ্ধ জয়—এই তিনটি দৃষ্টান্ত দিলে ছকটি পরিষ্কার হয়ে যাবে।
মুহম্মদ কাসিম ৭১২ খ্রিস্টাব্দে ‘সিন্ধুরাজা ডাহিরের বিরুদ্ধে’ যুদ্ধে নামলেন।
দৈব তাঁহার অনুকূল হইল। তাঁহার সেনাদিগের নিক্ষিপ্ত একটা জ্বলৎ গোলক আসিয়া রাজার হস্তীকে আহত করাতে হস্তী একান্ত ভীত হইয়া রণস্থল হইতে ঊর্ধ্বশ্বাসে পলায়ন করিল। রাজসেনারা, রাজা পলায়ন করিলেন ভাবিয়া, চতুর্দিকে ছত্রভঙ্গ হইয়া পড়িল। পরে দৃষ্ট হইবে যে, এইরূপ দুর্দ্দৈব হেতু ভারতবর্ষীয়েরা জয়লাভের সম্পূর্ণ সম্ভাবনা সত্ত্বেও, অনেকবার মুসলমানদিগের নিকট পরাভূত হইয়াছেন। (পৃ. ৩৮)
বলে রাখা দরকার, এই ‘দৈব’ কিন্তু মৃতুঞ্জয়ের দৈব নয়। দুর্দৈব এখানে নিছকই দুর্ঘটনা, অধর্মাচরণের প্রতিফলস্বরূপ দৈবরোষ নয়। ‘ভারতবর্ষীয়দের’ দুর্ভাগ্য যে জয়লাভের সম্পূর্ণ যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র দুর্ঘটনার জন্য তারা বারে বারে যুদ্ধে পরাজিত হয়।
অবশেষে, প্রচুর সাহসিকতা প্রকাশ করিয়া [সিন্ধুরাজা] শক্তহস্তে নিধন প্রাপ্ত হইলেন। পরে রাজধানী আক্রান্ত হইল; কিন্তু ডাহিরের পত্নী স্বামীর অনুরূপ সাহস অবলম্বন করিয়া নগর-রক্ষার চেষ্টা পাইতে লাগিলেন। পরিশেষে আহারসামগ্রীর অপ্রতুল হইয়া উঠিল। তখন শক্তহস্তে পতনের অপেক্ষা মরণ শ্রেয়ঃ জ্ঞান করিয়া তিনি নগরবাসীদিগকে তাহার আয়োজন করিতে কহিলেন। সকলে সম্মত হইল; সর্ব্বত্র চিতা প্রজ্জ্বলিত হইয়া উঠিল। তদনন্তর পুরুষেরা স্নানাদি সমাপন করিয়া, অসিহস্তে বহির্গত হইয়া, অনতিদীর্ঘকাল-মধ্যেই মুসলমানদিগের কর্তৃক নিহত হইল। (পৃ. ৩৮)
যুদ্ধে পরাজয়ের এই গল্পটি পরে আবার পাব। তার দুটি উপাদান বিশেষভাবে লক্ষ করার মতো। এক, শত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধে হিন্দু রমণীর সাহস। আর দুই, যুদ্ধে প্রাণত্যাগ হিন্দু পুরুষের কাছে একটি যজ্ঞ—আত্মাহুতির অনুষ্ঠান: ‘সর্বত্র চিতা প্রজ্জ্বলিত হইয়া উঠিল’, ‘স্নানাদি সমাপন করিয়া…নিহত হইল’। এর সঙ্গে তুলনীয়, ‘কজ্জলনয়না অপ্সরাগণের সহবাসে’ প্রলুব্ধ মুসলমান সৈন্যের যুদ্ধলিপ্সা।
কাসিম প্রসঙ্গে আরও একটি গল্প বলছেন তারিণীচরণ, সেটিও এই ছকেরই অংশ।
