যবে রূম আমল করিবেন সে রাণি।
মক্কা ও মদিনা বাকি রহিবেক জানি ॥
হাহাকার রাজ্যেতে হইবে উৎপাত।
সবজাত ভাঙিয়ে হইবে এক জাত ॥
কিন্তু তার পর নানা প্রলয়ংকর ঘটনার মধ্য দিয়ে আবার সুধর্মের প্রতিষ্ঠা হবে।
উত্তরিবে ইসানবি হইতে আকাশ।
পুনঃ মুসলমানি মত পাইবে প্রকাশ ॥
পূর্ব্ব কি পশ্চিম আদি উত্তর দক্ষিণ।
তবেসে হইবে খণ্ড প্রলয়ের চিন ॥
আয়াত কুদ্দিয়াতে এহেন নিরূপণ।
হাদিস হইতে যাহা উত্তম গণন ॥
পশ্চিমেতে উদয় হইলে দিবাকর।
তোবাদ্বার আবদ্ধ জানহ তদন্তর ॥
হাতেক দো উপরে উঠিয়া দিনমণি।
অস্ত হইবেক দীর্ঘ হইবে রজনি ॥
হবে রাত্র ছ সাত রাত্রের পরিমিত।
জাগিয়া ভাবিয়া লোক হইবে নিদ্রিত ॥…
হিজিরি সন তেরশত হইলে পূরণ।
চৌদ্দশত না পূরিতে জান সৰ্ব্বজন ॥
দেখিবেক যে সকল রহিবে জীবিত।
অধিক আশ্চৰ্য্যকাণ্ড হবে পৃথিবীত ॥
এর সঙ্গে তুলনীয়: ‘তাহার পর পরিনাগার্জুন নামে এক রাজা হইবেন তাহার শক এই কলির ৮২১ বৎসর শেষ থাকা পর্য্যন্ত থাকিবে তাহার পর সম্ভল দেশে গৌত-ব্রাহ্মণের ঘরে কল্কিদেবের অবতার হইবে…’ ইত্যাদি। ইতিহাসবোধের খুব একটা পার্থক্য আছে কি?
৫
পার্থক্যটা তা হলে এল কখন? স্বভাবতই ইংরেজি শিক্ষা, এবং আরও বিশেষ করে ইউরোপের ইতিহাস, রাষ্ট্রনীতি, সমাজনীতি ইত্যাদির চর্চা শিক্ষিত বাঙালির মধ্যে যখন চালু হল, তখনই ইতিহাসের গল্প বলার পুরনো ছকটা ভেঙে একটা নতুন ছক তৈরি হতে শুরু করল। তা ছাড়া আধুনিক ইউরোপীয়ের ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ভারতবর্ষের ইতিহাসটা কেমন দেখাবে, সেটা ইউরোপীয় লেখকরা নিজেরাই ততদিনে আঁকতে শুরু করে দিয়েছেন। আঠারো-উনিশ শতকের সন্ধিক্ষণ থেকে যখন ইউরোপীয় পণ্ডিতদের মধ্যে প্রাচ্যবিদ্যা চর্চা চালু হল, তখন থেকেই আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রকরণ অবলম্বন করে ভারতবর্ষের সমাজ ও সভ্যতার ইতিহাস পুনরুদ্ধার করার কাজ শুরু হয়ে গেল।
ইংরেজি-শিক্ষিত বাঙালি প্রাচ্যবিদ্যা চর্চায় গোড়া থেকেই উৎসাহী ছিল। কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে শুরু করে বহু প্রতিষ্ঠান সেই উৎসাহের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। কিন্তু মজার কথা হল, ইংরেজের লেখা ভারতবর্ষের ইতিহাস কিন্তু শিক্ষিত বাঙালি মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারল না। প্রাচ্যবিদ্যার ফসল সে কিছু কিছু নিল; অনেক কিছুই নিল না। যা নিল, তাও সে সাজাবার চেষ্টা করল সম্পূর্ণ নতুন একটা ছকে। সেই ছকের সে নাম দিল ‘জাতীয় ইতিহাস’। এই জাতীয় ইতিহাস রচনার প্রচেষ্টার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আমাদের জাতীয়তাবোধেরও ইতিহাস।
এই প্রসঙ্গে উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের দিকপাল ব্যক্তিদের রচনার সঙ্গে আমরা যথেষ্ট পরিচিত। অপেক্ষাকৃত অল্পখ্যাত লেখকদের কিছু উদাহরণ দেব এখানে। এঁদের লেখায় মৌলিকতা কম। বরং পণ্ডিতদের মধ্যে প্রচলিত ধারণাগুলিকে বৃহত্তর পাঠকগোষ্ঠী, বিশেষ করে বিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটিই এঁরা আরও ভাল পারতেন। সুতরাং ব্যাপক অর্থে শিক্ষিত বাঙালির ধ্যানধারণার একটা ছবি এই জাতীয় বই থেকে পাওয়া যাবে, এটা মনে করা অসঙ্গত নয়।
১৮৫৭-৫৮ নাগাদ অনেকগুলো স্কুলপাঠ্য বাংলা ইতিহাসের বই প্রকাশিত হয়। সম্ভবত নবপ্রতিষ্ঠিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এনট্রান্স পরীক্ষার পাঠ্যসূচীর দিকে দৃষ্টি রেখে স্কুলের মাঝারি ক্লাসের জন্য লেখা হয়ে থাকবে এই বইগুলো। ততদিনে মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের রাজাবলি প্রকাশিত হবার পর অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেছে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সাহেব ছাত্রদের বাংলা ভাষা ও সেইসঙ্গে দেশীয় ইতিহাস শেখাবার জন্য লেখা হয়েছিল সেই বই। এখন লেখা হতে লাগল বাঙালি ছাত্রদের শেখাবার জন্য সাহেবদের লেখা ভারতবর্ষের ইতিহাসের বঙ্গানুবাদ।
মার্শম্যানের বাংলার ইতিহাসের একটি খণ্ড অনুবাদ করেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। অপর অংশটি বিদ্যাসাগরের অনুরোধে অনুবাদ করেন রামগতি ন্যায়রত্ন।৬ মূল ইংরেজি বই-এর প্রভাব ফুটে উঠেছে এর ভাষাতেও। ‘সুলতান সুজা বাঙ্গালার গভর্ণর হইয়া আগমন করিলেন’, ‘মুরশিদ জামাতাকে আপনার ডেপুটি করিয়া উড়িষ্যাতে পাঠাইয়া দেন’—প্রশাসনিক শব্দের ব্যবহারই জানিয়ে দিচ্ছে যে এই ইতিহাসের রচয়িতা ইংরেজ। কিন্তু তা সত্ত্বেও আলিবর্দি খাঁ-র আমলে মারাঠা আক্রমণের বিবরণ দিয়ে বই যেখানে শেষ হচ্ছে, সেখানে কিন্তু রামগতি পরবর্তী ইতিহাসের আকস্মকিতার কিছুটা আভাস দিয়ে রাখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন।
তৎকালে [মহারাষ্ট্রীয়দিগের] এতাদৃশ প্রাদুর্ভাব হইয়াছিল যে তাঁহারাই এই দেশের অধীশ্বর হইবেন বলিয়া সকলে সম্ভাবনা করিত। কিন্তু দৈবের কি অনির্ব্বচনীয় মহিমা! যাঁহারা এই দেশে কেবল সামান্য রূপ বাণিজ্য করিতে আসিয়াছিলেন; মধ্যে মধ্যে যাঁহাদের এদেশ পরিত্যাগ করিয়া যাইবার সম্পূর্ণরূপ সম্ভাবনা হইত; যাঁহাদের এদেশের রাজা হওয়া স্বপ্নেরও অগোচর ছিল সেই ইঙ্গরেজরা আলীবর্দ্দির সিংহাসনারূঢ় সিরাজউদ্দৌলাকে রাজ্যভ্রষ্ট করিয়া ক্রমে ক্রমে ভারতবর্ষের প্রায় একেশ্বর হইয়া উঠিয়াছেন। (পৃ. ১৭৯-৮০)
১৮৫৯-এ যা দৈবের মহিমা, তার দু-বছর আগেই এক চরম সংকটমুহূর্তে যে ইংরেজ রাজত্বের প্রতি শিক্ষিত বাঙালি জানিয়েছিল পরিপূর্ণ আস্থা, ১৮৬৯-এ এক ‘মেড ইজি’ গোছের বইতে দেখছি৭ সেই ইংরেজ রাজত্ব প্রতিষ্ঠার উপায় সম্বন্ধেই সন্দেহ প্রকাশ করা হচ্ছে। ‘ক্লাইব কিরূপে জয়ী হল?—যদি মীরজাফর কৃতঘ্নতা পূৰ্ব্বক ক্লাইবকে বঞ্চনা না করিতেন, তাহা হইলে ক্লাইবের জয়লাভ সহজ হইত না।’ (পৃ. ১১০-১) অথবা পরবর্তী ইংরেজ শাসনকর্তাদের ন্যায়নিষ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন: ‘নন্দকুমারের প্রাণবধ কি ন্যায়ানুসারে বিহিত হইয়াছিল?—তাঁহার অপরাধ কোন মতেই প্রাণদণ্ডের উপযুক্ত নহে, কেবল দুরাচার হেস্টিংসের অন্যায় অনুরোধে প্রধান জজ ইলাইজা ইম্পি ঐ মহাপাপের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন।’ (পৃ. ১২৬-৭)
