৮৯ B.H. Mehta, ‘Social and Economic Conditions of the Chodhris’,p. I78. সংস্কার আন্দোলনের ফলে মাঝে মাঝেই আদিবাসীদের মধ্যে গড়ে উঠেছে এই ধরনের বিভেদ। কোনও কোনও ক্ষেত্রে সংস্কারপ্রাপ্ত গোষ্ঠীটি একটি পৃথক জাতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদাহরণের জন্য দ্র. Roy. পূর্বোক্ত, pp. 286-90.
৯০ এই জমি যে সুষমভাবে বণ্টিত হয়েছিল, তার কোনও মানে নেই, বৃহৎ আদিবাসী ভূস্বামীদের সুবিধেই হয়েছিল বেশি, যার ফলে স্বাধীনতা-উত্তর বছরগুলি সম্পন্ন এবং দরিদ্র আদিবাসীদের মধ্যে মেরুপ্রমাণ ব্যবধান গড়ে দেয়। Ghanshyam Shah, ‘Tribal Identity and Class Differentiations: A Case Study of the Chodhri Tribe’, Economic and Political Weekly. Annual Number, February 1979, pp. 459-65.
ইতিহাসের উত্তরাধিকার – পার্থ চট্টোপাধ্যায়
১
সম্প্রতি উগ্রহিন্দুর আক্রমণে সেকুলার মতাবলম্বীরা কিছুটা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। ভারতবর্ষ যে নানা ভাষা, ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠীর মিলনভূমি, ভারতের জাতীয়তা যে ধর্মীয় চেতনার ঊর্ধ্বে, সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের স্বার্থ যে আসলে সাম্প্রদায়িক স্বার্থ যা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী—এসব কথা এখনও বলা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু কোথায় যেন একটা দ্বিধাগ্রস্ত ভাব এসে পড়েছে। ওদিকে উগ্রহিন্দুরা চেঁচিয়ে যাচ্ছেন, গণতান্ত্রিক ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও হিন্দুর স্বার্থ কেন স্বীকৃত হবে না, অথচ সংখ্যালঘুর স্বার্থ কেন মর্যাদা পাবে? রাষ্ট্রের আইনে ধর্মীয় সংখ্যালঘুকে স্বতন্ত্র স্বীকৃতি দেওয়াটাই তো সাম্প্রদায়িকতা, তা তুলে দেওয়ার দাবিই যথার্থ সেকুলার রাষ্ট্রের দাবি। উগ্রহিন্দু আরও বলছেন, বিদেশি আক্রমণের সমস্ত চিহ্ন মুছে দিয়ে প্রকৃত জাতীয়তার হৃত সম্মান পুনরুদ্ধার করতে হবে; এক্ষেত্রে ইংরেজ যে-অর্থে বিদেশি, পাঠান বা মুঘল শাসকেরাও সেই অর্থেই বিদেশী। উগ্রহিন্দুর অভিযোগ, এই দাবির বিরোধিতা করে সেকুলাররা প্রকৃত জাতীয়তারই বিরোধিতা করছেন।
প্রকৃত জাতীয়তার সংজ্ঞা নির্ণয় করার ক্ষেত্রে ইতিহাসের সাক্ষ্য একটা বিরাট ভূমিকা নিয়ে ফেলেছে। অযোধ্যায় মসজিদের ব্যাপারে সেকুলার ঐতিহাসিকেরা প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন যে সেখানে আদৌ কোনও মন্দির ছিল না। একাধিক রাজনৈতিক দল, এমন কি সরকারের পক্ষ থেকেও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে যে প্রত্নতত্ত্ব আর ইতিহাসের সাক্ষ্য বিচার করে স্থির হোক, বাবরি মসজিদ তৈরি হওয়ার আগে সেখানে কোনও মন্দির ছিল কি না। যেন মন্দির থেকে থাকলে উগ্রহিন্দুর দাবি যথার্থ বলে প্রমাণিত হবে। সেকুলার ইতিহাসচর্চার সংকট এইখানেই—আজকের রাষ্ট্রনীতির সঙ্গে জাতীয়তার ইতিহাসের সামঞ্জস্য আনা। সংকট এইজন্য যে জাতীয়তার যে ইতিহাস গত শতাব্দী থেকে লেখা হয়ে এসেছে, তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে রয়েছে এমন সব কাহিনী, ধারণা, ব্যাখ্যা যা আজকের উগ্রহিন্দু প্রচারের প্রধান উপাদান। সত্যি বলতে কি, বিষয়টা একটু তলিয়ে দেখলে একটা সাংঘাতিক সত্য বেরিয়ে আসবে। সেটা হল যে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা আসলে ভারতীয় জাতীয়তাবাদেরই প্রতিচ্ছবি, আয়নায় মুখ দেখার মতো—তার রূপ, আকৃতি, গড়ন, অবিকল এক।
