মুসলমানদের সম্পর্কে হালের হিন্দুয়ানির প্রচারের সুরটি একটি প্রচারপত্রের মাধ্যমে ধরা যেতে পারে। ১৯৮৯-এর শেষ দিকে অথবা ১৯৯০-এর গোড়ায় এই প্রচারপত্রটি ভাগলপুরে বিলি করা হয়েছিল। এর শিরোনাম ছিল ‘হিন্দু ভাইরা ভাবো ও সাবধান হও’।২২ প্রচারপত্রের প্রশ্ন ছিল,
১। এটা কি সত্য নয়। মুসলিম জনসংখ্যা বেড়েই চলেছে আর হিন্দু জনসংখ্যা কমছে?
২। এটা কি ঠিক নয় যে, মুসলিমরা পুরোপুরি প্রস্তুত ও সংগঠিত, এবং হিন্দুরা পুরেপুরি অসংগঠিত, ছড়ানো ছিটানো অবস্থায় আছে?
৩। এটা কি সত্য নয় যে মুসলিমদের অস্ত্রের যোগান অফুরন্ত আর হিন্দুরা পুরোপুরি নিরস্ত্র…
৫। এটা কি যথার্থ নয় যে গত ৪০ বছরে কংগ্রেস মাত্র ৩০ শতাংশ ভোট পেয়ে ক্ষমতায় এসেছে; বা অন্যভাবে বললে যেদিন মুসলিমরা মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ হয়ে যাবে, সেদিন তারা ক্ষমতা পাবে?
৬। এটা কি সঠিক নয় যে ১২ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে মুসলিম জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ হয়ে যাবে: অন্যভাবে বললে ১২ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে মুসলিমরা সহজেই দেশের শাসক হয়ে যাবে?
৭। এটা কি সত্য নয়, যেই তারা ক্ষমতা পাবে, অমনি পাকিস্তানের মতো (এখানকার) হিন্দুদের তারা ঝাড়েবংশে উজাড় করে দেবে?
৮। এটা কি সত্য নয় যে হিন্দুদের নির্মূল করার সময় তারা ভেবে দেখবে না কেই বা লোকদলের, কেই বা সোস্যালিস্ট ও কেই বা কংগ্রেসের পুরুষ বা মহিলা সদস্য এবং কোন হিন্দু ‘উচুঁজাত’ বা ‘পিছিয়ে পড়া’ বর্গের লোক, কেই বা হরিজন?
৯। এটা কি যথার্থ নয় যে, যে সব লোক হাল আমলের রাজনৈতিক দুর্নীতি থেকে কালো টাকা আয় করছে ও সম্পদ বাড়াচ্ছে, মুসলিম শাসনে সেইসব লোকদেরও জীবন ও সম্পত্তি ধ্বংস হবে?…
১১। এটা কি সত্য নয় যে পাকিস্তান ছেড়ে দেবার পরে যে ভূখণ্ড রয়ে গেছে, তা স্পষ্টতই হিন্দুদের?…
১৩। এটা কি ঠিক নয়্ যে কাশ্মীরে জমি কিনতে, স্থায়ীভাবে বসবাস করতে হিন্দুদের মানা আছে অথচ কাশ্মীরি মুসলিমরা অবাধে দেশের যে কোনও অংশে জমি কিনতে পারে।…
১৬। এটা কি সত্য নয় যে খ্রিস্টানদের ‘হোমল্যান্ড’ বা নিজেদের দেশ আছে, মুসলিমদের ‘হোমল্যান্ড’ বা নিজের দেশ আছে, সেখানে তারা সর্বতো নিরাপদ বোধ করে অথচ হিন্দুরা তাদের দেশ রাখতে পারেনি কারণ ধর্মনিরপেক্ষতার পতাকাতলে সেটা একটা ‘ধর্মশালা’ হয়ে গেছে?
১৭। এটা কি সত্য নয় যে হিন্দুরা ক্ষমতাসীন থাকলে মুসলিমরা নিরাপদে বাস করতে পারে কিন্তু যখনই মুসলিমরা ক্ষমতায় আসবে, হিন্দুদের জীবন বিপন্ন হবে অর্থাৎ তাদের নির্মূল করে ফেলা হবে?
১৮। এটা কি ঠিক নয় যে দল নির্বিশেষে লোকসভার মুসলিম সদস্যরা মুসলিমদের উন্নতির জন্য দিবারাত্র চেষ্টা করে কিন্তু দিল্লিতে এমন কোনও হিন্দু জনপ্রতিনিধি নেই যে নিজের সুবিধা ব্যতিরেকে হিন্দুদের স্বার্থের জন্য আত্মনিয়োগ করেছে?…
২২। এটা কি সত্য নয় যে, যে সব মুসলিম রমণীদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে তাদের ভরণ-পোষণ সরকারি ওয়াকফ কমিটি থেকে করা হয় এবং সরকারি কোষাগার থেকেই খরচার যোগান হয়? এর অর্থ কি এই নয় যে মুসলিমদের আনন্দ উপভোগ ও লালসা চরিতার্থ করার জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়কে অতিরিক্ত করের বোঝা বহন করতে হচ্ছে?
