১৮৭২-এর এক শিশুপাঠ বাঙ্গালার ইতিহাস-এ আবার পাচ্ছি৮ সেই ষড়যন্ত্র আর বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনী। লেখক ক্ষেত্ৰনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিচারে সিরাজ অত্যাচারী ছিলেন ঠিকই, কিন্তু অন্ধকূপ হত্যার জন্য তিনি দায়ী ছিলেন না। অথচ তাঁরই বিরুদ্ধে পাতা হল ষড়যন্ত্রের জাল। মীরজাফর সম্বন্ধে সিরাজ সন্দিহান ছিলেন। ‘তিনি সেনাপতি মীরজাফরকে কোরাণ স্পর্শ করাইয়া দিব্য করান। তাহাকে সেনাপতি “আমি কখন কৃতঘ্ন হইব না” এই কথা বলেন।’ (পৃ. ২০) মীরজাফর প্রতিশ্রুতি রাখলেন না, যুদ্ধক্ষেত্রে বিশ্বাসঘাতকতা করলেন।
মোহনলাল নামক নবাবের অন্য একজন সেনাপতি ঘোরতর যুদ্ধ করিয়াছিলেন। যদি এই যুদ্ধ আর কিছুক্ষণ চলিত, তাহা হইলে ক্লাইবকে নিশ্চয় হারিতে হইত। কিন্তু তৎকালে রাজলক্ষ্মী ইংরাজদিগের ভাগ্যে প্রসন্ন থাকায়, মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় নবাব পরাজিত ও ক্লাইব জয়ী হইলেন। (পৃ. ২২)
ক্ষেত্ৰনাথের ঘৃণা প্রধানত মীরজাফর ও মীরণের প্রতি। ‘মীরজাফর নিষ্ঠুর, নির্ব্বোধ, অর্থলোভী ও অকর্ম্মণ্য ছিলেন। তিনি নবাব হইয়া প্রধান প্রধান হিন্দুদিগের সর্ব্বস্ব হরণ মানস করেন।’ (পৃ. ২৭) ‘মীরণ অতি নরাধম ও নির্ব্বোধ এবং নিষ্ঠুর, সে এরূপ দুরাত্মা ছিল যে তার অত্যাচারে লোকেরা, সিরাজের সমুদায় কুব্যবহার ভুলিয়া যায়।’ (পৃ. ৩১)
মীরকাসিমের বেলাতেও সেই একই বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনী। মীরকাসিম যেমন
সকল জিনিষের মাশুল উঠাইয়া দিলেন। ইহাতে কি ইংরাজ, কি বাঙ্গালী সকলকেই সমান করা হইল, এবং পূৰ্ব্বে ইংরাজ ভিন্ন অপরাপর লোকদের ব্যবসাতে অনেক হানি হইত, এরূপ হওয়াতে তাহাদের লাভ হইতে লাগিল। ইহাতে ইংরাজেরা তাঁহার উপর রাগিয়া উঠিলেন ও যুদ্ধ করিতে ইচ্ছুক হইলেন।…মীরকাসিমের যে সৈন্য বাঙ্গালার সমুদায় রাজার সৈন্য অপেক্ষা উৎকৃষ্ট, তাহারা যে কোন যুদ্ধে জয় লাভ করিতে পারিল না, অবশ্যই ইহার কোন গুপ্ত কারণ ছিল, তাহার কোন সন্দেহ নাই। গার্গিনের বিশ্বাসঘাতকতাই তাহার প্রধান কারণ। (পৃ. ৩৪-৫)
ওদিকে দিল্লির সম্রাটের অবস্থা তখন করুণ।
সম্রাট এই সময়ে বড় দুরবস্থায় পড়িয়াছিলেন, এমনকি, তাঁহার নিজের রাজধানী পর্য্যন্ত পরের হস্তগত ছিল। বসিবার সিংহাসন ছিল না। ইংরাজদিগের খানা খাইবার টেবেল এক্ষণে তাঁহার সিংহাসন হইল। সমুদায় ভারতবর্ষের সম্রাট তাহাতে বসিয়া ইংরাজদিগকে তিন প্রদেশের দেওয়ানীর সহিত তিন কোটি প্রজা অৰ্পণ করিলেন। যে দিল্লীর সম্রাটের জাঁকজমকের পরিসীমা ছিল না, যাঁহার প্রতাপে সমুদায় ভারতবর্ষ কম্পিত হইয়াছিল, এক্ষণে সেই সম্রাটের এরূপ অবস্থা অবশ্যই দুঃখজনক তাহার আর সন্দেহ নাই। (পৃ. ৪১)