অন্য অঞ্চলের কথা বলতে পারব না, বাংলার ইতিহাসচর্চার ইতিহাস থেকে এরকমই দেখতে পাচ্ছি।
২
বঙ্কিম যে অত ক্ষোভ করে বলেছিলেন ‘বাঙালীর ইতিহাস নাই’, তাঁর ক্ষোভের অনেক কারণ ছিল বটে, কিন্তু কথাটা তিনি সম্পূর্ণ সত্যি বলেননি। ইতিহাস যথেষ্টই ছিল। রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের প্রথম শিক্ষা বাঙ্গালার ইতিহাস সমালোচনা করতে গিয়ে বঙ্কিম ঐ প্রবন্ধেই বলেছেন, ‘বালকশিক্ষার্থে যে সকল পুস্তক বাঙ্গালা ভাষায় নিত্য নিত্য প্রণীত হইতেছে…’ ইত্যাদি। ইতিহাসের বই লেখা হচ্ছিল অনেক। বঙ্কিমের আপত্তি, তাতে বাঙালির প্রকৃত ইতিহাস থাকছিল না। এই প্রকৃত ইতিহাস কী, তা নিয়েও বঙ্কিমের মত ছিল স্পষ্ট। প্রকৃত ইতিহাস হল পূর্বপুরুষের গৌরবের স্মৃতি। ‘এমন দুই এক হতভাগ্য জাতি আছে যে, কীৰ্ত্তিমন্ত পূর্ব্বপুরুষগণের কীৰ্ত্তি অবগত নহে। সেই হতভাগ্য জাতিদিগের মধ্যে অগ্রগণ্য বাঙ্গালী।’ কথাটা যে কতটা লজ্জার তা বোঝাবার জন্য বঙ্কিম তারপর জুড়ে দিয়েছেন, ‘উড়িয়াদিগেরও ইতিহাস আছে’। মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।
আসলে তাঁর ক্ষোভ হল, বাঙালির স্বরচিত বাংলার ইতিহাস নেই। ‘আমাদিগের বিবেচনায় একখানি ইংরেজি গ্রন্থেও বাঙ্গালার প্রকৃত ইতিহাস নাই’। কেন? কারণ সাহেবরা কেবল বিজাতীয় মুসলমানদের সাক্ষ্য অবলম্বন করে বাংলার ইতিহাস লিখেছেন, তাতে বাঙালির সাক্ষ্য নেই। বাঙালির কাছে এই ইতিহাস গ্রহণীয় নয়। ‘আত্মজাতি গৌরবান্ধ, মিথ্যাবাদী, হিন্দুদ্বেষী মুসলমানের কথা যে বিচার না করিয়া ইতিহাস বলিয়া গ্রহণ করে, সে বাঙ্গালী নয়।’ তার পর এই ‘স্বকপোলকল্পিত’ ইতিহাসের মুসলমান লেখকদের ওপর বঙ্কিমের উষ্মা—‘গোহত্যাকারী, ক্ষৌরিতচিকুর’ ইত্যাদি— তৎসম শব্দের গাম্ভীর্য সত্ত্বেও এগুলো নিছকই গালাগাল, সুতরাং উদ্ধৃতি না বাড়ানোই ভাল।
বিদেশি শাসকের লেখা ইতিহাসে পরাধীন জাতি তার নিজের কথা খুঁজে পাবে না, নিজেদের ইতিহাস নিজেদেরই লিখতে হবে—জাতীয়তাবাদের এ হল প্রাথমিক শ্লোগান। স্বরচিত ইতিহাসের অভাব নিয়ে বঙ্কিমের ক্ষোভ নিঃসন্দেহে তাঁর জাতীয়তাবাদেরই প্রকাশ।১ কিন্তু এখানে প্রথম যা লক্ষণীয় তা হল, পরাধীন স্বজাতির কথা বলতে গিয়ে বঙ্কিম যদিও কখনও বলছেন ‘বাঙ্গালী’, কখনও বলছেন ‘ভারতবর্ষীয়’, উভয় ক্ষেত্রেই কিন্তু মুসলমান শাসক বিদেশী, আক্রমণকারী। (বাংলার স্বাধীন সুলতানদের নিয়ে অবশ্য কিছুটা দোটানা আছে বঙ্কিমের ভাবনায়, সে প্রসঙ্গে পরে আসব।) দ্বিতীয় লক্ষণীয়: ‘হায়! বাঙ্গালীর ঐতিহাসিক স্মৃতি কই?’ বলে তিনি যখন আক্ষেপ করছেন, তখন যে-ইতিহাসবোধ তাঁর কাম্য তা কিন্তু কোনও ‘দেশী’ ইতিহাসবোধ নয়। এই ঐতিহাসিক স্মৃতির কাঠামো সম্পূর্ণ আধুনিক এবং ইউরোপীয়। তৃতীয়, ১৮৮০ সালে বঙ্কিম যখন আহ্বান জানাচ্ছেন, ‘বাঙ্গালার ইতিহাস চাই, নহিলে বাঙ্গালার ভরসা নাই। কে লিখিবে? তুমি লিখিবে, আমি লিখিব, সকলেই লিখিবে। যে বাঙ্গালী, তাহাকেই লিখিতে হইবে’, ততদিনে কিন্তু অনেক বাঙালি লেখকই বাংলা এবং ভারতবর্ষের ইতিহাস লিখেছেন। সে-সব বই বিস্তর লোক পড়ত। প্রতি বছর নতুন সংস্করণ বেরোত, এমন বইও ছিল তার মধ্যে। বঙ্কিম সেগুলিকে ‘বালপাঠ্য’ বলে অবজ্ঞা করলেও আশ্চর্যের কথা হল এইসব বই-এর লেখকদের ইতিহাসবোধ কিন্তু বঙ্কিমেরই অনুরূপ। তৎকালীন ইংরেজি-শিক্ষিত বাঙালি ইতিহাস-লেখকদের মধ্যে বঙ্কিম মোটেই ব্যতিক্রম ছিলেন না।২
