আধুনিক ইউরোপের আদলে ইতিহাসচর্চা চালু হওয়ার পর ঐতিহাসিক স্মৃতির গড়নে পরিবর্তনগুলো কোথায় এল, সেটা একটু লক্ষ করা উচিত। রাজাবলির-কালক্রম ছিল নিচ্ছিদ্র; এখন বিশ্বাসযোগ্য পুরাবৃত্তের অভাবে সেখানে অনেক ফাঁকফোকর দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে, আগে যা ছিল কেবল রাজারাজড়ার ইতিবৃত্ত, এখন তা হয়ে গিয়েছে ‘আমাদের’ ইতিহাস—পুরাবৃত্তের শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত সমগ্র জাতির অখণ্ড ইতিহাস। রাজত্ব হস্তান্তর আগে যেখানে ছিল দৈবের ইচ্ছা, এখন তা সমগ্র সমাজনীতির উৎকর্ষ বা অপকর্ষের সূচক। সেই উৎকর্ষ বা অপকর্ষ আবার বিচার করতে হচ্ছে বিশ্বের অন্যান্য জাতির সঙ্গে তুলনার মধ্যে দিয়ে। মৃত্যুঞ্জয়ের সপ্তদ্বীপা পৃথিবী, তার মধ্যে জম্বদ্বীপ, ইত্যাদি পৌরাণিক কল্পনা এখন বাতিল; এখন ভারতবর্ষের ইতিহাসকে তার জায়গা খুঁজে নিতে হচ্ছে অন্যান্য জাতির ইতিহাসের প্রতিযোগী হিসেবে।
এই যে নতুন এক বিশ্ব ইতিহাস, তা বিভিন্ন জাতির স্বতন্ত্র ইতিহাসের যোগাযোগে উৎপন্ন। এর প্রমাণ তারিণীচরণের কাহিনীর পরের অংশেই পাওয়া যাচ্ছে। ‘আদিম ভারতবর্ষীয়দিগের সভ্যতা ও পাণ্ডিত্য,’ এই অধ্যায়ের সঙ্গে প্রাচীন ভারতের ইতিহাস শেষ। এর পর তারিণীচরণ পাঠককে নিয়ে যাচ্ছেন ভারতবর্ষের বাইরে, সপ্তম শতাব্দীর আরবে। প্রশ্ন করতে পারি, দ্বাদশ শতকে ভারতবর্ষে রাজত্বের পরিবর্তনের গল্পই যদি বলতে হয়, তবে সপ্তম শতকের আরবে গিয়ে সে-গল্প শুরু করতে হবে কেন? উত্তরটা অবশ্য আমরা সকলেই জানি, অত্যন্ত সহজ উত্তর সেটা। কিন্তু এই সহজ উত্তরের পেছনে উনিশ শতকের ইউরোপীয় ইতিহাসবিদ্যার অনেক গঢ় রহস্য লুকিয়ে আছে।
মহম্মদ স্বীয় শিষ্যদিগের নাম মুসলমান অর্থাৎ ভক্ত এবং তদ্ভিন্ন যাবতীয় মনুষ্যের নাম কফির অর্থাৎ ধর্মভ্রষ্ট রাখিলেন। …স্বীয় শিষ্যগণকে কাফরদিগের বিনাশের জন্য তরবারি ধারণের আজ্ঞা দিয়া [মেহম্মদ] কহিলেন, পরমেশ্বর সম্প্রতি আদেশ করিয়াছেন ভ্রান্তির উচ্ছেদ জন্য যে সকল মুসলমান সমরশায়ী হইবেন, তাঁহারা বিবিধ বিলাসবস্তু-সমন্বিত স্বর্গধামে যাইয়া, কজ্জলনয়না অপ্সরাগণের সহবাসে, পরমসুখে কালহরণ করিবেন; কিন্তু রণে ভঙ্গ দিয়া পলায়ন করিলে, পরকালে নরকে পতিত ও দুঃসহ দুঃখ-দাবদাহে অজস্র দগ্ধীভূত হইতে থাকিবেন। আরব জাতি স্বভাবতই নির্ভীক ও সমরপ্রিয়; তাহাতে ইহলোকে শত্রুর ধন-লুণ্ঠন ও পরলোকে প্রাগুক্তরূপ সুখভোগের প্রত্যাশা পাওয়াতে মুসলমানদিগের খড়ঙ্গ সৰ্ব্বত্রই অনিবার্য হইয়া উঠিতে লাগিল, সমস্ত আরব মহম্মদের অধীন হইল এবং তাঁহার মৃত্যুর অল্পকাল পরেই কাবুল হইতে স্পেন পর্যন্ত তাবৎ দেশে মুসলমান পতাকা উড্ডীন হইয়া উঠিল। যেরূপ স্বল্পকালের মধ্যে এক রাজ্যের পরেই অন্য রাজ্য, এক দেশের পরেই অন্য দেশ, মুসলমানদিগের পদানত হইয়াছিল, পুরাবৃত্তে সেরূপ আর কখনই দেখা যায় নাই। ঈদৃশ দিগ্বিজয়োন্মত্তেরা যে নতুন সম্পদের আকর ভারতবর্ষ লাভে লোলুপ হয় নাই ইহা কখনই সম্ভব নহে। (পৃ. ৩৬-৭)
