ইনি মহম্মুদী মতে অতি বড় তৎপর হইলেন। আর প্রধান প্রধান অনেক দেবস্থান নষ্ট করিলেন। হিন্দুরদের মতে সূৰ্য্যার্ঘ্য ও গণেশপূজাদি দেবকৃত্য সকল বাদশাহি কিল্লার মধ্যে অকবর অবধি নিয়মিত ছিল যে সকল আইনের মধ্যে অনেক আইনের অন্যথা করিয়া স্বকপোলরচিত অনেক আইন জারি করিলেন। (পু. ২১৪)
কিন্তু সেইসঙ্গে আবার একথাও লিখছেন:
ইনি প্রধান প্রধান অনেক দেবস্থানের ব্যাঘাত করিয়াছিলেন কিন্তু জ্বালামুখী ও লছমনবালাতে বিলক্ষণ প্রতিফল পাইয়া তাঁহারদিগকে মানিয়া সেবার্থে অনেক টাকার ভূমি নিযুক্ত করিয়া দিয়াছিলেন। পরে ঐ আওরঙ্গাবাল ১২ বার বৎসর থাকিয়া এক ব্রাহ্মণের শাঁপে বিকৃত শব্দ করিতে করিতে মরিলেন। (পৃ. ২২১)
রাজা যেখানে ঈশ্বরপ্রেরিত, ঈশ্বরের অনুগ্রহেই যেখানে তাঁদের রাজ্যপাটে অধিকার, সেখানে রাজচরিত্রের মতিগতি বিচার করা মোটামুটিভাবে ঈশ্বর আর রাজাদের মধ্যেকার ব্যাপার। সাধারণ প্রজার সেখানে একমাত্র ফলভোগ করা ছাড়া কোনও ভূমিকা নেই। অবশ্য ভাল রাজা আর মন্দ রাজার প্রভেদ প্রজা জানে, কারণ সুশাসন কিংবা অপশাসনের ফল সে-ই ভোগ করে। সুতরাং আকবরের মতো মহান সম্রাটের সে গুণগান করে। আবার আওরঙজেব যখন তাঁর দুষ্কর্মের ফলস্বরূপ ‘ব্রাহ্মণের শাঁপে বিকৃত শব্দ করিতে করিতে’ মারা যান, সে-গল্প বলতে বলতে প্রজা যেন দেবরোষের কঠোরতায় খানিক শিউরে উঠে শেষ পর্যন্ত ধর্মের জয় সম্বন্ধে আশ্বস্তই হয়। কিন্তু শাসনকার্যের অনুষ্ঠানের সঙ্গে সে কখনও নিজেকে জড়ায় না, রাজার জায়গায় নিজেকে বসাবার কথা ভাবতেই পারে না। রাজত্বের ইতিহাসে সে নিজের ইতিহাস খোঁজে না। ‘কীর্তিমন্ত পূর্ব্বপুরুষগণের কীর্ত্তি’ বর্ণনা করার মধ্য দিয়ে যে সমগ্র জাতির ইতিহাস প্রকাশ করা যায়, এমন কথা মৃত্যুঞ্জয়ের আদৌ বোধগম্য হত বলে মনে হয় না। কয়েক হাজার বছরের রাজপুরুষদের বিবরণ দিতে গিয়ে তাঁর নিজের অবস্থান একটিই—স্থির এবং অপরিবর্তনীয়। সে অবস্থান প্রজার অবস্থান। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে তিনি পৃথ্বীরাজের অপকর্মের প্রতিফল যেমন বর্ণনা করেছেন, তেমনি আকবরের গুণপনাকে ধন্য ধন্যও করেছেন। কিন্তু স্বজাতীয় অথবা বিজাতীয় বলে পৃথ্বীরাজ কিংবা আকবরের কৃতকর্মের ঐতিহাসিক দায় তাঁর ওপর এসে বর্তাতে পারে, এমন সম্ভাবনা তাঁর চিন্তাতেও আসেনি। রাজাবলি জাতীয় ইতিহাস নয়, কারণ ইতিহাসের কর্তা এখানে রাজা এবং দৈবশক্তি; কোনও জাতীয় ঐক্যবন্ধনের সূত্র ধরে ঐতিহাসিকের নিজস্ব চৈতন্য ইতিহাসের কর্তার স্থানটি এখানে দখল করে নিতে পারে নি। বঙ্কিম যে জাতীয় ইতিহাসের কথা বলবেন, তার রচয়িতা যেমন ‘তুমি, আমি, সকলে’, সে-ইতিহাসের কর্তাও তেমনি ‘তুমি, আমি, সকলে’। এই নতুন ইতিহাসবোধে আলোকপ্রাপ্ত হওয়ার সৌভাগ্য মৃত্যুঞ্জয়ের হয়নি। তাই বাঙালি ব্রাহ্মণ প্রজার একান্ত বিশিষ্ট অবস্থান থেকেই তিনি রাজারাজড়ার কাহিনী বলে গেছেন।
