তবে পুরাণ হোক আর যা-ই হোক, রাজাবলি-র হিসেবে কোনও ফাঁক নেই। ‘এই কলির আরম্ভ অবধি ৪২৬৭ চারি হাজার দুই শত সাতষট্টি বৎসর পর্যন্ত ১১৯ এক শত উনিশ জন নানাজাতীয় হিন্দু দিল্লীর সিংহাসনে সম্রাট হন।’ (পৃ. ১০) গণনা শুরু হচ্ছে রাজা যুধিষ্ঠির থেকে—হ্যাঁ, সেই মহাভারতের রাজা যুধিষ্ঠির। তাঁর রাজত্বের শুরু থেকে ২৮ জন ক্ষত্রিয় রাজা ১৮১২ বছর শাসন করেন। ‘এই পর্য্যন্ত কলিতে বাস্তব ক্ষত্রিয় জাতির বিরাম হইল।’ তার পর এল ‘মহানন্দ নামে ক্ষত্রিয়ের ঔরসেতে শূদ্রা গর্ভজাত’ নন্দবংশীয় ১৪ জন রাজার ৫০০ বছরের শাসন। ‘এই নন্দ অবধি রাজপুত জাতির সৃষ্টি হয়।’ এর পর বৌদ্ধ রাজাদের পালা—‘গৌতম বংশজাত বীরবাহু, অবধি আদিত্য পৰ্য্যন্ত নাস্তিক মতাবলম্বি ১৫ পনের জনেতে ৪০০ চারি শত বৎসর। এই সময়ে নাস্তিক মতের অত্যন্ত প্রচার হওয়াতে বৈদিক ধৰ্ম্ম উচ্ছিন্ন প্রায় হইয়াছিল।’ তার পর বিচিত্র সব রাজবংশের তালিকা—ময়ূর বংশীয় নয় জন, ষোল জন যোগী, চার জন বৈরাগী ইত্যাদি। অবশ্য ‘বিক্রমাদিত্যেরা পিতাপুত্রে দুই জনেতে ৯৩ বৎসর’ আছেন। আর আছেন ‘ধী সেন অবধি দামোদর সেন পৰ্য্যন্ত বঙ্গদেশীয় বৈদ্য জাতি ১৩ তের জনেতে ১৩৭ এক শত সাইত্রিশ বৎসর এক মাস৷’ সেনেরা বঙ্গদেশীয় বৈদ্য জাতি এবং দিল্লির সিংহাসনে! তার পর ‘চোহান রাজপুত জাতি’-র রাজত্বের শেষে
পৃথারায় এক জনেতে ১৪ চৌদ্দ বৎসর সাত মাস।…এই পর্য্যন্ত হিন্দু রাজারদের সাম্রাজ্য ছিল।
তাহার পর মুসলমানেরদের সাম্রাজ্য হইল। যবনদের সাম্রাজ্য হওয়া অবধি ১৭২৬ শকাব্দ পর্য্যন্ত ৫১ জনেতে ৬৫১ ছয় শত একান্ন বৎসর তিন মাস আটাইশ দিন গত হইয়াছে। (পৃ. ১২-৩)
পরিপূর্ণ নিশ্চয়তা ছাড়াও এই তালিকার বৈশিষ্ট্য হলো বংশানুক্রমিক পারম্পর্যে মহাভারতের চরিত্র থেকে মগধের সম্রাট পর্যন্ত অনায়াসে চলে আসা। এবং রাজবংশের পারম্পর্যে ‘আমীর তৈমুরের সন্তান’ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম পর্যন্ত এসে তালিকা শেষ করা। পুরাণ, ইতিহাস এবং সমসাময়িক, সবটাই একই কালানুক্রমিক ছকে বাঁধা, একটার সঙ্গে আর-একটার কোনও বিরোধ নেই, একটা থেকে আর-একটাতে যেতেও তাই কোনও অসুবিধা নেই। বঙ্কিমের যুগে এসে পৌরাণিক আর ঐতিহাসিক কালের মধ্যে যে তফাৎ করা হবে, পৌরাণিক বিবরণের থেকে ইতিহাসের মালমসলা বের করার পদ্ধতি নিয়ে যে-সব আলোচনা হবে, মৃত্যুঞ্জয়ের চিন্তায় তার আভাসটুকুও নেই। ইংরেজের ফরমায়েশে লেখা হলেও রাজাবলি-র ইতিহাসবোধ সম্পূর্ণ প্রাক-ঔপনিবেশিক।