সিন্ধুদেশের জয়াবসানে কাসিম ভারতবর্ষের অভ্যন্তরে প্রবেশের উদ্যোগ পাইতেছিলেন, এমন সময়ে, এক স্ত্রীর চাতুৰ্য্যজাল তাঁহার কাল হইয়া উঠিল। সমরশেষে সিন্ধুদেশে যে সমস্ত স্ত্রী বন্দী হয়, তন্মধ্যে রাজা ডাহিরের দুই দুহিতা ছিল। উহারা যেমন উচ্চকুলজাতা তেমনি অসাধারণ রূপলাবণ্যসম্পন্না ছিল। কাসিম ইহাদিগকে খলিফার উপযুক্ত উপঢৌকন জ্ঞান করিয়া তৎসন্নিধানে প্রেরণ করিলেন। মুসলমানপতি জ্যেষ্ঠার রূপে মোহিত হইয়া তাহার প্রতি সতৃষ্ণ দৃষ্টিপাত করিতে লাগিলেন। অমনি সে বিগলিত অশ্রুধারা বর্ষণ করিয়া কহিল, হায়! আমি এক্ষণে ভবৎসদৃশ জনের অনুরাগের যোগ্য নহি, কাসিম পূর্ব্বেই আমার ধর্ম নষ্ট করিয়াছে। খলিফা ভৃত্যের ঈদৃশ ব্যবহার শ্রবণমাত্র, ক্রোধান্ধ হইয়া আজ্ঞা করিলেন, কাসিমকে চৰ্ম্মে বদ্ধ করিয়া আমার সন্নিধানে আনয়ন কর। আজ্ঞা সম্পন্ন হইলে, খলিফা রাজকুমারীকে কাসিমের শব প্রদর্শন করাইলেন। তখন সে হর্ষোৎফুল্ল নয়নে কহিল, কাসিম সম্পূর্ণ নির্দ্দোষী; জনকজনকীর মৃত্যু ও তাঁহাদের প্রজাবর্গের অবমাননার প্রতিশোধ দিবার জন্যই আমি তাহার এরূপ মিথ্যাপবাদ করিয়াছিলাম। (পৃ. ৩৯)
হিন্দুনারীর সাহসিকতার সঙ্গে আরও একটি বৈশিষ্ট্য যোগ হল—উপস্থিত বুদ্ধি। আর যুদ্ধে আত্মাহুতির পাশাপাশি আরও একটি কাহিনীরও সৃষ্টি হল— আত্মীয়-স্বজন-স্বজাতির মৃত্যুর শোধ নেওয়ার জন্য শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা।
একাদশ শতাব্দীর গোড়ায় মাহমুদ গজনভির সময়ে চলে আসা যাক। ‘মুসলমানদিগের মধ্যে ইহারই দৌরাত্মে সর্ব্বপ্রথম ভারতবর্ষ বিপৰ্য্যস্ত ও ব্যতিব্যস্ত হইয়া উঠে, এবং ইঁহারই পর হইতে হিন্দুদিগের স্বাধীনতা, কৃষ্ণপ্রতিপচ্চন্দ্ৰমার ন্যায়, ক্রমশই ক্ষয়গ্রস্ত ও বিলুপ্ত হইয়া আইসে।’ (পৃ. ৪১) মাহমুদের কয়েকটি গুণ তারিণীচরণ স্বীকার করছেন, যেমন সাহস, বিচক্ষণতা, যুদ্ধকুশলতা এবং অধ্যবসায়। অবশ্য মাহমুদ যে জ্ঞান-বিজ্ঞান-কাব্য-শিল্পচর্চার একজন প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, সে-কথা বলছেন না।
কিন্তু তিনি যেমন ঐ সকল গুণান্বিত ছিলেন তেমনি, অন্ততঃ লোকতঃ মুসলমান-ধর্ম্মে একান্ত ভক্ত, দেবদেবীর অর্চনার দারুণ বিদ্বেষী, এবং যৎপরোনাস্তি অর্থপিশাচ ও গৌরবাকাঙ্ক্ষীও ছিলেন। ভারতবর্ষ তাঁহার তাবৎ আকাঙ্ক্ষা পরিপূরণের প্রকৃত ক্ষেত্র ছিল। (পৃ. ৪২)
তথাকথিত ‘মুসলমান চরিত্রের’ এ আর-একটি বৈশিষ্ট্য। ইসলামের প্রতি অনুরাগ যেখানে যুদ্ধের কারণ, সেখানেও তা প্রকৃত ভক্তি নয়, লোকদেখানো ধার্মিকতা।
