৭
প্রথম বাক্যেই চমক লাগে। ‘ভারতবর্ষ ক্রমান্বয়ে হিন্দু, মুসলমান ও খৃস্টানদিগের অধিকৃত হইয়াছে, এবং তদনুসারে এদেশের ইতিবৃত্ত হিন্দু, মুসলমান ও খৃস্টান এই তিন রাজত্বকালে বিভক্ত।’ (পৃ. ১) রাজাবলি থেকে দেশের ইতিহাস-এ উত্তরণটি লক্ষণীয়। ‘রাজাবলি’ আর লেখা হবে না, এখন থেকে যা লেখা হবে সবই ‘দেশের ইতিবৃত্ত’। কিন্তু এই যে দেশের ইতিবৃত্ত, তার পর্ব ভাগ করা হল রাজত্বের চরিত্র অনুযায়ী। আর রাজত্বের চরিত্র নির্ধারিত হচ্ছে শাসকের ধর্ম অনুসারে। দেশ আর রাজত্বের মধ্যে সম্বন্ধ এখানে নিত্য এবং অভেদ্য। শুধু তাই নয়, আপাতদৃষ্টিতে নানা সময় নানা রাজ্য আর রাজা দেখতে পাওয়া গেলেও, প্রকৃত অর্থে রাজত্ব একটিই। তা দেশেরই সমব্যাপী। তার চিহ্ন রাজধানী অথবা সিংহাসন। অন্যভাবে বলতে গেলে, রাজত্ব হল দেশের সার্বভৌমত্বের প্রকাশ; রাজধানী বা সিংহাসন সেই সার্বভৌম রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্র। দেশটা যেখানে ভারতবর্ষ, তার সমব্যাপী সার্বভৌমত্ব’ তাহলে একটিই। সেই সার্বভৌমত্বের চিহ্নস্বরূপ কেন্দ্রও একটিই। তা না হলে মুহম্মদ ঘুরি পৃথ্বীরাজকে পরাজিত করে দিল্লি দখল করলেন, তাতে সমগ্র ভারতবর্ষের ইতিহাসের র্ব বদলে যাবে কেন? অথবা পলাশির যুদ্ধকে মুসলমান রাজত্বের অবসান এবং খ্রিস্টান রাজত্বের সূত্রপাত বলব কেন? দেশ বা জাতি, সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্র—আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসে এই তিনটি ধারণার মধ্যে যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে, ইংরেজি-শিক্ষিত বাঙালির মনেও তা এবার আশ্রয় পেল।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গির আধুনিকতার আর-একটি দৃষ্টান্ত পরের পৃষ্ঠাতেই পাওয়া যাবে। ‘অধুনা যে সকল সংস্কৃত গ্রন্থ পাওয়া যায়, তাহার অধিকাংশই কাব্য ও কল্পিত উপন্যাসে পূর্ণ; রাজতরঙ্গিনী ভিন্ন একখানিও প্রকৃত পুরাবৃত্ত দেখা যায় না।’ (পৃ. ২) প্রকৃত পুরাবৃত্ত কাকে বলে, তা অবশ্য ততদিনে ইউরোপীয় ইতিহাসবিদেরা স্থির করে দিয়েছেন। ‘ভারতের প্রকৃত পুরাবৃত্ত নাই’, এটা সাহেবদের ভারতবিদ্যাচর্চার একটা বিশেষ আবিষ্কার। মৃত্যুঞ্জয়ের এমন কথা কখনো মনে হয় নি। তারিণীচরণ কিন্তু নিঃসঙ্কোচে মেনে নিয়েছেন কথাটা।
এর পর ভারতবর্ষের অধিবাসীদের কথা।
অতি প্রাচীন সময়ে ভারতবর্ষে, পরস্পর অতিশয় বিভিন্ন, দুই সম্প্রদায়ের লোকের বসতি ছিল। তন্মধ্যে এক সম্প্রদায় শরীরের দৈর্ঘ্য ও গঠন প্রভৃতি বিষয়ে আমাদের অনেক অনুরূপ। অধুনা সেই সম্প্রদায়ের সন্ততি হিন্দু নামে খ্যাত। অন্য সম্প্রদায়ের লোকেরা খর্ব্বকার, কৃষ্ণবর্ণ ও অতিশয় অসভ্য ছিল। ইদানীং ইহাদের সন্ততি খস, ভিল্ল, পুলিন্দ, সাঁওতাল প্রভৃতি জঙ্গলা জাতি নামে পরিচিত। (পৃ. ২)