যদি এইগুলি সঠিক হয় তাহলে হিন্দুভাইদের এক্ষুনি সজাগ হতে হবে সময় থাকতে থাকতে জেগে উঠতে হবে। সম্পদ, শরীর, সবকিছু উৎসর্গ করার বিনিময়ে হিন্দু জনগণ ও জাতিকে রক্ষা করার শপথ নিন এবং দেশকে হিন্দু রাষ্ট্ররূপে ঘোষণা করার প্রতিজ্ঞা করুন।
এই সমস্ত থেকে অবশ্যই ‘মুসলিম’ সম্পর্কে আতঙ্ক তৈরি হয়, দাবি ওঠে তাকে নিরস্ত্র করবার। তার ভোটাধিকার কেড়ে নাও, তার সংস্কৃতি হরণ করো; ‘আমাদের’ নাম নাও, ‘আমাদের’ ভাষা নাও, ‘আমাদের’ পোষাক নাও। এই দাবিই উচ্চকিত হয়ে ওঠে যে যদি মুসলিমরা এই দেশে থাকতে চায়, তাহলে ‘আমাদের’ মতো করে থাকতে হবে। আমরা কারা? এটা কখনওই পরিষ্কার করে বলা হয় না, কিন্তু এই পরিস্থিতিতে যেন আদৌ সেটাতে কিছু এসে যায় না।
‘হিন্দুস্তান মেঁ রহনা হ্যায়,
তো হমসে মিলকর রহনা হোগা।’
‘হিন্দুস্তান মেঁ রহনা হ্যায়,
তো বন্দে মাতরম্ কহনা হোগা।’
এর সঙ্গে সঙ্গে অন্য এক বিপরীত যুক্তিও সময় সময় শোনা যায়। ‘আমরা’ অবশ্যই মুসলিমদের মতো সংখ্যালঘুদের প্রতি ন্যায়পরায়ণ হব, কারণ তারা তো বেশিরভাগই ধর্মান্তরিত স্থানীয় বাসিন্দা। ‘তাদের শিরায় তো হিন্দু রক্তই বইছে।’২৩ কিন্তু মূল ধুয়াটা রয়েই যায়: ‘আমাদের মতো করে থাকো’ নতুবা ভবিষ্যৎ রক্তাক্ত; কোতল হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। ‘বাবর কি সন্তান, যাও পাকিস্তান ইয়া কবরিস্তান’। এই জিগিরকে ভাগলপুর ও অন্যান্য কিছু অঞ্চলের পুলিশ ও স্থানীয় হিন্দু জনগোষ্ঠীর বড় অংশ আক্ষরিক অর্থে মেনে নিয়েছিল।
‘মুসলিম’-এর দুশ্চরিত্রায়নের বিপ্রতীপে তুলে ধরা হয়েছে হিন্দুর এক ‘প্রতিকৃতি’। প্রাক-স্বাধীনতা যুগ থেকে হাল আমল পর্যন্ত বিজ্ঞাপিত ছবির তুলনায় এই প্রতিকৃতিটি কিছুটা আলাদা। এই জঙ্গি হিন্দুয়ানির প্রচারে সেই অহিংস, শান্তিপ্রিয়, সহনশীল ‘হিন্দুর’ চরিত্র ততটা জোর পায় না। আবার আশ্চর্যের কথা, সেটাকে একেবারে বাতিলও করা হয় না। বরং এখন বলা হয় যে ‘হিন্দুরা’ কীভাবে অনেক বেশি সময় ধরে সহনশীল থেকে গেছে, এখনও তারা ‘বড় বেশি নিস্তেজ’। কিন্তু সময়ের দাবি হল সাহস দেখানো, সহ্য করা নয়। ন্যায্য পাওনা নিয়ে হিন্দুদের এখনই দাবি তোলা উচিত। শেষ অবধি সেই দাবি উঠছেও। যদি ‘খ্রিস্টানরা’ একটা জাতি হতে পারে এবং ‘মুসলিমদের’ একটা জাতি থাকতে পারে, তবে হিন্দুরাও কেন একটা জাতি নয়? যে ভুখণ্ডে তারা সংখ্যাগুরু ও হাজার বছর ধরে বাস করেছে, সেই এলাকা কেন তাদের নিজেদের দেশ হবে না, সেখানে কেন তাদের নিজেদের রাষ্ট্র থাকবে না? বহু দিন ধরে ‘সহনশীলতা’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ অজুহাতে ‘হিন্দু’দের অনেক কিছু ছাড়তে হয়েছে। তাদের আর ভয় দেখানো চলবে না, তাদের আর কোনও কিছু ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। কয়েক বছর ধরেই তো দিল্লি ও উত্তরপ্রদেশের অন্যান্য শহরে জোর কদমে দেওয়াল-লিখন চলছে ‘গর্ব সে কহো হম হিন্দু হ্যায়’ এবং ‘হিন্দু জাগা, দেশ জগেগা’।
