সেই সঙ্গে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল নীতিগুলিও গভীর ভাবে গেঁথে গেছে তার মনে। দেশের পুরনো সমাজব্যবস্থা যে কাম্য নয়, তার আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন, এই বিশ্বাস ইংরেজি-শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্তের মধ্যে ততদিনে প্রায় সর্বজনীন হয়ে গিয়েছিল। কথাটা মনে রাখা দরকার, কারণ উনিশ শতকের শেষদিকে এসে সমাজচিন্তার যে ধারাটিকে ‘সনাতনপন্থী’ বা ‘রক্ষণশীল’ বলা হয়, হিন্দুধর্মের পুনর্জাগরণ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত যে ধারা, তার নেতারাও যে প্রবলভাবে সংস্কারপন্থী এবং হিন্দুসমাজের আধুনিকীকরণের প্রবক্তা, এ-কথাটা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। তথাকথিত ‘উদারপন্থী’ আর ‘রক্ষণশীল’দের মধ্যে অন্য যা-ই তফাত থাকুক, পুরনো সমাজকে বদলে আধুনিক জগতের উপযোগী করে তুলতে হবে, এ-বিশ্বাস দুজনের মনেই সমান দৃঢ় ছিল।
উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের অসংখ্য গৌণ লেখকদের নিতান্ত মামুলি রচনা পড়লেও এই নতুন মূল্যবোধের কথা পাওয়া যাবে। সামাজিক কর্তৃত্বের বেলায় যেমন একটা নতুন ধারণা চালু হয়ে গিয়েছিল—সমদর্শিতা। ১৮৬৬ সালে তারাকৃষ্ণ হালদার নামে একজন বারাণসী থেকে নানা সামাজিক বিষয়ে একটি প্রবন্ধের বই লেখেন।”১১ নিঃসন্দেহে রক্ষণশীল হিন্দু। ‘যুবতীগণের প্রতি ব্যবহার বিষয়ক’ প্রবন্ধে তিনি লিখছেন, ‘কি গৃহমধ্যে কি অন্য স্থানে, কোন খানেই কোন যুবতী যেন একাকিনী অবস্থান করিতে না পান।’ (পৃ. ৬৯) অথচ তিনি পণপ্রথার বিরোধী, কুলীনবিবাহের বিরোধী। এই তারাকৃষ্ণ ‘রাজভক্তি বিষয়ক’ প্রবন্ধে লিখছেন,
পূৰ্ব্বকালে যখন এই দেশ হিন্দুজাতির শাসনাধীন ছিল তখন রাজগণের পক্ষপাতিতা দোষে জাতি বিশেষ অপর সমস্ত জাতির উপর সম্পূর্ণ প্রভুত্ব করিতেন, ঐ সকল জাতিকে স্বর্গ বা নরকগামী করণের কর্ত্তা ছিলেন। …যখন এই রাজ্য যবনদিগের হস্তে ছিল তখন তাঁহারা হিন্দুবর্গকে নাস্তিক ও অধার্মিকের শেষ বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়াছিলেন। স্বজাতি প্রজাবর্গের প্রতি যাবতীয় বিষয়েই অনুগ্রহ, হিন্দু প্রজাদিগের প্রতি সৰ্ব্বতোভাবেই নিগ্রহ করিতেন। …ব্রিটিস জাতির রাজনিয়মাবলীতে এ সকল দোষের লেশও নাই, তাঁহারা আপন জাতীয় ধর্ম্মোপদেষ্টাকে এবং এ দেশস্থ ডোমপ্রভৃতি যৎপরোনাস্তি নীচ ব্যক্তিকে বিচারকালে সমান দেখেন। …ঐ জাতির পক্ষপাতশূন্যতা গুণের অধিক প্রশংসা কি করিব? (পৃ. ১৩৪-৬)
এখান থেকে এক ধাপ এগিয়ে গেলেই পরের কথাটা পেয়ে যাচ্ছি। বর্তমান হিন্দু সমাজের যে জীর্ণ অধঃপতিত অবস্থা, তার কারণই মুসলমান শাসন। ১৮৭৬-এ ভোলানাথ চক্রবর্তী নামে একজন বক্তৃতা দিচ্ছেন:১২