আদিতে ভিন্ন, কিন্তু পরে মিশে গেছে, এমন সম্প্রদায়ও ছিল। হিন্দুদের মধ্যে প্রথম তিন বর্ণ দ্বিজ নামে পরিচিত, কিন্তু শূদ্রেরা ঐ নামে অধিকারী নয়। ‘ইহাতেও প্রতীয়মান হইতেছে যে, আদৌ প্রথমোক্তেরা শেষোক্তদিগের হইতে স্বতন্ত্র সম্প্রদায় ছিলেন। পরে শেষোক্তরা সেই সম্প্রদায়ে গৃহীত, কিন্তু সৰ্ব্ব-নিকৃষ্ট শ্রেণীতে গণিত হয়।’ (পৃ. ৪)
তা ছাড়া ভারতের উত্তর ভাগ থেকে ক্রমশ দক্ষিণের দিকে হিন্দু ধর্মের প্রসারের একটি ধারণাও তারিণীচরণে আছে। সেই প্রসার স্পষ্টতই রাজত্বের প্রসার।
আদৌ দক্ষিণাবর্ত্ত জঙ্গলময় এবং অহিন্দু সভ্য জাতিদিগের নিবাসস্থল ছিল। রামচন্দ্র সর্ব্বপ্রথম ভারতবর্ষের ঐ ভাগে হিন্দু পতাকা উড্ডীন করেন। …অদ্যাপি দক্ষিণাবর্ত্ত হিন্দুদিগের আদিম উপনিবেশ সংস্থাপনের অনেক জনশ্রুতি শুনিতে পাওয়া যায়। (পৃ. ২৭)
রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের আধুনিক চিহ্ন রামচন্দ্রের হাতে পত্পত্ করে উড়ছে, এ-ছবি একশো বছর আগের ইংরেজি-শিক্ষিত বাঙালি ব্রাহ্মণের কল্পনায় সহজেই এসে গিয়েছিল। তবে এ-হেন রামচন্দ্র যে দক্ষিণ ভারতের অধিবাসীদের দমন করে উপনিবেশ স্থাপন করেছিলেন, এ-কথায় আজকের উগ্রহিন্দু বোধ হয় বিব্রতই হবেন।
প্রকৃত পুরাবৃত্তের অভাবে ইতিহাসের কাহিনী নির্মাণে বড় বড় ফাঁক থেকে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। মৃত্যুঞ্জয়ের ইতিহাসভাবনা থেকে আমরা কত দূর সরে এসেছি, তার প্রমাণ পাওয়া যাবে তারিণীচরণের এই মন্তব্যে :
ইয়ুরোপীয় পুরাবিদেরা, বিবিধ যুক্তি দ্বারা প্রতিপন্ন করিয়াছেন, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ খৃষ্টীয়-শকারম্ভের চতুর্দশ শতাব্দীর পূৰ্ব্বে ঘটিয়াছিল। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর বহুকাল পৰ্যন্ত ভারতবর্ষের ইতিবৃত্ত এরূপ অপরিয়ে, অসম্বন্ধ ও গোলযোগে আবৃত যে তাহা হইতে কোনরূপ বিবরণ সঙ্কলন করা দুঃসাধ্য। (পৃ. ১৬-৭)
যেটুকু বিবরণ তারিণীচরণ সংগ্রহ করেছেন, তাতে খুব উল্লেখযোগ্য কিছু নেই। মোটামুটিভাবে ইংরেজদের লেখা প্রাচীন ভারতের ইতিহাস যে সময় যেমন প্রচলিত ছিল, সেরকমই লিখেছেন তিনি। শুধু বৌদ্ধধর্মের বিষয়ে একটি কৌতূহল জাগাবার মতো মন্তব্য করেছেন।
[বুদ্ধ] হিন্দুধর্মের পরম শত্রু হইয়া উঠেন; এ জন্য হিন্দুরা তাঁহাকে নাস্তিক ও ধর্মলোপক বলিয়া বর্ণনা করিয়া থাকেন। সে যাহা হউক, তাঁহার প্রণীত ধৰ্ম্মে অতি পবিত্র বিবিধ উপদেশ প্রাপ্ত হওয়া যায়। তিনি যুক্তিহীন কিছুই মান্য করিতেন না। কোন জাতি যতই কেন প্রাচীন সংস্কারের পরতন্ত্র হউক না, চিরাগত মতের বিরুদ্ধে প্রবলতর যুক্তি প্রদর্শন করিতে পারিলে পরিণামে অবশ্যই অন্ততঃ কিয়দংশেরও মত পরিবর্তন ঘটিয়া উঠে। (পৃ. ১)
