এখানে লক্ষণীয়, বৌদ্ধ ধর্মমতের যৌক্তিকতা অস্বীকার করা হচ্ছে না। বরং হিন্দুধর্মের আভ্যন্তরীণ একটি যুক্তিবাদী সমালোচনা হিসেবেই তাকে উপস্থিত করা হচ্ছে। তা না হলে, পর্বভাগের প্রথম সূত্র অনুসারে বৌদ্ধ রাজাদের আমলটিকে প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের স্বতন্ত্র একটি পর্ব বলতে হত। তার আর প্রয়োজন হচ্ছে না; হিন্দু রাজত্বকালের মধ্যেই তাকে জায়গা করে দেওয়া যাচ্ছে।
প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিবৃত্ত বহুলাংশে অস্পষ্ট হলেও একটি বিষয়ে ঐতিহাসিক সাক্ষ্যের কোনও অভাব নেই। সেটি হল ‘আদিম ভারতবর্ষীয়দিগের সভ্যতা ও পাণ্ডিত্য’। তারিণীচরণের ষষ্ঠ অধ্যায়ের এই হল বিষয়। মূল প্রতিপাদ্য এইরকম:
প্রাংশু ও বামনে, বলী ও ক্ষীণে যা বৈলক্ষণ্য, আদিম ও আধুনিক হিন্দুতে তদপেক্ষাও অধিক। পূৰ্ব্ব পূৰ্ব্বকালে বৈদেশিক ভ্রমণকারীরা ভারতবর্ষে আসিয়া আৰ্য্যবংশের সাহসিকতা, বাঙ্নিষ্ঠা, সারল্য প্রভৃতি সদ্গুণের পরাকাষ্ঠাদর্শনে বিস্মিত ও চমৎকৃত হইতেন, অধুনা ঐ সকল গুণের অভাবই প্রধানরূপে কীৰ্ত্তিত হইয়া থাকে। তখন হিন্দুরা দিগ্বিজয়ে নির্গত হইয়া সময়ে সময়ে তাতার চীন প্রভৃতি দেশে আপনাদিগের পতাকা উড্ডীন করিতেন; অধুনা বহুদূর হইতে এক ক্ষুদ্র দ্বীপের কতিপয় সৈনিক আসিয়া ভারতভূমির উপরে কর্তৃত্ব করিতেছে। তখন হিন্দুরা স্বজাতীয় ভিন্ন সকলকে ম্লেচ্ছ বলিয়া অবজ্ঞা করিতেন: অধুনা সেই স্নেচ্ছেরা আসিয়া আর্য্যসন্তানগণের উপরে নিয়ত অবজ্ঞা বর্ষণ করিতেছে। তখন হিন্দুদিগের অর্ণবতরী সুমাত্রা প্রভৃতি দ্বীপে নিয়ত যাতায়াত করিত, অদ্যাপিও তাহার সন্নিহিত বালিদ্বীপে তাহার ভূরি নিদর্শন প্রাপ্ত হওয়া যায়; অধুনা সমুদ্রগমণের নামেই হিন্দুদিগের হৃৎকম্প উপস্থিত হয়, এবং কেহ কোনরূপে যাইলে তিনি সমাজ হইতে বহিষ্কৃত হইয়া আইসেন। (পৃ. ৩২)
প্রাচীন গৌরব, বর্তমান অধঃপতন। পুরো গল্পটা কিন্তু আমাদের নিয়ে। প্রাচীন ভারতের শৌর্যবান নায়কেরা আমাদেরই পূর্বপুরুষ। আর আজকের হীনবল ভারতীয় বলা বাহুল্য আমরা। প্রাচীন ভারতবর্ষীয়েরা যে ‘তাতার চীন প্রভৃতি দেশ’ জয় করেছিলেন, সমুদ্র পেরিয়ে তাঁরা যে বিদেশে বাণিজ্য করতে যেতেন এবং ভিন্ন জাতীয়দের ‘ম্লেচ্ছ বলিয়া অবজ্ঞা করিতেন’, এ আমাদেরই গৌরব। আর আজকে ‘আর্যসন্তানেরা’ যে নিজেরাই অপরের পদানত, অন্য জাতির অবজ্ঞার পাত্র, তা আমাদের কলঙ্ক। ক্ষমতার মাপকাঠিতে বিশ্বের বিভিন্ন জাতির মধ্যে ভারতবাসীর স্থান আজ নেমে গেছে বহু নীচে, কিন্তু এককালে সেই স্থান ছিল ওপরে।
কেবল বীরত্বই নয়, বিদ্যাচর্চার ক্ষেত্রেও প্রাচীন ভারতের কৃতিত্ব সারা বিশ্বে স্বীকৃত।