যে দিন যবনের উষ্ণীষ বঙ্গ রাজ্যে প্রবেশ করে, সেই দিন হইতেই এদেশের দুর্ভাগ্য ও অবনতির সূত্রপাত হয়। নিষ্ঠুর যবনশাসনে এদেশ ক্রমশঃ উৎসন্ন হইয়া যায়। যেমন এক প্রবল বাত্যা আসিয়া বন উপবন ভগ্ন ও হতশ্রী করে, সেই রূপ নৃশংস দুরাচার যবন জাতি আসিয়া আমাদের জন্মভূমি বঙ্গভূমির সমুদায় সুখসৌভাগ্য বিনষ্ট করিয়াছিল। অজস্র অত্যাচার স্রোত সহ্য করিয়া—নিরন্তর নিপীড়িত হইয়া বঙ্গ সন্তানেরা নিতান্ত নিবীর্য ও হীনসাহস হইয়া পড়ে। ধৰ্ম্ম বিকৃত ভাব ধারণ করে। স্ত্রীশিক্ষা একেবারে রহিত হয়। যবনাক্রমণ নিবারণ জন্য স্ত্রীজাতিকে নিভৃত নির্জ্জন গৃহে রুদ্ধ করিয়া রাখা হইতে লাগিল। এক সময় দেশের এমনি দুরবস্থা ঘটিয়াছিল, যে, ধনীর ধন, মানীর মান ও সতীর সতীত্ব সমূহ বিপদের কারণ হইয়া উঠিয়াছিল। (পৃ. ১০)
জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের কাঠামোর অর্ধেকটা পেয়ে গেলাম এখানে। আদিতে জাতির ইতিহাস ছিল গৌরবের আলোয় উজ্জ্বল—ধন, বল, বিদ্যা, ধর্ম, সব দিক দিয়েই সভ্যতার চরম উৎকর্যে পৌঁছেছিল সে। এখানে জাতি বলতে কখনো বাঙালি, কখনো হিন্দু, কখনো আর্য, কখনো ভারতবর্ষীয়, যে-কোনও একটা বলা যেতে পারত, কিন্তু যুক্তির কাঠামোটা একই। তার পর এল জাতির অবক্ষয়ের যুগ। অবক্ষয়ের কারণ মুসলমান শাসন, অর্থাৎ জাতির পরাধীনতা। জাতীয়বাদী ইতিহাসের এই কাঠামোর বাকি অংশটা ভোলানাথ চক্রবর্তীর লেখায় পাচ্ছি না। কারণ জাতীয় সমাজের সংস্কার এবং পুনরুজ্জীবনের কথা বললেও, এই সংস্কারের সম্ভাবনা তাঁর মতে একান্তভাবেই ইংরেজ শাসনের ওপর নির্ভরশীল।
সকল বিষয়েরই সীমা আছে। যখন মুসলমানদিগের অত্যাচার নিতান্ত অসহ্য হইয়া উঠিল, তখন জগদীশ্বর তাহা হইতে পরিত্রাণের উপায় বিধান করিলেন। …যে দিন এদেশে বৃটিশ পতাকা প্রথম উড্ডীন হয়, সেই দিন হইতেই এদেশের পুনঃ সৌভাগ্যের সূত্রপাত হইয়াছে। বলুন দেখি, যদি এ পর্য্যন্ত যবনাধিকার অব্যাহত থাকিত, তবে আজ দেশের কি দশা ঘটিত? অতএব একথা মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করিতে হইবে যে পরমেশ্বরের মঙ্গলের জন্য ইংরাজ জাতিকে এদেশে আনয়ন করিয়াছেন। বৃটিশ অধিকারে যবনদিগের অত্যাচার নিবারিত হইয়াছে। …যবন শাসনের সহিত বৃটিশ শাসনের তুলনাই হইতে পারে না। অন্ধকার ও আলোকে যত অন্তর, দুঃখ ও সুখে যত প্রভেদ, যবন শাসন ও বৃটিশ শাসনে তদপেক্ষাও অধিক প্রভেদ প্রতীয়মান হয়। (পৃ.১১-২)
অবশ্য ভোলানাথ চক্রবর্তী না মানলেও, ১৮৭০-এর দশকে জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের যুক্তির বাকি অংশটুকুও যথেষ্ট চালু হয়ে গিয়েছে। তারিণীচরণ চট্টোপাধ্যায়ের ভারতবর্ষের ইতিহাস-এর অষ্টাদশ সংস্করণ বেরোয় ১৮৭৮ সালে।১৩ তারিণীচরণ (১৮৩৩-১৮৯৭) ছিলেন কৃষ্ণনগর কলেজের ছাত্র, সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক এবং সমাজ-সংস্কারক। তাঁর লেখা স্কুলপাঠ্য ইতিহাস আর ভূগোলের বই অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, ইতিহাসের প্রশ্নোত্তর ইত্যাদি নামে সমসাময়িক অন্য অনেক স্কুলপাঠ্য বই-এ দেখা যাচ্ছে তারিণীচরণেরই সংক্ষিপ্তসার। অনেক সময় হুবহু উদ্ধৃতি। এই বইটি থেকে ভারতবর্ষের ইতিহাসের নানা কাহিনী একটু বিস্তারিতভাবে উপস্থিত করতে চাই। তা হলে আজকের উগ্রহিন্দু প্রচারের মালমসলা জাতীয়তাবাদী ইতিহাস রচনার ভেতর তার জন্মলগ্ন থেকেই কীভাবে সঞ্চিত হয়ে এসেছে, তার একটা পরিচয় পাওয়া যাবে।
