‘জোর যার মুলুক তার’। এই অবধি কোম্পানির দেওয়ানত্ব গিয়া প্রকৃত পক্ষে রাজত্ব আরম্ভ হইল। সম্রাট সবল থাকিলে এই কর রহিত করা উপলক্ষে তুমুল কাণ্ড ঘটিত। কিন্তু এখন আর তাঁহাতে কিছুই ছিল না; সুতরাং হেস্টিংস যাহা মনে করিলেন তাহাই হইল। (পৃ. ৭০)
সিরাজউদ্দৌলার রাজত্ব সম্বন্ধে মৃত্যুঞ্জয়ের লেখায় যে সুস্পষ্ট ঘৃণার ভাব ছিল, কৃষ্ণচন্দ্রে তার কিছুই নেই। বরং সিরাজের কার্যকলাপের একটা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। যেমন ইংরেজরা যখন কলকাতার দুর্গ সংস্কার শুরু করল, সিরাজ তা ভেঙে ফেলার আদেশ দিলেন।
কোন্ রাজাই বা বিদেশীয় লোককে আপনার অধিকার মধ্যে দুর্গ নির্ম্মাণ করিতে দেন?…কোথা হইতে কতগুলা বণিক আসিয়া তাঁরই অধিকার মধ্যে থাকিয়া তাঁহারই আদেশ অমান্য করিতেছে, এ অবমাননা আর সহ্য হইল না; ক্রোধ উদ্বেল হইয়া উঠিল। (পৃ. ৩৮)
কিংবা অন্ধকূপ হত্যা।
সিরাজউদ্দৌলা কি অশুভক্ষণেই কলিকাতায় পদার্পণ করিয়াছিলেন, তিনি এই অন্ধকূপ-হত্যার বিন্দু বিসর্গও জানিতেন না, তাঁহার আজ্ঞানুসারে কিছু ইংরেজ বন্দী দিগের ঐ কারাবাস নির্দ্দিষ্ট হয় নাই, অথচ ইহা হইতেই তাঁহার সর্বনাশ উপস্থিত হইয়াছিল। নিতান্ত মদমত্ততা প্রযুক্ত তিনি মার্জ্জার ভ্রমে ব্যাঘ্র শরীরে হস্তাৰ্পণ করিয়াছিলেন। শেষে সেই অজ্ঞানতাদোষে স্বয়ং রাজ্যভ্রষ্ট ও প্রাণে নষ্ট হইয়া আপন বংশের দুর্দ্দশার একশেষ ঘটাইলেন। বলিতে কি, কলিকাতার এই অন্ধকূপ হত্যা ঘটাতেই ভারতভূমিতে ইংরেজ অভ্যুদয়ের সূত্রপাত হইয়াছিল। (পৃ. ৪০)
সিরাজের পতনের কারণ অধর্মাচরণ নয়, নিছক অজ্ঞানতা। আর সে অজ্ঞানতা কী? বেড়াল ভেবে বাঘের গায়ে হাত দেওয়া।
ইতিহাস এখন দৈবশক্তির লীলাক্ষেত্র কিংবা ধর্মাধর্মের যুদ্ধ থেকে নিছক ক্ষমতার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। ইংরেজ রাজত্বের সূত্রপাত এখন আর দৈবের অনির্বচনীয় মহিমা নয়। কোন রাজনৈতিক অবস্থায় ইংরেজের জয়লাভ অসম্ভব করে তোলা যেত, শিক্ষিত বাঙালি এখন তাই নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
যদি এদেশ এক জন প্রবল অধিপতির অধীন থাকিত, অথবা স্থানে স্থানে যাঁহারা প্রভু ছিলেন, তাঁহাদের পরস্পর একতা এবং প্রণয় থাকিত, তাহা হইলে ইংরেজরা এদেশে কদাপি ঈদৃশ প্রভাবশালী হইতে পারিতেন না, তাহা হইলে এদেশ অদ্যাপি মুসলমান রাজাদিগেরই অধিকৃত থাকিত। হয়ত এদেশে কেহই ইংরেজদিগের নামও শুনিতে পাইত না। (পৃ. ২১৪)
বই শেষ হচ্ছে ইংরেজ রাজত্বের সুফলের একটা ফিরিস্তি দিয়ে, কিন্তু তাতে যে রাজত্বলাভের নৈতিক দাবি প্রতিষ্ঠিত হয় না, সে ইঙ্গিতও কৃষ্ণচন্দ্র দিচ্ছেন বেশ খোলাখুলিই। ‘সে যাহা হউক, যে উপায়ে ইংরেজদিগের এই সুবিস্তীর্ণ রাজ্য উপার্জিত হইয়া থাকুক না কেন, বস্তুত তাঁহাদের দ্বারা এদেশের অশেষবিধ হিত সম্পাদিত হইয়াছে একথা অবশ্যই স্বীকার করিতে হইবেক।’ (পৃ. ২৩৮) জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছি আমরা।