পূৰ্ব্বকালে যখন প্রায় সমুদয় মেদিনী ঘোর মূর্খতা-রজনীতে আচ্ছন্ন ছিল, তখনও ভারতবর্ষে বিদ্যার নির্ম্মল আলোক কোনরূপেই নিষ্প্রভ ছিল না। তীক্ষ্ণমণীষা-সম্পন্ন হিন্দুরা দর্শনশাস্ত্রে অতি আদিম কালে যে সকল মত উদ্ভাবিত করিয়া গিয়াছেন, এখনও ইয়ুরোপীয় পণ্ডিতেরা তৎসমুদায় লইয়া আন্দোলন করিতেছেন। (পৃ. ৩৩)
লক্ষণীয়, এই বিষয়ে ইউরোপীয় পণ্ডিতদের সাক্ষ্য তারিণীচরণের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। বস্তুত প্রাচীন ভারতে বিদ্যাচর্চার উৎকর্ষের যে-কটি দৃষ্টান্ত তিনি দিচ্ছেন— জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত, তর্কশাস্ত্র, আর ভাষা-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে—তার সব ক-টিই উনিশ শতকের প্রাচ্যবিদ্যাবিৎ সাহেবদের আবিষ্কার। যুক্তিটা যেন এই রকম: আজকের ভারতবাসীদের হীন অবস্থা দেখে ইউরোপীয়েরা তাদের অবজ্ঞা করে বটে, কিন্তু চিরকাল ভারতীয়রা এরকম ছিল না; ইউরোপীয় পণ্ডিতেরাই স্বীকার করছেন যে প্রাচীন ভারতে জ্ঞানবিজ্ঞানচর্চা উৎকর্যের শিখরে পৌঁছেছিল। জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের পুরো কাহিনীটা সাজানোর ক্ষেত্রে প্রাচ্যবিদ্যাচর্চার এই অবদান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
তারিণীচরণের ইতিহাসটি যে জাতীয়তাবাদী, তার আরও একটি প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। প্রাচীন গৌরব আর পরবর্তী অবক্ষয়ের এই কাহিনীটির শেষে নীতিকথার গল্পের মতো একটি উপদেশ আছে। সেটি হল, সমাজের সংস্কার করো, অবক্ষয়ের চিহ্ন এইসব কুসংস্কার মুছে ফেলে প্রাচীন আদর্শের পুনরুদ্ধার করো। যে-সব ভ্রান্ত আচার আর বিশ্বাসের জন্য ভারতবাসী আজ সকলের ঘৃণার পাত্র, প্রাচীনকালে তার কিছুই ছিল না, কারণ ইউরোপীয়েরাই স্বীকার করেছেন প্রাচীনকালে আমরা অতি সভ্য ছিলাম।
অধুনা হিন্দু সীমন্তিনীগণ দাসীর ন্যায় ব্যবহৃত, বন্দীর ন্যায় অবরুদ্ধ ও ইতর জন্তুর ন্যায় নিরক্ষর দৃষ্ট হয়। কিন্তু সার্দ্ধ সহস্র বর্ষ পূর্বে অবলোকন করিলে স্ত্রীদিগকে আদরণীয়, শিক্ষণীয় ও অনেক পরিমাণে অনবরুদ্ধ দেখা যায়। তখন বাল্যবিবাহ কোথায়? কেহই চতুর্ব্বিংশতি বর্ষের ন্যুন বয়সে দারপরিগ্রহ করিতেন না। (পৃ. ৩৩)
জাতীয়তাবাদীর কাছে প্রাচীন ভারত হয়ে উঠল তার ক্লাসিকাল আদর্শ। আর প্রাচীন থেকে বর্তমানের মাঝের অংশটা হল তমসাবৃত মধ্যযুগ। বলা বাহুল্য এই ছকও ইউরোপীয় ইতিহাসে অনুমোদিত। উনিশ শতকের সুট-বুট পরা ইংরেজ যদি প্রাচীন গ্রিসকে তার ক্লাসিকাল উত্তরাধিকার বলে দাবি করতে পারে, তা হলে উনিশ শতকের ইংরেজি শিক্ষিত বাঙালিই বা ‘ব্যাদে আছে’ বলে গর্ব করবে না কেন?