তাই হিন্দু রাজবংশের অবসান আর ‘যবন সম্রাট’-দের অভ্যুত্থানের বিষয়ে মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের মতো এক ব্রাহ্মণ পণ্ডিত কী বলেন, তা জানতে কৌতূহল হয়। আরও কৌতূহল হয় যখন দেখি যে শিহাবুদ্দিন মুহম্মদ ঘুরি-র হাতে পৃথ্বীরাজ চৌহানের পরাজয়ের বিবরণ জড়িয়ে রয়েছে এক পৌরাণিক কাহিনীর সঙ্গে। কাহিনীটা এইরকম।
পৃথ্বীরাজের পিতার দুই স্ত্রী ছিল। এক স্ত্রী মানুষের মাংস খেত। স্বামীকেও সে নরমাংস খাওয়া অভ্যেস করায়। অপর স্ত্রীর পুত্রকে একদিন সেই রাক্ষসী খেয়ে ফেলে। অপর স্ত্রী তখন পালিয়ে ভাইয়ের আশ্রয়ে যায় এবং সেখানে এক পুত্রসন্তান প্রসব করে। তার নাম হয় পৃথু। পৃথু বড় হয়ে তার পিতার সঙ্গে মিলিত হয়। পিতার অনুরোধে পৃথু তার পিতার শিরচ্ছেদ করে একুশ জন স্বজাতীয় স্ত্রীলোককে সেই মাংস খাওয়ায়। পরে রাজা হয়ে পৃথু সেই একুশ জনের পুত্রকে তার সামন্ত করে। ‘এইরূপে পৃথুরাজার পিতৃহত্যা করাতে পূৰ্ব্ব হইতেও অধিক অখ্যাতি দিনে দিনে বাড়িতে লাগিল ও পূৰ্ব্বে যে রাজারা কর দিত তাহারা কেহ কর দিল না।’ মোট কথা রাজা হিসেবে পৃথ্বীরাজ বড় একটা লোকমান্য ছিলেন না।
এমন সময় শিহাবুদ্দিন ঘুরির আক্রমণ উপস্থিত হলো।
রাজা যবনদের প্রাগল্ভা শুনিতে পাইয়া অনেক বেদজ্ঞ পণ্ডিতেরদিগকে আনাইয়া কহিলেন হে পণ্ডিতেরা এমন কোনহ যজ্ঞের আরম্ভ কর যাহাতে যবনেরদের প্রতিভা ও প্রাগল্ভা উৎরোত্তর হ্রাস হয়। পণ্ডিতেরা আজ্ঞা করিলেন হে মহারাজ এমন যজ্ঞ আছে আমরা কহিতেও পারি কিন্তু আমরা যে সময়ে অবধারণ করিব সে সময়ে যজ্ঞের যূপস্থাপন যদি হয় তবে সে যূপ যাবৎ থাকিবে তাবৎ যবনেরা এ দেশে কখনও আসিতে পারিবে না। রাজা পণ্ডিতেরদের এই বাক্যে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়া বড় সমারোহ করিয়া যজ্ঞের আরম্ভ করিলেন। যূপস্থাপনের সময় হইলে পণ্ডিতেরদের অনুমতি মাত্রে যূপস্থাপন করিতে যূপ উঠাইতে নানা যত্ন করিলেন যূপ কদাচ উঠিল না। তদনন্তর পণ্ডিতেরা কহিলেন হে মহারাজ ঈশ্বরের যে ইচ্ছা সেই হয় পুরুষ ঈশ্বরেচ্ছার ওপর প্রবল নয় কিন্তু তাহার সহকারী বটে ঈশ্বরেচ্ছা সহকৃত পুরুষ কার্য্যসাধক হয় অতএব নিবৃত্ত হও বুঝি এ সিংহাসন যবনাক্রান্ত হইবে।
পণ্ডিতদের কথায় পৃথ্বীরাজ ‘যুদ্ধে শৈথিল্য করিলেন’। শিহাবুদ্দিন শত্রুসৈন্য ধ্বংস করে দিল্লি পৌঁছে গেলেন। পৃথ্বীরাজ তখন
অন্তঃপুর হইতে নির্গত হইয়া শাহাবুদ্দীনের সহিত ঘোরতর রণ করিলেন কিন্তু ঈশ্বরেচ্ছাতে শাহাবুদ্দীন যবন ঐ রঙ্গভূমিতে পৃথুরাজাকে ধরিয়া পৃথুরাজা জয়চন্দ্র রাজার জামাতা হন [স্মরণীয়, জয়চাঁদ ইতিমধ্যেই মুহম্মদ ঘুরির সহায়তা করেছেন] এই অনুরোধে তাহাকে নষ্ট করিলেন না কিন্তু কএদ করিয়া খাড়া খাড়া আপন দেশে গজনেনে পাঠাইয়া দিলেন। (পৃ. ১০৯-১০)