শুধু রাজ্য দখলেই নয়, রাজ্যচালনাতেও ইংরেজরা প্রায়শই চক্রান্ত আর বলপ্রয়োগের রাস্তা নিত।
ক্লাইব এইরূপে রাজ্যে সুনিয়ম স্থাপন করায়, দেশীয় দিগের উপর যে দৌরাত্ম্য হইতেছিল তাহার অনেক কম হইয়া আসে। ইহার পূর্ব্বে ইংরাজেরা দেশীয় লোকদিগের উপর এমনি অত্যাচার করিয়াছিলেন যে, তাহাতে সমুদায় বাঙালিরা ইংরাজদের নাম শুনিয়া ঘৃণা করিতেন!…ক্লাইব চলিয়া গেলে, কোম্পানির কার্য্যের আবার গোলযোগ ঘটিতে লাগিল। (পৃ. ৩৯)
নন্দকুমারের বিরুদ্ধে চক্রান্তের জন্য হেস্টিংস ‘সকলেরই নিকট এবং ইতিহাস মধ্যে অতিশয় ঘৃণিত হইয়া রহিয়াছেন।’ (পৃ. ৫৯) ১৮৫৭-তে সিপাহিরা যেমন ইংরেজদের ওপর অত্যাচার করেছিল, ‘বিদ্রোহ শান্তির সমকালে খ্রীষ্টধৰ্ম্মাভিমানী ইংরাজেরাও বিপক্ষদিগের অপকারের প্রতিশোধ ও আপনাদের হিংসাবৃত্তি চরিতার্থ করিবার জন্য ফাঁসী কাষ্ঠে বদ্ধ মৃতদেহের অভ্যন্তর হইতে যকৃত বাহির করিয়া অগ্নিতে দগ্ধ করেন।’ (প. ৯৮)
কিন্তু সিপাহিদের বিদ্রোহ দমন করার পরেও যে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হল, তা নয়।
কোন কালেই গরিবের ও দুৰ্ব্বলের মা বাপ নাই। সকল স্থানের গোলবোগ চুকিয়া গেলে, বাঙ্গালায় একটী হুলস্থূল কাণ্ড ঘটিয়া উঠিল। ঐ সময়ে বাঙ্গালার নীল প্রধান দেশে নীলকর সাহেবদের কার্দ্দানী বাড়িতে লাগিল। তাহারা গরিব প্রজাদিগের প্রতি যেরূপ নিষ্ঠুর ব্যবহার করিয়াছিল, তাহাতে তাহাদিগকে কখনোই মানুষের মধ্যে গণনা করা যাইতে পারে না। (পৃ. ১০০)
সত্যি কথা বলতে কি, ইংরেজ রাজত্বের ইতিহাস লিখতে গিয়েই কিন্তু ইংরেজিশিক্ষিত বাঙালির ইতিহাসচিন্তা থেকে ঈশ্বর, ধর্ম, ন্যায়নীতি ইত্যাদি মাপকাঠিগুলো লোপ পেয়ে গেল। চূড়ান্ত নীতিহীনতার আশ্রয় নিয়েও যে ক্ষমতা দখল এবং ভোগ করা যায়, বাংলার সাম্প্রতিক ইতিহাস যেন সেই সত্যটাকেই হাজির করে দিল ইউরোপীয় শিক্ষায় আলোকপ্রাপ্ত বাঙালির কাছে।
১৮৭০-এ প্রকাশিত কৃষ্ণচন্দ্র রায়-এর জনপ্রিয় পাঠ্যবই-এর৯ নবম সংস্করণে দেখছি ইংরেজের রাজত্ব লাভের কাহিনীটিকে সম্পূর্ণ নীতিবিগর্হিত ক্ষমতার লড়াই হিসেবে উপস্থিত করা হয়েছে। যেমন উমিচাঁদের সঙ্গে ক্লাইভের প্রতারণা: ‘ক্লাইবের এই কাৰ্যটী অতিশয় গর্হিত বলিয়া সকলেই তাঁহার নিন্দা করিয়া থাকেন। কিন্তু তাঁহার মতে শঠের সহিত শঠ্যতা করায় কোন পাতিত্য নাই “শঠে শাঠ্যং সমাচরেৎ”।’ (পৃ. ৪৩-৪)
অথবা ১৭৭২ সালে সরাসরি গভর্নর কর্তৃক রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থার প্রবর্তন :
