ঈশ্বরেচ্ছার সহকারী হলেন মীরন, সিরাজ তাঁর দুষ্কর্মের ফল ভোগ করলেন। কিন্তু মীরনের পরিণাম কী হল?
তদনন্তর নবাব মীরণ আজীমাবাদ হইতে মুরশিদাবাদে আসিতেছেন পথে রাজমহল মোকামে নবাব সিরাজদ্দৌলার সঙ্গে নিমখারামী করার ফলস্বরূপ বজ্রাঘাতে মরিলেন। এইরূপে নবাব মীরণ মরিলে পর তাহার কবরের ওপরেও দুইবার বজ্রাঘাত হইল। (পৃ. ২৮১)
আর মীরজাফর? ‘এইরূপে নবাব জাফরালী খাঁ পুনর্বার দুই বৎসর সুবেদারী করিয়া সিরাজদ্দৌলার সঙ্গে নিমখারামীর ফল গলৎকুষ্ঠ রোগে অতিশয় ব্যামোহ পাইয়া মরিলেন।’ (পৃ. ২৮৯)
ইতিহাসের প্রধান শক্তি দৈব। তার ক্রিয়ায় শেষ পর্যন্ত জয় হয় ধর্মের। এই বিশ্বাস নিয়েই মৃত্যুঞ্জয় বাংলার ইতিহাসের সাম্প্রতিকতম পর্বের কথা বলে তাঁর কাহিনী শেষ করছেন। তখন তাঁর অবস্থান কোম্পানিরূপ বৃক্ষের একেবারে নীচে আলবালের ভেতর—সেই কোম্পানি যে শরণাগতের প্রতিপালনের দায় কাঁধে নিয়ে ধর্মপতাকা উড়িয়ে পলাশির যুদ্ধ জিতেছে।
এইরূপে নন্দবংশজাত বিশারদ অবধি শাহ আলম বাদশাহ পর্যন্ত ও মুনইম খাঁ নবাব অবধি নবাব কাসমলী খাঁ পৰ্য্যন্ত কোন কোন সম্রাট রাজারদের ও নবাবদের ও তাঁহারদের চাকর লোকেরদের স্বামিদ্রোহাদি নানাবিধ পাপেতে এই হিন্দুস্থানের বিনাশোন্মুখ হওয়াতে পরমেশ্বরের ইচ্ছামতে ঐ হিন্দুস্থানের রক্ষার্থ আরোপিত কম্পানি বাহাদুরের অধিকার রূপ বৃক্ষের পুষ্পিতত্ত্ব ও ফলতত্ত্বের সমাবধায়ক যে বড় সাহেব তৎকর্ত্তৃক ঐ কম্পানি বাহাদুরের অধিকার রূপ বৃক্ষের আলবালতে নিরূপিত পাঠশালার পণ্ডিত শ্রীমৃত্যুঞ্জয় শর্মাকর্তৃক গৌড়ীয় ভাষাতে রচিত রাজতরঙ্গ নামে গ্রন্থ সমাপ্ত হইল। (পৃ. ২৯৪-৫)
মনে রাখা যাক, ঈশ্বরেচ্ছায় কোম্পানির অধিকার লাভ। উদ্দেশ্য প্রজার প্রতিপালন। সেই উদ্দেশ্য সাধিত না হলে, প্রজাপালনের পরিবর্তে উৎপীড়ন হলে, দৈবশক্তির ক্রিয়ায় রাজ্যাধিকার আবার অন্যের হাতে ন্যস্ত হবে, আবার ধর্মের জয় হবে।
৪
আধুনিক ইউরোপীয় ইতিহাসবোধ শিক্ষিত বাঙালির মনে গেঁথে যাওয়ার আগে পর্যন্ত এরকমই ছিল ঐতিহাসিক স্মৃতির গড়ন। মৃত্যুঞ্জয়ের রচনায় এই স্মৃতির একটা বিশেষ ধরনের প্রকাশ ঘটেছে যা অষ্টাদশ শতাব্দীর বাঙালি ব্রাহ্মণ-সমাজে প্রচলিত ধ্যানধারণার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রাক-ব্রিটিশ যুগের মুসলমান লেখকদের ইতিহাসচিন্তাও কি একই রকম ছিল? পাঠান বা মুঘল শাসকশ্রেণীর সঙ্গে যুক্ত দরবারের ঐতিহাসিকদের কথা এখানে উঠছে না, কারণ সে-সব তারিখ-সাহিত্য বাংলায় লেখা হতো না। বাঙালি মুসলমান লেখকদের মধ্যে ভারতবর্ষ বা বাংলার রাজারাজড়ার ইতিহাস নিয়ে যে-ধরনের রচনা প্রচলিত ছিল, তার একটা নমুনা দিলে দেখা যাবে যে ইতিহাসে দৈবশক্তির প্রভাব, কৃতকর্মের প্রতিফল এবং পরিশেষে ধর্মের জয়, এই লক্ষণগুলি সেখানেও সমানভাবেই উপস্থিত। নমুনাটির ছাপার সময় অবশ্য অনেক পরে, ১৮৭৫ সালে, কিন্তু পূর্ববঙ্গের গ্রামীণ কবিদের লেখা পুঁথিসাহিত্যের আদলটি এখানে এতই স্পষ্ট এবং ইউরোপীয় ইতিহাসশিক্ষার প্রভাব এমনই অনুপস্থিত যে ধরে নিতে অসুবিধা নেই, বরিশালের কবির ব্যবহৃত ‘দীল্লির রাজাদির নাম’ বিবৃত করার ছকটি অনেক দিনের প্রচলিত একটি ছক।৫ ‘শ্ৰীযুক্ত মুন্সী আলিমদ্দিন দ্বারায় বিরচিত নিবাস রুকন্দী থানে মেহেন্দিগঞ্জ’ এই তালিকাটি শুরু হচ্ছে এইভাবে :
দীল্লিনাম কিহেতু হইল হিন্দুস্থান।
আদ্যন্ত নৃপতি গণ নির্ণয় বিধান ॥
এই নির্ণয় কিন্তু হিন্দু লেখকের পক্ষে করা সম্ভব নয়:
হিন্দুগণ চৌযুগী যে, কহয় তাহারে।
সৰ্ব্বত্রে মরম এরা বুঝিবারে নারে ॥
সত্য ত্রেতা দ্বাপরাদি কলি চারিযুগ।
হিন্দুতে রাজত্ব তথা করে সুখভোগ ॥
এই মুখবন্ধের পর ‘সাহাআলম বাহাদুর বাদসাহেগাজী’ পর্যন্ত ৫৯ জন বাদশাহের নামের তালিকা। কেবল নামেরই তালিকা; কোনও ঐতিহাসিক ঘটনা বা বাদশাহ সম্পর্কে কোনও মন্তব্য, কিছুই নেই। তারপর ঘটল দৈবের এক আশ্চর্য কাণ্ড।
দৈবেতে ইংরাজ আইলেন এ আলয়।
করিলেন নবাবেরে যুদ্ধে পরাজয় ॥
ইংরাজ লইল রাজ্য বেশির পাইয়া।
তদবধি রাজত্ব মহারাণী ভিক্টোরিয়া ॥
কুমার সিংহের দফা সারিয়ে কোম্পানি।
ইজারা বর্খাস্তে এসে খাস মহারাণী ॥
১৮৫৭-র সব চেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা কুঁয়ার সিং-এর বিদ্রোহ দমন, এটাও বেশ আশ্চর্যের। এর পর মহারাণীর রাজত্বের স্তুতি এবং আধুনিক শিল্পের অদ্ভুত সব কাণ্ড-কারখানার ফিরিস্তি।
সাশিতের সীমা বিচারের একশেষ।
যাঁহার আমলে নাহি প্রজাদের ক্লেশ ॥
আছিল কড়ির চল দিল উঠাইয়া।
পয়সা হতে যথা যেই লইছে কিনিয়া ॥
ডাকেতে চালায় লোকে খবরাখবর।
গ্যাসের বাতিতে আলো করিল সহর ॥
আগ্বোটে মানিল হারি পিনিস্ আর নায়।
রেলেতে সপ্তাহ পথ দণ্ডকেতে যায় ॥
কলিকাতা বসিয়ে বিলাতে কে কি করে।
পলকেতে পায় তত্ত্ব তারের নির্ভরে ॥
ন্যায় বিচারে কার অন্যায় যদি হয়।
অপর আফিসে তাহা শুধরিয়ে লয় ॥
কিন্তু এমন যে সুশাসিত মহারাণীর রাজত্ব, তার পরমায়ু কতদিন?
প্রজাদের সুভাগ্যে রাজত্ব মহারাণী।
পরেতে প্রজার ভাগ্যে কি হয় না জানি ॥
বিশেষ করে ইংরেজরা যদি তুরস্ক অধিকার করে বসে, তা হলে এক সাংঘাতিক কাণ্ড ঘটবে।