বাংলার সাম্প্রতিক ইতিহাসের গল্প শোনাবার সময়ই মৃত্যুঞ্জয়ের অবস্থানটি সব চেয়ে স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে। মৃত্যুঞ্জয়ের জন্ম পলাশির যুদ্ধের সামান্য পরে, সুতরাং সেই সময়কার ইতিহাস তাঁর বাল্য-যৌবনের জনশ্রুতি। সিরাজউদ্দৌলার অত্যাচার সম্বন্ধে তাঁর ঘৃণা প্রবল। ‘বিশিষ্ট লোকেরদের ভার্য্যা ও বধূ ও কন্যা প্রভৃতিকে জোর করিয়া আনাইবাতে ও কৌতুক দেখিবার নিমিত্তে গর্ভিণী স্ত্রীরদের উদর বিদারণ করানেতে ও লোকেতে ভরা নৌকা ডুবাইয়া দেওয়ানেতে দিনে দিনে অধৰ্ম্ম-বৃদ্ধি হইতে লাগিল।’(পৃ. ২৬৮-৯) সিরাজ যখন রাজা রাজবল্লভের ‘জাতিধ্বংস করিতে উদ্যত হইলেন’, তখন রাজবল্লভ কলকাতায় ইংরেজদের শরণাপন্ন হলেন। ইংরেজরা তাঁকে নবাবের হাতে তুলে দিতে রাজি হল না। তখন ‘নবাব সিরাজদ্দৌলা কম্পানি বাহাদুরের কুঠী ও কলিকাতা শহর লুট করিয়া আপন সৰ্ব্বনাশের হেতু করিয়া মুরশিদাবাদে [গেলেন]।’(পৃ. ২৭০) ইংরেজরা সাময়িকভাবে কলকাতা ত্যাগ করতে বাধ্য হল। এর পরের কাহিনী মৃত্যুঞ্জয়ের কথাতেই শুনুন:
[সাহেব লোকেরা] পুনরায়…আসিয়া কলিকাতা শহরের লুটেতে মহাজন ও মুদি বকালি গৃহস্থ প্রভৃতি লোকেরদের মধ্যে যাহার যে ক্ষতি হইয়াছিল তাহার যে যেমন জায় করিয়া দিলেক তাহাকে তেমনি বেবাক দিয়া খ্বাজে পিৎরুস আরমানি দ্বারা মহারাজ দুর্লভরাম ও ফৌজ বকসী জাফরালী খাঁ ও জগৎ সেঠ মহতাবরায় ও তাঁহার ভ্রাতা মহারাজ স্বরূপচন্দ্র প্রভৃতি কথক প্রধান লোকেরদের সহিত সাহিত্য করিয়া অর্থ ও কিঞ্চিৎ সৈন্য সংগ্রহ করিয়া শরণাগত প্রতিপালনরূপ ধর্ম্মতাকা উঠাইয়া যুদ্ধার্থে পলাশিতে গিয়া উপস্থিত হইলেন। (প. ২৭১)
যুদ্ধে যা হবার তা তো হল। সিরাজ যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালালেন। পরে ধরা পড়লেন।
তাহার পর ঐ জাফরালী খাঁর পুত্র মীরণ সাহেব লোকেরদিগকে ও মহারাজ দুর্লভরাম প্রভৃতিকে সম্বাদ না দিয়াই নবাব সিরাজদ্দৌলার মৃত্যু ভয়েতে নানাপ্রকার কাতরোক্তি না শুনিয়া আপন হস্তে নবাব সিরাজদ্দৌলাকে খণ্ড খণ্ড করিয়া ঐ ছিন্ন-শরীর হাতির ওপর চড়াইয়া শহর ভ্রমণ করাইয়া ঈশ্বরেচ্ছামতে নবাব মহাবৎজঙ্গের আপন মুনিবের পুত্র অথচ আপন মুনিব নবাব সরফরাজ খাঁকে কপটে মারিয়া নবাব হওয়ার ও অলীভাস্কর প্রভৃতি মহারাষ্ট্রেরদের সরদার লোকেরদিগকে কপটে কাটাইবার ও স্বয়ং সিরাজদ্দৌলার বলাৎকারে পরস্ত্রীদিগের আনয়ন প্রভৃতি দৌরাত্ম্যের প্রতি ফল লোকতঃ প্রকাশ করিল। (পৃ. ২৭৬)
