আবার মনে করিয়ে দিই, রাজবংশের পত্তন হয় ঈশ্বরেচ্ছায়। ধর্মের প্রতি বিশ্বস্ত থাকলে তবেই সেই রাজত্ব বজায় থাকে। নরমাংস ভক্ষণ এবং পিতৃহত্যার মতো চরম পাপাচারের দোষ লেগেছিল চৌহান রাজবংশে। পৃথ্বীরাজ যে ঈশ্বরের বিরাগভাজন হয়েছেন তার প্রমাণ পাওয়া গেল যজ্ঞের আসরে। সুতরাং মুহম্মদ ঘুরির যুদ্ধজয় এবং ‘যবন রাজত্ব’-র প্রতিষ্ঠা একান্তই ঈশ্বরের ইচ্ছায় সম্পন্ন ঘটনা: ‘পুরুষ ঈশ্বরেচ্ছার ওপর প্রবল নয় কিন্তু তাহার সহকারী বটে ঈশ্বরেচ্ছা সহকৃত পুরুষ কাৰ্যসাধক হয়’। মৃত্যুঞ্জয়ের অর্ধশতাব্দী পর যখন পুরাণেতিহাস বর্জন করে দস্তুরমতো ইতিহাস লেখা হবে, তখন কিন্তু থানেসরের যুদ্ধের এই বিবরণ আপাদমস্তক বদলে যাবে। ইংরেজি-শিক্ষিত ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা ঈশ্বরেচ্ছাকে অত সহজে মেনে নেবেন না।
তবে রাজার অধর্মাচরণের কারণ সম্বন্ধে মৃত্যুঞ্জয় এর পর আরও দু-একটা কথা বলেছেন। সে আলোচনাটা মৃত্যুঞ্জয় শুরু করছেন এই বলে: ‘শাহাবুদ্দীন যবনের দিল্লীর সিংহাসন অধিকার হওয়ার বিষয়ে যবনেরা যে রূপ বলে তাহা লিখি।’ (পৃ. ১১২-৩) বলতে গিয়ে তিনি ফিরে যাচ্ছেন মাহমুদ গজনভির পিতা নাসরুদ্দিন সবুক্তগিনের হিন্দুস্থান আক্রমণের সময়ে।
এই নাসরুদ্দীন হিন্দুস্থানে যে সময়ে আইল তখন হিন্দুস্থানের রাজা সকলের পরম্পর একবাক্যতা কাহারও ছিল না এবং যে যে দেশের রাজা সে সে দেশের বাদশাহ করিয়া আপনাকেই জানিত কেহ কাহারও আয়ত্ত ছিল না। এবং এমন রাজা একও ছিল না যে স্বপরাক্রমে অন্য অন্য রাজারদিগকে স্বাধীন করে ইহা অনুসন্ধান করিয়া এ হিন্দুস্থানে যবনেরদের সঞ্চার হইল। কেননা শত্রুসঞ্চারের ও রাষ্ট্র বিভ্রাটের প্রধান কারণ পরস্পর অনৈক্য ও স্ব স্ব প্রাধান্য ও যখন সেকন্দর শাহ যবনস্থানে বাদশাহ হইয়াছিলেন তখন তিনি এ হিন্দুস্থানে একবার আসিয়া দেশের ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরদের ধার্ম্মিকতা ও পাণ্ডিত্যাদি দেখিয়া কহিলেন যে এ দেশে এ রূপ হকিমেরা আছেন সে দেশের রাজারদের পরাজয় কখনও অন্য দেশীয় রাজারদের হইতে হইতে পারে না। এই কহিয়া স্বদেশে গেলেন আর কখনও এ হিন্দুস্থানে আইলেন না। সম্প্রতি তাদৃশ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের অভাব প্রযুক্ত এ দেশীয় রাজারা দৈববলেতে হীন হইয়া যবন হইতে ক্রমে ক্রমে সকলেই পরাজিত হইলেন। (পৃ. ১২১-২)