১৮৭৬ সালে প্রকাশিত ক্ষীরোদচন্দ্র রায় চৌধুরির বই-এর১০ বিজ্ঞাপনেই লেখা থাকছে: ‘ইংরাজী ইতিহাসের অনুবাদ পাঠ করিয়া যাঁহাদিগের ভ্রান্তি জন্মিয়াছে তাঁহাদিগের জন্য এই পুস্তকখানা লিখিয়াছি।’ আধুনিক ইউরোপীয় জাতীয় ইতিহাস-রচনার সারমর্মটি ক্ষীরোদচন্দ্রের মনে কতটা দাগ কেটেছে তার প্রমাণ ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলির পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে তাঁর এই মন্তব্যটি:
ফরাসি ও ইংরাজেরা চিরদিন পরস্পরের বিদ্বেষী। ভারতবর্ষে মোগল পাঠানের কলহ যেমন প্রবাদ মধ্যে পরিগণিত হইয়া পড়িয়াছে, ইয়োরোপে ইংরাজ ও ফরাসির বিদ্বেষ সেই রূপ গণ্য হয়। সুতরাং ভারতবর্যেও যে তাহারা পরস্পরকে পীড়ন না করিয়া নির্ব্বিবাদে এক স্রোতের জলপান করিবে কেহ বিশ্বাস করে নাই। (পৃ. ১১৫) বই শেষ হচ্ছে এই মন্তব্য দিয়ে:
সামান্য বণিকভাবে ভারতবর্যে বাণিজ্য করিতে আসিয়া ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি ঘটনা স্রোতে বিংশতি কোটী প্রজার অধীশ্বর হইয়া উঠেন, এবং কোম্পানির অংশীদারেরা লক্ষপতি ও ক্রোরপতি হইয়া বিদেশীয় বিভিন্ন জাতির রীতি নীতির স্থাপয়িতা হইয়া দাঁড়ান। পৃথিবীর অন্য কোন দেশে এরূপ অমানুষী ঘটনা আর হয় নাই। (পৃ. ২১১)
৬
মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের লেখা আলোচনা করতে গিয়ে বলেছিলাম, তাঁর অবস্থান প্রজার অবস্থান। ক্ষেত্ৰনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্বন্ধেও একই কথা বলা যায়। কিন্তু এই দুই প্রজা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। সত্তর বছরের মধ্যে শিক্ষিত বাঙালি নামক জীবটি অনেক বদলে গেছে। ক্ষেত্রনাথের সময় সে নিজেকে ইউরোপের ‘মিডল ক্লাস’-এর অনুকরণে ‘মধ্যবিত্ত’ বলে পরিচয় দিতে শুরু করেছে। শুধু যে বিত্তের দিক দিয়েই সে মধ্যবর্তী, তাই নয়। সামাজিক কর্তৃত্বের ক্ষেত্রেও সে এখন মধ্যস্থের ভূমিকা নিয়েছে। যারা বিত্তশালী, সমাজের মাথা হিসেবে স্বীকৃত, তারা যে কর্তৃত্ব করার পক্ষে অযোগ্য—নতুন মধ্যবিত্ত এই অভিযোগ এনে হাজির করেছে সমাজের সামনে। অন্যদিকে যারা দরিদ্র, অত্যাচারিত, তাদের হয়ে বলার দায়িত্বটাও সে তুলে নিয়েছে নিজের ঘাড়ে। এখন মধ্যস্থ হওয়ার অর্থ, একদিকে শাসকবর্গের বিরোধিতা, অন্যদিকে প্রজাবর্গের নেতৃত্ব। প্রজা হয়েও ক্ষেত্ৰনাথের সমসাময়িক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত কিন্তু চৈতন্যের স্তরে অন্তত নিজেকে রাষ্ট্র চালনার উপযুক্ত বলে ভাবতে শুরু করেছে।