গল্পের শুরুতেই যতগুলো কথা বলে নেওয়া হল, তাতেই পাঠককে পরের ঘটনার জন্য প্রস্তুত করে দেওয়া হচ্ছে। ভারতবর্ষের ইতিহাসের ধারায় এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি জাতির ইতিহাস এসে মিশবে। সেই ভিন্ন ইতিহাসের উৎপত্তি মুহম্মদের সময়। অর্থাৎ ত্রয়োদশ শতাব্দীর গোড়ায় দিল্লিতে যে নতুন রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হবে, এবং পরের সাড়ে তিনশো বছরে যে-রাজত্বে একাধিক পরিবর্তন হবে, তার পরিচয় শুধু তুর্কো-আফগান বা মুঘল রাজত্ব নয়, সামগ্রিকভাবে তা ইসলামের ইতিহাসের অংশ। এই ইতিহাসের যারা নায়ক, তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও বলে দেওয়া হচ্ছে এখানে। তারা সমরপ্রিয় এবং বিশ্বাস করে যে বিধর্মীদের বিনাশ করা তাদের ধর্মীয় কর্তব্য। ধনলুণ্ঠন আর স্বর্গে অপ্সরাদের সঙ্গে সহবাসের লোভে তারা যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণত্যাগ করতেও প্রস্তুত। তারা দিগ্বীজয়ী নয়, ‘দিগ্বিজয়োন্মত্ত’। ভারতবর্ষের ঐশ্বর্যের আকর্ষণে তারা স্বভাবতই লোলুপ।
উনিশ শতকের ইংরেজ ঐতিহাসিকদের লেখা ভারতবর্ষের ইতিহাসচর্চার সঙ্গে যাঁরা পরিচিত, তাঁরাই জানবেন যে একদিকে যেমন উইলিয়াম জোনস প্রভৃতি প্রাচ্যবিদ্যাবিদের গবেষণায় প্রাচীন ভারতের কাব্য-দর্শন নিয়ে উৎসাহের সৃষ্টি হয়েছিল, ঠিক তেমনি প্রাক্-ব্রিটিশ পর্বে মুসলিম রাজত্বের অপদার্থতা সম্বন্ধেও ইংরেজ লেখকেরা মোটামুটি একমত ছিলেন। এই অপদার্থতার কাহিনী বলা বাহুল্য ব্রিটিশ শাসনের সপক্ষে যুক্তি হিসেবে উপস্থিত করা হত। জেমস মিল-এর অবশ্য প্রাচীন ভারত এবং মুসলিম শাসন, উভয় পর্ব সম্বন্ধেই সমান অশ্রদ্ধা ছিল। তা ছাড়া সুলতানী এবং মুঘল সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রতত্ন আদতে ইসলামী, সুতরাং তার গুণাগুণ ইসলামের ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতেই বিচার্য, এ-ধারণাও ইংরেজ ঐতিহাসিকরাই চালু করেন। তার সঙ্গে যুক্ত হয় এডওয়ার্ড গিবনের সময় থেকে সুপ্রচলিত ইসলাম সম্বন্ধে ইউরোপীয়দের যাবতীয় প্রেজুডিস।১৪ আধুনিক ইতিহাসবিদ্যার জাদুদণ্ডের ছোঁয়ায় এ-দেশেও যখন জাতীয় ইতিহাস লেখা শুরু হল, তখন একদিকে যেমন প্রাচীন ভারতকে কল্পনা করে নেওয়া হল সমস্ত আধুনিকতার ক্লাসিকাল সূত্র হিসেবে, তেমনি মুসলিম শাসনকে ঠেলে দেওয়া হল মধ্যযুগীয় অন্ধকারে। এবং আলোকপ্রাপ্ত ইউরোপের ইসলাম সম্বন্ধে সবরকম কুসংস্কার আরোপ করা হল ‘মুসলিম জাতীয় চরিত্র’ নামক একটি কাল্পনিক ধারণার ওপর। দ্বাদশ শতাব্দীর পরবর্তী অধ্যায়ের ভারতের ইতিহাসে এই চরিত্রটিকে এবার সর্বত্র ঘুরে বেড়াতে দেখা যাবে। এই মুসলমানের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হল, সে ধর্মান্ধ, অসহিষ্ণু, যুদ্ধপ্রিয়, দুর্নীতিপরায়ণ এবং নিষ্ঠুর।