সুলতানী ও মুঘল রাজত্বের বিবরণ মৃত্যুঞ্জয় মোটামুটি প্রচলিত ফারসি গ্রন্থ থেকেই নিয়েছেন। হিন্দুস্থানের রাজাদের অনৈক্য কিংবা ব্রাহ্মণ সম্বন্ধে আলেকজান্ডারের মন্তব্য ফেরিশ্তা বা অন্য কোনও ফারসি ইতিহাসে থেকে থাকতে পারে। কিন্তু রাজারা ধর্মের পথ থেকে বিচ্যুত হলেন এবং দৈববলে হীন হয়ে পড়লেন, তার কারণ যে ব্রাহ্মণদের ব্যর্থতা, এই যুক্তি বলা বাহুল্য ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরই যুক্তি। ধর্মরক্ষা এবং রাজাকে সৎপথে চালিত করা ব্রাহ্মণের কর্তব্য। সেই কর্তব্য তারা পালন করেনি, তাই দেবরোষে হিন্দু রাজত্বের পতন ঘটল এবং দৈব ইচ্ছায় যবনদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হল। ব্রাহ্মণের অধঃপতনের জের হিসেবে ঈশ্বরের কৃপাদৃষ্টি অন্যের ওপর গিয়ে পড়ল। পরে দেখব, ইতিহাস-রচনায় দৈব হস্তক্ষেপের ভূমিকা যত ক্ষীণ হয়ে আসবে, এই অধঃপতনের গল্পটা ততই এক সামগ্রিক সামাজিক অবক্ষয়ের কাহিনীতে পরিণত হবে।
মৃত্যুঞ্জয়ের বিবরণে গজনির মাহমুদ কর্তৃক সোমনাথ মন্দির ধ্বংসের ঘটনার কথা এখানে বলে রাখা যাক। তা হলে পরবর্তীকালের ইতিহাস-রচনার সঙ্গে এর তুলনা করা যাবে। মন্দির ধ্বংসের বর্ণনা মোটামুটি আমাদের পরিচিত বর্ণনাই—ফারসি সূত্র থেকে নেওয়া। কিন্তু সোমনাথ মন্দিরের বিগ্রহ সম্বন্ধে মৃত্যুঞ্জয় একটি কথা বলছেন যা পরবর্তীকালে আর কোথাও পাব না। ‘সোমনাথ নামে অতি বড় এক দেব প্রতিমা ছিলেন সে প্রতিমা পূৰ্ব্বে মক্কাতে ছিলেন যবনেরা যে অবধি মনুষ্য সৃষ্টি বলে তদবধি চারি হাজার বৎসর যখন গত হইয়াছিল তখন হিন্দুস্থানের এক রাজা মক্কা হইতে সে প্রতিমা উঠাইয়া আনিয়া ঐ স্থানে স্থাপন করিয়াছিলে…।’ (পৃ. ১২৯) সোমনাথের মূর্তি আদিতে মক্কায় ছিল, কোনও হিন্দু রাজা তা গুজরাটে নিয়ে আসেন, মাহমুদ আবার সেই মূর্তি দখল করে গজনিতে নিয়ে যান—এরকম কাহিনী কোনও ফারসি বইতে আছে কি না বলতে পারব না, কিন্তু পরবর্তীকালে কোনও বাঙালি ঐতিহাসিক যে এ-কথা আর লেখেন নি, তা প্রায় নিশ্চিত।
এই পরের যুগের জাতীয়তাবাদী ইতিহাসে দু-জন মুঘল সম্রাটকে নিয়ে খুব উত্তেজনা সৃষ্টি হবে, তাই এঁদের বিষয়ে মৃত্যুঞ্জয় কী বলছেন, সেটা একবার দেখে নেওয়া যাক। আকবর সম্বন্ধে মৃত্যুঞ্জয় উচ্ছ্বসিত। ‘শ্রীবিক্রমাদিত্যের পর এই হিন্দুস্থানে এখন পর্য্যন্ত গুণেতে অকবর শাহের সম সম্রাট আর কেহ হয় নাহি।’ (পৃ. ১৯৫) ধর্মরক্ষা ও প্রজার প্রতিপালনে আবশ্যক সবরকম গুণ ছাড়াও আকবরের চরিত্রের যে-দিকটি মৃত্যুঞ্জয় বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছেন, সেটা হল যে আকবর ‘নানাবিধ শাস্ত্রজ্ঞান জন্য পারমার্থিক বুদ্ধি প্রতিভাতে মহম্মদের মতে অনাস্থা করিয়া মনে মনে হিন্দুরদের মতেই আস্থা করিতেন অতএব ইরান ও তুরানের রাজারা ইহাকে অনুযোগ করিয়া লিখিতেন।’(পৃ. ১৯১) এমন কি ‘ইনি গোমাংস ভক্ষণ করিতেন না এবং কিল্লার মধ্যেতেও গোবধ বারণ করিয়া দিয়াছিলেন তৎপ্রযুক্ত তদবধি এখনও তাঁহার কিল্লাতে গোবধ হয় না।’ (পৃ. ১৯৪) অপর পক্ষে আওরঙজেব সম্বন্ধে মৃত্যুঞ্জয় লিখছেন:
