৩
এই ইতিহাসবোধ কিন্তু প্রতিষ্ঠিত হয় উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে। উনিশ শতকের গোড়ায় লেখা ইতিহাসের বই সম্পূর্ণ অন্য ঐতিহাসিক স্মৃতি ধারণ করে আছে। ঐ গোড়ার যুগের সবচেয়ে সুলিখিত বইটির কথাই ধরা যাক—মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের রাজাবলি (১৮০৮)।৩ সাহেবদের ফরমায়েশে লেখা কিন্তু বাংলা ছাপা বই-এর মধ্যে প্রথম ভারতবর্ষের ইতিহাসটি লিখতে গিয়ে মৃত্যুঞ্জয়কে (আনুমানিক ১৭৬২-১৮১৯) যে নতুন করে গবেষণা করতে হয়েছিল, এমন মনে হয় না। তাঁর রচনার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্যই হল, ইতিহাসের ঘটনা এবং তার পারম্পর্য সম্পর্কে তাঁর পরিপূর্ণ নিশ্চিতি। দিল্লি ও বাংলার সিংহাসনে ‘যে যে রাজা ও বাদশাহ ও নবাব হইয়াছেন’, তার একটা প্রচলিত বিবরণই মৃত্যুঞ্জয় লিপিবদ্ধ করেছেন। বাংলার পণ্ডিতসমাজ, বিশেষ করে কুলগ্রন্থ-রচয়িতাদের মহলে যে এ-রকম একটা ইতিহাস সুপ্রচলিত ছিল, তাতে বিশেষ সন্দেহ নেই।৪ বাঙালির ঐতিহাসিক স্মৃতি অবশ্যই ছিল।
এই স্মৃতিকথনে কালপরিমাপের ব্যবস্থা ছিল নিশ্ছিদ্র। মৃত্যুঞ্জয়ের ইতিহাস শুরু হচ্ছে এইভাবে:
পিতৃকল্পাদি ত্রিংশত কল্পের মধ্যে ঘটীযন্ত্রের ন্যায় কালচক্রের ভ্ৰমণবশতো বর্ত্তমান শ্বেতবরাহ কল্প যাইতেছে একৈক কল্পেতে চতুর্দ্দশ মনু হয় তাহাতে শ্বেতবরাহ কল্পের মধ্যে বৈবস্বত নামে সপ্তম মনু যাইতেছে। একৈক মনুতে ২৮৪ দুই শত চৌরাশি যুগ হয়। তাহার মধ্যে বৈবস্বত নামে সপ্তমে মনুতে ১১২ এক শত বার যুগের যুগ এই কলিযুগ যাইতেছে। ইহার পরিমাণ ৪৩২০০০ চারি লক্ষ বত্রিশ হাজার বৎসর ইহার মধ্যে ১৭২৬ সতের শত ছাব্বিশ শকাব্দ পর্য্যন্ত গত ৪৯০৫ চারি হাজার নয় শত পাঁচ বৎসর। বাকি ৪২৭০৯৫ চারি লক্ষ সাতাইশ হাজার পঁচানব্বুই বৎসর। (পৃ. ৩-৪)
বছর গোনার হিসেবও একই রকম সুনিশ্চিত—কলিযুগের শুরু থেকে শেষ অবধি কোনও ফাঁক নেই। প্রথম ৩০৪৪ বছর ধরে প্রচলিত ছিল যুধিষ্ঠির রাজার শক। তার পরের ১৩৫ বছর বিক্রমাদিত্য রাজার শক। এই দুই শক গত।
বর্ত্তমান নর্মদা নদীর দক্ষিণ তীরে শালিবাহন নামে রাজার শক যাইতেছে এ শক বিক্রমাদিত্য রাজার শকের পর ১৮০০০ আঠার হাজার বৎসর থাকিবে তাহার পর বিজয়াভিনন্দন নামে রাজা চিত্রকূট পর্বত প্রদেশে হইবেন তাহার শক শালিবাহন রাজার শকের পর ১০০০০ দশ হাজার বৎসর পর্য্যন্ত হইবে।
তাহার পর পরিনাগার্জুন নামে এক রাজা হইবেন তাহার শক এই কলির ৮২১ আট শত একুশ বৎসর শেষ থাকা পর্যন্ত থাকিবে তাহার পর সম্ভল দেশে গৌতব্রাহ্মণের ঘরে কল্কিদেবের অবতার হইবে এই মতে ৬ ছয় শককৰ্ত্তা রাজারদের মধ্যে ১ এক গত ১ এক বর্তমান ও তিন ভাবী। (পৃ. ৮)
এই কালগণনা পদ্ধতির আর যাই দোষ থাক, অনিশ্চয়তার অভিযোগ নিশ্চয় আনা যাবে না এর বিরুদ্ধে।
কালের মতো স্থানের ব্যাপারেও মৃত্যুঞ্জয় সমান সতর্ক। এই ইতিহাস কোথাকার ইতিহাস?
আকাশ বায়ু তেজো জল ভূমি এই পঞ্চভূতের মধ্যে পৃথিবীর আট আনা অন্য অন্য আকাশাদি চারিভুতের দুই দুই আনা…এই ভূমিপিণ্ডের অর্ধ্বেক লবণ-সমুদ্রের উত্তর এই জম্বুদ্বীপ। …এই পৃথিবী সপ্তদ্বীপা। এ সপ্তদ্বীপের মধ্যে জম্বুদ্বীপ নামে এই দ্বীপ। এই জম্বুদ্বীপ নয় খণ্ড…এই নববর্ষের মধ্যে ভারতবর্ষ নামে পৃথিবীর নব ভাগের এক ভাগ এই। ভারতবর্ষের নব ভাগ সে সকল ভাগের নাম এই ঐন্দ্র কসেরু তাম্রপর্ণ গভস্তিমত নাগ সৌম্য বারুণ গন্ধর্ব কুমারিকা এই নবখণ্ডের মধ্যে বর্ণাশ্রম ব্যবস্থা যাহাতে আছে সে কুমারিকা খণ্ড এই।
আর আর খণ্ড সকলের মধ্যে অন্ত্যজ লোকের বসতি। (পৃ. ৪-৬)
এহেন যে সপ্তদ্বীপা পৃথিবী, তার মধ্যে জম্বুদ্বীপ, তার আবার নয় বর্ষ ইত্যাদি, সেই পৃথিবীর শাসনকর্তাদের ইতিহাস রাজাবলি। ইতিহাসের শুরু কোথায়?
পরেমশ্বর এই পৃথিবীর পালন নিমিত্ত ইক্ষ্বাকু নামে অশ্বত্থ বৃক্ষরূপ রাজাকে সত্যযুগে প্রথমত আরোপিত করিয়াছিলেন ঐ রাজার স্কন্ধ শাখাদ্বয় রূপ সূৰ্য্যবংশ ও চন্দ্রবংশ এই দুই বংশের ধারাবাহিক সন্তান-পরম্পরাতে চারি যুগে এই পৃথিবী মণ্ডল অধিকৃত ছিলেন। এই উভয়বংশীয় রাজারদের মধ্যে মহত্তম ধর্ম্ম তপোবল প্রভাবে কেহ কেহ সপ্তদ্বীপ পৃথিবীর শাসন করিয়াছেন কেহ্ কেহ্ মহত্তর ধর্ম্ম তপস্যা বল ও প্রতাপে জম্বুদ্বীপ মাত্রের অধিকার করিয়াছেন। কেহ কেহ মহাধর্ম্ম তপোবল বশতঃ ভারতবর্ষ মাত্রের অধিকার করিয়াছেন কেহবা কুমারিকা খণ্ড মাত্রের রাজা ছিলেন এই দুই বংশের রাজারদের মধ্যে একতর সম্রাট হইলে অন্যতর মণ্ডলেশ্বর হইতেন। ইহারদের বিবরণ পুরাণেতিহাসাদি শাস্ত্রে বিস্তারিত আছে। (পৃ. ৬-৭)
কয়েকটা কথা এখানে পরিষ্কার বলে রাখা যাক। মৃত্যুঞ্জয়ের ধারণায় পৃথিবীর প্রতিপালক শাসনকর্তারা পরমেশ্বর প্রেরিত। ধর্মের তপস্যাবলে তাঁরা এই অধিকার ভোগ করেন। সেই তপস্যা শুধু মহৎ, না মহত্তর, না মহত্তম, তার ওপর নির্ভর করছে এঁদের আধিপত্যের সীমানা। মহত্তম ধর্মতপস্যার প্রভাবে সমগ্র পৃথিবীর অধিপতি হওয়াও সম্ভব ছিল। এমন ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত রাজবংশের ইতিহাসকে আমরা অনেকেই হয়তো ইতিহাস বলে মানতে রাজি হব না, যদিও একটু পরেই দেখা যাবে যে নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতিও এই ধারণার সঙ্গেই গ্রথিত হয়ে রয়েছে। যাই হোক, অকারণ ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে মৃত্যুঞ্জয়ের কাহিনীগুলিকে ওঁরই সূত্র অনুসারে বলা যাক—‘পুরাণেতিহাস’।
